—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
সন্জীদা খাতুন চলে গেছেন এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল, এবং এর মধ্যে ও-পার এ-পার দুই বাঙালির সমাজে ও মানসের উপর দিয়েও নানা ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে। সেই ঝড়ের একটা দমকা আঘাত ছিল ‘বাঙালি/বাংলাদেশি’ জাতিপরিচয় আর হিন্দু-মুসলমান ধর্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব, রাজনীতির বয়ানের সূত্রে যাকে নিয়ে আসা হয়েছে একেবারে হাটের মাঝখানে: জনপরিসরে, মানুষের রোজকার কথাবার্তায় ও তর্কে, সমাজমাধ্যমে তরজায়। এই গোটা ব্যাপারটার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গত এসে পড়া-ও ঘটেছে অবধারিত ভাবেই: বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে উগ্র উত্তেজিত নাগরিকের সামনে রাবীন্দ্রিক শুভবোধ ও যুক্তির শমিত উচ্চারণও আমরা শুনেছি নাগরিক সমাজের একাংশের মুখেই— হয়তো কম, তবু শুনেছি। এই সব দেখতে-শুনতেই গঙ্গা-পদ্মাপাড়ের বঙ্গজীবনে এসে চলেও গিয়েছে আর একটি পঁচিশে বৈশাখ, আর একটি কবিপক্ষ বহমান। বাঙালির রাজনীতি আর সংস্কৃতির মধ্যে যে জায়গাটায় ভরসা জোগাতে পারেন রবীন্দ্রনাথ, জুগিয়ে এসেছেনও এতকাল তাঁর কবিতা গান ছবি-সহ সৃষ্টির বিরাট ভাঁড়ার থেকে— তারই এক মননভাষ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে সন্জীদা খাতুনের বইটি।
এগারোটি প্রবন্ধের সঙ্কলন, সব প্রবন্ধ আকারে ও মেজাজেও সমান নয়। কোনওটি রবীন্দ্রভুবন নিয়ে প্রাবন্ধিকের ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ, কোনওটিতে আবার বিশেষ কোনও রবীন্দ্রসৃষ্টির (যেমন রাজর্ষি/বিসর্জন/Sacrifice, কিংবা গীতবিতান) বিশিষ্টতা ফুটে উঠেছে প্রকৃত গবেষকের অনুসন্ধিৎসায়। ‘সোনার বাংলা’ শব্দবন্ধ এই মুহূর্তে দুই বাংলাতেই সমাজ-রাজনীতির একটা কেন্দ্রবিন্দু; এই পরিস্থিতির সাপেক্ষেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় লেখিকার কলমে ‘আমার সোনার বাংলা’ প্রবন্ধে এই তথ্য: “১৯৫৭ সালের প্রথমার্ধে ঢাকাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাসুদ্ধ প্রাদেশিক নেতাদের এক বৈঠক হয়েছিল।... কার্জন হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সে সভায় আমার গান গাইবার কথা ছিল। সেই সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে অনুরোধ করেন। এর তাৎপর্য তখন বুঝিনি, আজ বুঝতে পারি। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের কাছে ‘সোনার বাংলা’ বিষয়ে বাঙালির আবেগ-অনুভূতি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এ দেশের নেতা।” বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ-গানের সুর ও স্বরলিপি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে— সুচিত্রা মিত্রের রেকর্ড থেকে শিল্পীরা গানটি তুলেছিলেন কিন্তু সে সুর থেকে নিজেরাই খানিক সরেও গিয়েছিলেন। সন্জীদা লিখছেন, “ক্যাবিনেট ডিভিশনের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু রায় দেন, যে সুর গেয়ে দেশকে স্বাধীন করা হয়েছে, তাই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর।” রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর নড়চড় হবে না কদাচ, একটা জাতির স্বাধীনতার আবেগের সামনে এই স্বতঃসিদ্ধও ম্লান হয়ে গিয়েছিল: “আজও সেই সুরে ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়ে চলেছি আমরা।”
