Independence of America

আড়াইশো বছরের দেশ

দেশটার প্রচুর প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ তো ছিলই, তার সঙ্গে তার অবস্থান ছিল এশিয়া এবং ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে বহু দূরে— অতলান্তিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের রক্ষাকবচে, মোটামুটি নিরাপদে।

অতনু বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৪৭
সাক্ষী: তেরোটি আমেরিকান প্রদেশের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র। মায়ামি হিস্ট্রি মিউজ়িয়মের প্রদর্শনীতে। রয়টার্স

সাক্ষী: তেরোটি আমেরিকান প্রদেশের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র। মায়ামি হিস্ট্রি মিউজ়িয়মের প্রদর্শনীতে। রয়টার্স

আজ আমেরিকার স্বাধীনতার আড়াইশো বছর পূর্ণ হল। কী ভাবে একটা কৃষিপ্রধান, সর্বার্থে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন দেশ হয়ে উঠল অর্থনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ— এই যাত্রাপথ সত্যিই বিচিত্র। এর মধ্যে সম্পৃক্ত রয়েছে ভূখণ্ড সম্প্রসারণ, দাসপ্রথার বিভীষিকা, ‘গিল্ডেড এজ’, মহামন্দা এবং বিশ শতকে ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আমেরিকার উত্থানের আখ্যান। রয়েছে অর্থনৈতিক পরিবর্তন, জাতিগত উত্তেজনা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবর্তনশীল ‘আমেরিকান ড্রিম’। সে দেশে বিবিধ সামাজিক জটিলতা, বর্ণ-দ্বন্দ্ব এবং ধর্মান্ধতা এখনও খুঁজে পাওয়া যাবে জটিল মিশ্র সমাজের শোণিতপ্রবাহে।

দেশটার প্রচুর প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ তো ছিলই, তার সঙ্গে তার অবস্থান ছিল এশিয়া এবং ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে বহু দূরে— অতলান্তিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের রক্ষাকবচে, মোটামুটি নিরাপদে। আমেরিকা বহু যুদ্ধ লড়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুদ্ধটাকে নিয়ে ফেলতে পেরেছে প্রতিপক্ষের মাটিতে। তাই দু’টি বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও পার্ল হারবারের ঘটনাটি ছাড়া তার নিজের জমিতে তেমন আঁচড় পড়েনি।

সম্পদ এবং নিরাপত্তা— এই দুইয়ের যৌথ প্রভাবেই সেই কবে থেকে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে অভিবাসীরা এসে জড়ো হয়েছেন এই স্বর্গরাজ্যে। সাম্প্রতিক অতীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের প্রতি খড়্গহস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রশাসন মোটের উপরে অভিবাসনকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখেছে। বাঁচার তাগিদে এই সব অভিবাসী উজাড় করে দিয়েছেন তাঁদের শ্রম ও দক্ষতা। ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে দেশটাই। অভিবাসীদের মধ্যে দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোগপতি, খেলোয়াড়— কে নেই! এঁরা নোবেল আনেন, গড়ে তোলেন সফল ব্যবসা, এমনকি কেউ হয়ে ওঠেন বিশ্বের ধনীতম মানুষ।

স্বাধীনতা-উত্তর দিনগুলিতে দেশগঠনে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের দক্ষ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে কিন্তু ভুললে চলবে না। এই ‘ফাউন্ডিং ফাদারস’রা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে গ্রেট ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আমেরিকান বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, অর্জন করেছিলেন স্বাধীনতা এবং গড়ে তুলেছিলেন আমেরিকান সরকারের কাঠামো। ঘটনাচক্রে অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতির মহাগ্রন্থ অ্যান এনকোয়ারি ইনটু দ্য নেচার অ্যান্ড কজ়েস অব দ্য ওয়েলথ অব নেশনস-এর প্রকাশকাল এবং আমেরিকার স্বাধীনতা প্রায় সমসাময়িক। এই এপ্রিলে ছিল বইটির ২৫০ বছর। আমেরিকার অগ্রগতির ইতিহাসের সঙ্গেও সূক্ষ্ম ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বইটি। আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের কয়েক জন বইটি পড়েছিলেন এবং প্রভাবিতও হয়েছিলেন।

অ্যাডাম স্মিথ যুক্তি দিয়েছিলেন, জনসাধারণের জন্য সরকারের এমন কিছু কাজ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা বাজার কখনও সরবরাহ করবে না— যেমন ন্যায়বিচার, জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং বন্দর বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পরিকাঠামো। সম্পদের সাধনাকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবে আমেরিকার ফুলেফেঁপে ওঠার মধ্যে ছিল এই ভারসাম্যটুকু। আত্মজীবনীতে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম গণগ্রন্থাগার, স্বেচ্ছাসেবী দমকল বাহিনী এবং পাকা রাস্তাঘাট তৈরির বিবরণ দিয়েছেন। তার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে একেবারে গোড়া থেকে একটি সমাজ গড়ে ওঠার ছবি।

তবে আমেরিকার সমৃদ্ধি অনুধাবন করতে গেলে এর ভিত্তিমূলে নিহিত স্ববিরোধিতাগুলোর দিকেও দৃষ্টিপাত আবশ্যক। আর সেই স্ববিরোধিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল সাহিত্য। ফ্রেডেরিক ডগলাসের ১৮৪৫ সালের আত্মজীবনী ন্যারেটিভ অব দ্য লাইফ অব ফ্রেডরিক ডগলাস, অ্যান আমেরিকান স্লেভ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে দাসপ্রথার নির্মম বাস্তবতার এক অকৃত্রিম ও প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরে। দেখায়, কী ভাবে ‘স্বাধীনতা’র আদর্শকে সমুন্নত রাখার দাবি সত্ত্বেও প্রারম্ভিক আমেরিকান অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল মূলত শোষণের ভিত্তিতেই।

