নতুন সরকারের কাছ থেকে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা আইনের শাসন এবং শিল্পের অগ্রগতি। আইনের শাসন কায়েম করার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। ধরে নিচ্ছি, বর্তমান শীর্ষনেতৃত্বের সেই সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মনের সদিচ্ছা বাস্তবে প্রয়োগ করতে গেলে দলের কর্মীদের ধারাবাহিক ভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। এর জন্য দরকার, উপরতলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত শীর্ষনেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
কাজটা বিজেপির পক্ষে তেমন কঠিন হত না, যদি তারা সেই পুরনো ভাবাদর্শ-চালিত সঙ্ঘবদ্ধ দল হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু দলের পরিধি ও পরিসর যত বেড়েছে, তত নানা ধরনের চরিত্র দলে প্রবেশ করেছে। ফলে শৃঙ্খলারক্ষার কাজটাও আর ততটা সরল নেই। তা ছাড়া পালাবদলের পরে বিজিত দলের কিছু সৈন্য ও সেনাপতি বিজয়ী দলে ঢোকার জন্য ক্রমাগত ফাঁকফোকর খুঁজছে। এই স্বার্থান্বেষীদের যত কম প্রশ্রয় দেওয়া হবে, আইনের শাসন কায়েম হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
তবে আইনের শাসন কায়েম হলেই যে শিল্পের অগ্রগতি ঘটবে, এমন নয়। শিল্পে বড় বিনিয়োগ টানার জন্য আইনের শাসন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু অন্য আরও কিছু শর্তও পালন করতে হয়। বর্তমান শিল্প-সম্ভাবনার মূল্যায়ন করতে গেলে জানা দরকার, তৃণমূল সরকার এই শর্তগুলি কতটা পালন করতে পেরেছিল, কতটা পারেনি। জানা দরকার, গত পনেরো বছরে রাজ্যের শিল্প কোথায় দাঁড়িয়েছে।
বলা হচ্ছে, তৃণমূলের রাজত্বে শিল্পক্ষেত্রে প্রভূত অবনতি ঘটেছে, হাজার হাজার সংস্থা রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছে, বড় বিনিয়োগ শূন্যে এসে ঠেকেছে। প্রকৃত ছবিটি কী, তা বোঝার জন্য আমরা ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটে দেওয়া পরিসংখ্যান ব্যবহার করব, যে পরিসংখ্যান সারা ভারতে গ্রহণযোগ্য। এই পরিসংখ্যানের সাহায্যে দু’টি সহজ মাপকাঠির দিকে তাকানো যাক। এক, সারা ভারত শিল্প-উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের অংশ। দুই, ভারতের মোট শিল্প-পুঁজিতে পশ্চিমবঙ্গের অংশ।
২০১১-১২ অর্থবর্ষে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সময়, সারা ভারত শিল্প-উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ ছিল ৭.১% এবং সারা ভারত ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন-শিল্পে ৪.৯%। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পৌঁছে এই অনুপাত দু’টি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৭.৩% এবং ৫.২%। মধ্যবর্তী বছরগুলিতে কখনও এই অনুপাতগুলি বেড়েছে, কখনও কমেছে, তবে খুব বড় ওঠা-নামা কখনও ঘটেনি। মোটের উপরে, তৃণমূলের রাজত্বে সারা ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-উৎপাদন মোটামুটি একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার কোনও উল্লেখযোগ্য অবনতি বা উন্নতি দেখা যায় না। একই ভাবে, সর্বভারতীয় শিল্পক্ষেত্রের পুঁজিতেও পশ্চিমবঙ্গের অবদান গত পনেরো বছরে খুব একটা বদলায়নি— তা মোটামুটি ৪ শতাংশের সামান্য নীচে ঘোরাফেরা করেছে।
শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে অবশ্য পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে না। বলা দরকার, তৃণমূল আমলে বড় উদ্যোগপতিদের খুব বেশি বিনিয়োগ করতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-মানচিত্রের বড় অংশ জুড়ে ছিলেন অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পোদ্যোগীরা। অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগীদের অধিকাংশেরই উৎপাদনশীলতা কম, বিনিয়োগ যৎসামান্য। তাঁরা কোনও রকমে টিকে আছেন। ফলে শিল্পক্ষেত্রে গড় আয় বা লাভের হারও বেশ কম। পশ্চিমবঙ্গে এটা নতুন ব্যাপার নয়। বাম আমলেও ছবিটা অনেকটা এমনই ছিল। জোর দিয়েই বলা যায়, বড় বিনিয়োগ না এলে কম আয়ের সমস্যা মেটে না। বড় বিনিয়োগের সঙ্গে আসে অনুসারী শিল্প, নতুন প্রযুক্তি এবং যন্ত্রাংশের বর্ধিত চাহিদা। ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগীরাও তার সুফল পান। একমাত্র তখনই তাঁদের আয়বৃদ্ধি ঘটতে পারে। অতএব প্রশ্ন হল, তৃণমূল বড় বিনিয়োগ আনতে পারেনি কেন?
ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূল সরকার জঙ্গি শ্রমিক সংগঠনগুলির দাপট কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। বাম আমলে ধর্মঘট ও লকআউটের কারণে লক্ষ লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে। গত পনেরো বছরে নষ্ট শ্রমদিবসের সংখ্যা কার্যত শূন্য। এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তবু বড় বিনিয়োগ তেমন ভাবে এল না কেন? এর একটি কারণ নিশ্চয় তৃণমূল স্তরে আইনের শাসনের অভাব। কিন্তু স্থানীয় অরাজকতা ও তোলাবাজি ছোট ব্যবসাদারদের যতটা আঘাত করে, বড়দের ততটা করে না। বড়দের বোঝাপড়া হয় শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, তৃণমূল শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে বড় বিনিয়োগকারীদের তেমন বোঝাপড়া হল না কেন?