রবীন্দ্রনাথ: অসীমের সীমানা ছাড়ায়ে
সন্জীদা খাতুন
৩৫০.০০
রাবণ
‘রবীন্দ্রচর্চা এবং বাংলাদেশ’, ‘মুক্তিসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ’ আর ‘বাঙালি জাতিসত্তার সন্ধান’, এ-বইয়ের এই তিনটি প্রবন্ধ অবশ্যপাঠ্য, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির। রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ ভেদাভেদ করতে হচ্ছে এ অতি দুর্ভাগ্যের, কিন্তু বাংলাদেশ যে কোন মূল্যে রবীন্দ্রনাথকে ‘অর্জন’ করেছে, সে-ইতিহাস তো এ-পারের আম-রবীন্দ্রপ্রেমীর অজানা! পশ্চিমবঙ্গ ভাসা-ভাসা জানে— ১৯৬১-তে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে ও তার আগে-পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ শাসকের কোপে পড়েছিলেন। সন্জীদা বিশদে তুলে ধরেছেন সেই ইতিহাসের সত্য: ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়পর্বে ও-পারে কী কী রবীন্দ্রবিষয়ক বই প্রকাশিত হয়েছিল তা তুলে ধরেছেন, সঙ্গে নানা বইয়ের নানা লক্ষ্য ও ‘মোটিভ’ও— কোনও লেখক/সম্পাদক চান বিরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশেও রবীন্দ্রভাবনা নিয়ে আগ্রহ জাগাতে, কেউ এক রকম আত্মপ্রবোধ বা কৈফিয়ত দেওয়ার মতো পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জমিদারি বা লালন বা সুফি-ভাবনার সংযোগকে তুলে ধরছেন রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে। পাকিস্তান আমলে ‘ভারতীয় বই’ বলে কোপে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের বইও, তাই ও-পারের লেখক-সম্পাদক-প্রকাশকেরা কী করে স্রেফ একটা কেজো ভূমিকা যোগ করে একের পর এক রবীন্দ্র-বই ছাপছিলেন, সেই শুভ অন্তর্ঘাতের কথাও লিখেছেন সন্জীদা, “এমনকী যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’, ‘সঞ্চয়িতা’ ইত্যাদি বইয়ের পাইরেট এডিশন করে ঘোর ব্যবসা করতে শুরু করেছিলেন, বাস্তব অবস্থায় পটভূমি বিচারে তাঁদের দস্যুতাকেও অবাঞ্ছিত না-ভেবে রবীন্দ্রগ্রন্থ প্রাপ্তির সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল এদেশবাসী।”
বাংলা ভাষা ও জাতিসত্তা রক্ষার লড়াইয়ে এ ভাবেই জড়িয়ে পড়ছেন রবীন্দ্রনাথ— পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেও হয়ে উঠছেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের ঢাল ও হাতিয়ারও— বোঝা যায় সন্জীদার লেখায়। এই প্রসঙ্গেই এসেছে পাকিস্তান আমলের ঢাকায় বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমি, ছায়ানট-এর মতো সঙ্গীতবিদ্যায়তনের কথা, শাসকের নিষেধ যাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নৃত্যনাট্য ইত্যাদির চর্চা থেকে নিরস্ত করতে পারেনি। সরকারের অসন্তোষ ও বিরোধিতার মুখেও ১৯৬১-তে রবীন্দ্রশতবর্ষ পালনে উদ্যোগ করেন ও-পারের বাঙালি অধ্যাপক সাংবাদিক শিল্পী এমনকি ব্যবসায়ীরাও; ‘এ সব কী হচ্ছে?’— চিফ সেক্রেটারির প্রশ্নের মুখে “সুফিয়া কামালের শান্ত অকম্পিত কণ্ঠের উত্তর ছিল— ‘সারা পৃথিবীতে যা হচ্ছে, এ-ও তাই’।”
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বাঙালির এই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ ধরা এ-বইয়ে, এ-প্রাপ্তির তুলনা নেই। তবে, প্রবন্ধগুলির কোনটি কবে কোথায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, সেই সূত্রগুলি পেলে কাজে দিত আরও।