মার্ক টোয়েন ও চার্লস ডাডলি ওয়ার্নারের ১৮৭৩-এর দ্য গিল্ডেড এজ: আ টেল অব টুডে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়নের এমন এক ছবি এঁকেছে, যা রেলপথের সম্প্রসারণ, জমি-সংক্রান্ত ফটকাবাজি এবং নোংরা রাজনীতির উপর দাঁড়িয়ে। বইটি দেখিয়েছে, কী ভাবে ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আমেরিকা দ্রুত কর্পোরেট পুঁজিবাদের যুগে প্রবেশ করল এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল।

এর অর্ধ শতক পরে, ১৯২৫-এ, এফ স্কট ফিট্‌জেরাল্ড লিখলেন দ্য গ্রেট গ্যাটসবি। এর মূল বিষয়বস্তু ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর অবক্ষয় এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি। ‘জ্যাজ় এজ’-এর চাকচিক্যময় আবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নৈতিক শূন্যতার অন্বেষণ করেছেন ফিট্‌জেরাল্ড। তার পর এল মহামন্দা। জন স্টেনবেকের কালজয়ী সৃষ্টি দ্য গ্রেপস অব র‌্যাথ (১৯৩৯) তুলে ধরে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে সাধারণ আমেরিকানদের দুর্দশার চিত্র। উঠে আসে আধুনিকায়নের মাঝেও দারিদ্র, অভিবাসন, শ্রম-সংক্রান্ত সমস্যা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ছবি। সাহিত্যের এই দলিলগুলি দেখিয়ে দেয়, আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান যতটা বাস্তব, তার অন্তর্লীন সামাজিক টানাপড়েনও ততটাই বাস্তব।

ধনতন্ত্রের সাধনা করে কালের প্রবাহে সম্পদে, শক্তিতে বিশ্বের নেতা হয়ে ওঠে আমেরিকা। নানান আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলা এবং তাদের পরিচালনায় আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সে জন্য বিপুল অর্থও ব্যয় করেছে। সেই সঙ্গে হয়ে উঠেছে বহু দেশের নির্ভরযোগ্য সহযোগী। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর— বিশেষত গত পঞ্চাশ-ষাট বছরের— ক্ষয়িষ্ণু ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি; সোভিয়েট ইউনিয়নের ভেঙে পড়া ও মহাশক্তি হিসাবে চিনের উত্থান; ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ— এই সবই আমেরিকার বৈশ্বিক গুরুত্ব এবং অবস্থানকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক নেতৃত্বের যে জায়গা, কিংবা সহযোগীদের মধ্যে বিশ্বাসের যে বন্ধন অর্জন করেছে আমেরিকা, তাকে লালন করতে হয় সযত্নে। নইলে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ট্রাম্পের জমানায় আমেরিকার বিশ্ব-নেতৃত্বে এবং কয়েক জন বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কে টান ধরেছে বইকি।

বারবারা কিংসলভারের ২০২২ সালের উপন্যাস ডেমন কপারহেড গ্রামীণ আমেরিকা, দারিদ্র এবং আফিম সঙ্কটের এক শক্তিশালী সমকালীন চিত্রায়ণ। অনেক সমালোচকের মতে, ভবিষ্যতের পাঠকেরা হয়তো ডেমন কপারহেড-এর দিকে ঠিক সে ভাবেই ফিরে তাকাবেন, যে ভাবে আমরা এখন দেখি দ্য গ্রেপস অব র‌্যাথ-কে— আমেরিকার ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের গভীর সামাজিক সঙ্কটের সাহিত্যিক দলিল হিসাবে।

২৫০ বছরে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে আমেরিকা— তার সামাজিক পরিস্থিতি? মনে করা যাক ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জো বাইডেনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের কথা। ক্যাপিটল হিলে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী কবি আমান্ডা গোরম্যান। ‘দ্য হিল উই ক্লাইম্ব’ শিরোনামের সেই উদ্বোধনী কবিতায় তিনি এমন এক জাতির চিত্র তুলে ধরেছিলেন, যা “ভেঙে পড়েনি, বরং কেবল অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।”

আমেরিকার স্থপতিরা অত্যন্ত কড়া নিয়মের শিকলে ধনতন্ত্রের ছাঁচে বেঁধেছিলেন দেশটার নিয়মকানুন। তাতে ফুলেফেঁপে উঠেছে দেশ— প্রাচুর্যে, ক্ষমতায়। কিন্তু সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সেই সমৃদ্ধির ভিতরেও বরাবর ছিল দাসপ্রথা, বৈষম্য, বর্ণবিদ্বেষ, অর্থনৈতিক অসাম্য এবং নৈতিক টানাপড়েনের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই কারণেই ট্রাম্পের উত্থানকে কোনও বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা বলে দেখা যায় না; বরং তা আমেরিকার দীর্ঘ সামাজিক যাত্রাপথেরই একটি নতুন অধ্যায়। আমেরিকার সাফল্য কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক শক্তি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে নয়; তার শক্তি ছিল নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষমতায় এবং নিজস্ব সঙ্কটের মুখোমুখি হওয়ার সাহসে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাতেও যে ফাঁকফোকর রয়েছে, ট্রাম্প-পর্ব তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সে কারণেই বোধ হয় আমেরিকার সাফল্য আজও অসম্পূর্ণ।

রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা

আরও পড়ুন