যে-হেতু সিঙ্গুর আন্দোলন এবং টাটাদের নিষ্ক্রমণের মধ্য দিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল, তাই বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষনেতৃত্বের একটি প্রাথমিক অবিশ্বাসের সম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা যেত, যদি শীর্ষনেতৃত্ব বার্তা দিতে পারতেন যে, তাঁরা সত্যিই বড় বিনিয়োগ আনতে উৎসাহী।
বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে গেলে তাঁদের নানা রকম আর্থিক উৎসাহ ও ভর্তুকি দিতে হয়। বিশেষত এই কারণে যে, অন্যান্য রাজ্যও সেই একই কাজ করে। সিঙ্গুরে গাড়ির কারখানা তৈরি করার জন্য টাটাদের নানা রকম ভর্তুকি ও সুবিধা দিতে হয়েছিল। তামিলনাড়ুতে অটোমোবাইল হাব গড়ে উঠেছে বিপুল করছাড়, স্ট্যাম্প ডিউটি মকুব, কম সুদে ঋণ, পরিবেশ সুরক্ষায় ভর্তুকি এবং আরও নানা উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে।
তৃণমূল সরকার বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কোনও আর্থিক উৎসাহ দেয়নি। এমনকি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলেরও অনুমতি দেয়নি, পাছে তার অন্তর্গত সংস্থাগুলিকে বিশেষ সুবিধা দিতে হয়। এক সময় ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পোদ্যোগীরা কিছু ভর্তুকি পেতেন, পরে সেটিও তুলে নেওয়া হয়। বিনিয়োগে আর্থিক উৎসাহ দেওয়ার বদলে বছরের পর বছর বিজ়নেস সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে লাভ হয়নি। হওয়ার কথাও নয়।
বস্তুত, যে টাকাটা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক উৎসাহ দেওয়া যেত, সেটি অত্যন্ত সচেতন ভাবেই পিছিয়ে-পড়া মানুষদের সরাসরি অনুদান দেওয়ার কাজে খরচ হয়েছে। এটি তৃণমূল শীর্ষনেতৃত্বের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, আবার নিছক ভোটের রাজনীতিও হতে পারে। কিন্তু একটি কথা স্পষ্ট— আর্থিক উৎসাহ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত লগ্নিকারীদের এই বার্তাই দিয়েছে যে, বিনিয়োগ আকর্ষণের ব্যাপারে সরকারের বিশেষ সদিচ্ছা নেই।
বিনিয়োগ-বান্ধব দল হিসাবে বিজেপির সুনাম আছে। কিন্তু শুধু সেই সুনাম ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার রাজ্যে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারবে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গেলে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক উৎসাহ দিতেই হবে। নতুন সরকার এর মধ্যেই ঘোষণা করেছে, পুরনো সামাজিক প্রকল্পগুলির কোনওটিই বন্ধ হবে না। বরং কিছু প্রকল্পে দ্বিগুণ অর্থ দেওয়া হবে। তার মানে, বিনিয়োগে আর্থিক উৎসাহ দিতে বাড়তি টাকা প্রয়োজন। সে টাকা কোথা থেকে আসবে?
তিনটি আলাদা খাত থেকে বাড়তি অর্থ আসতে পারে। প্রথমত, রাজ্য সরকারের যে ন্যায্য প্রাপ্যগুলি কেন্দ্র এত দিন আটকে রেখেছিল, এ বার সেগুলি সম্ভবত মিটিয়ে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, আয়ুষ্মান ভারতের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের যে প্রকল্পগুলি তৃণমূল সরকার রাজ্যে চালু করতে দেয়নি, তাদের পরিবর্তে রাজ্যের নিজস্ব প্রকল্প চালানো হয়েছে, সেগুলি এখন চালু হলে রাজ্য সরকারের টাকা বাঁচবে। তৃতীয়ত, রাজ্য বিজেপির নেতারা ইতিমধ্যেই দিল্লির কাছে এককালীন আর্থিক সাহায্যের দাবি জানিয়েছেন। সেটি পাওয়া গেলে রাজ্য সরকারের কোষাগারে আরও কিছু অর্থ আসবে। ডাবল এঞ্জিন সরকারের আবহে আশা করা যায়, শিল্পায়নের জন্য অর্থের অভাব হবে না, সদিচ্ছারও না।
কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গে সমষ্টিগত ভাবাদর্শ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলে এত দিন তা ছিল বাম-ঘেঁষা ও ধর্মনিরপেক্ষ। এই সমষ্টিগত ভাবাদর্শ কি রাতারাতি বদলে গিয়ে দক্ষিণপন্থী ও ধর্ম-নির্ভর হয়ে যেতে পারে? শিল্পায়নের জন্য শহর-মফস্সল পরিষ্কার রাখা দরকার। সেই অজুহাতে বুলডোজ়ার ফিরে এসেছে। উচ্ছেদ ফিরে এসেছে। গরিব মানুষের জীবিকায় টান পড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে ধর্মীয় আবেগকে ছাপিয়ে উন্নয়ন বনাম উচ্ছেদের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না তো?