দুই কিস্তিতে প্রবন্ধ লিখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী, ‘প্যালেস্টাইন প্রাসঙ্গিক’ ও ‘প্যালেস্টাইনে হেরফের’ শিরোনামে—প্রবাসী পত্রিকায়, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের কার্তিক-অগ্রহায়ণ সংখ্যায়। পত্রিকার ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ অংশে সম্পাদকীয় মন্তব্যে লেখা হয়: “আরব ও ইহুদি উভয় পক্ষ আপোষে বিবাদ নিষ্পত্তি করিয়া লইতে পারিলে তাহাই সর্বোত্তম মীমাংসা।… কয়েক মাস আগে ডক্টর অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী প্যালেস্টাইন দেখিয়া আসিয়াছেন। প্রবাসীর বর্তমান সংখ্যায় প্রকাশিত তাহার লেখা হইতে প্যালেস্টাইন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানলব্ধ কিছু তথ্য পাওয়া যাইবে।” অশান্ত প্যালেস্টাইনের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে আসার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক বিদ্যাজীবী সুধীজনকে সে দেশে পাঠান। সেই সূত্রে অমিয় চক্রবর্তীর এই ভ্রমণ, প্রবাসী-তে প্রতিবেদন, গুরুদেবকে সবিস্তার মতামত জ্ঞাপন। ‘টেল আভিভ, ৮ই জুলাই, ১৯৩৭’ দিয়ে শুরু লেখাটির মূল সুর বাঁধা ইহুদি অভিবাসীদের পক্ষে, তবুও তিনি এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে নিরপেক্ষ, স্পষ্টবাদী: “দু-হাজার বছর আগে কোন্ দেশ কার ছিল তাই নিয়ে আজকের দিনে কি ভাগ-বাটোয়ারা চলতে পারে?... এই একটা দেশ যেখানে অনতিবিলম্বে সোশালিষ্ট-রাষ্ট্র না গড়লে দুঃখের অন্ত থাকবে না।”
এই দূরদর্শিতা কী ভাবে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল, সে কথা নতুন করে মনে করানো নিষ্প্রয়োজন। তবে বিস্মৃতির অসুখে সদা সুখী বাঙালিকে বোধ হয় কবি, বিশ্বভ্রামণিক, অধ্যাপক ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসচিব অমিয় চক্রবর্তীর কথা মনে করিয়ে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। “মেলাবেন, তিনি মেলাবেন” (মূল কবিতা ‘সংগতি’) পঙ্ক্তিটি প্রায় প্রবাদে পরিণত হলেও এর রচয়িতা অমিয় চক্রবর্তীর কথা আমরা ভুলতে বসেছি। রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মধ্যে সম্পর্কের অন্যতম সেতু ছিলেন তিনি। পারস্য ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ তেহরানে ১৯৩২-এর ৬ মে সফরসঙ্গী অমিয় চক্রবর্তীকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘পথসঙ্গী’ কবিতা। হাজারীবাগের বাড়িতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন অসমবয়সি বন্ধু অমিয়র পোর্ট্রেট। জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসুর পরম সুহৃদ ছিলেন; কবি ইকবাল ছাড়াও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, বিনোবা ভাবে, দেবদাস গান্ধীর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল অন্তরের যোগ।
কৈশোরে গল্পকার জেরোম কে জেরোমের পত্রবন্ধু হয়ে ওঠা অমিয় চক্রবর্তীর সারা জীবনের অর্জন জর্জ বার্নার্ড শ, রমাঁ রল্যাঁ, আলবার্ট আইনস্টাইন, ওপেনহাইমার, এইচ জি ওয়েলস, উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, টি এস এলিয়ট, এজ়রা পাউন্ড, বরিস পাস্তেরনাক, টমাস মান, স্টেলা ক্রামরিশ প্রমুখ মনস্বীর সখ্য। জেমস জয়েস নিজের বই ডাবলিনারস উপহার দেন অমিয়কে। আফ্রিকায় আলবার্ট শোয়াইটজ়ারের সেবাকেন্দ্রে আতিথ্য গ্রহণে অভিভূত অমিয় লিখেছিলেন ‘সন্ত অ্যালবার্ট’ কবিতা। সমগ্র পৃথিবীর প্রকৃতি ও মানুষ তাঁর অন্তর্দৃষ্টির উঠোনে উপস্থিত থেকেছে আত্মজনের গভীরতায়। ‘বিশ্ববাঙালি’ তাঁর যথার্থ বিশেষণ।
রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতার সঙ্গে তাঁর নাম চিরলগ্ন হয়ে আছে। বিশ্বকবির সঙ্গে আফ্রিকার আদি সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালনে এতটুকু ধৈর্য হারাননি অমিয়। মুসোলিনির অত্যাচারে তখন পিষ্ট আবিসিনিয়া, সম্রাট হাইলে সেলাসি স্বেচ্ছানির্বাসনে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৩৬-এর ১৭ নভেম্বর অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে আফ্রিকা সম্বন্ধে জানিয়ে শেষে লেখেন, “আমার কেবলি মনে হচ্ছিল আফ্রিকার এই ‘ট্রাইব ইটার্নাল’ নিয়ে আপনি যদি একটি কবিতা লেখেন। আফ্রিকার সম্পর্কে আপনার কোনো কবিতা নেই— এইরকম কবিতা পেলে কীরকম আনন্দ হবে বলতে পারি না।”
তাঁর তাগাদায় উদাসীন থাকতে পারলেন না কবি। লিখলেন ‘আফ্রিকা’ কবিতা, ১৯৩৭-এর ফেব্রুয়ারিতে। কবিতা পেয়ে অমিয় তাঁর উচ্ছ্বাস গোপন রাখেননি, উগান্ডার রাজপুত্র নিয়াবঙ্গোর পরামর্শে গুরুদেবকে দিয়ে কবিতার ইংরেজি তরজমাও করিয়ে নেন। সম্রাট হাইলে সেলাসি সোয়াহিলি ভাষায় তা অনুবাদ করিয়ে ছড়িয়ে দেন সারা আফ্রিকায়। অমিয় চক্রবর্তীর নিজের কবিতাতেও আফ্রিকার অনুষঙ্গ এসেছে বার বার।
তাঁর পনেরোটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য খসড়া, একমুঠো, দূরবাণী, পারাপার, পালা-বদল, অনিঃশেষ, নতুন কবিতা ইত্যাদি প্রকাশিত হয় ১৯৩৮-৮০’র মধ্যে। ১৯৮৬-র ১২ জুন প্রয়াণের আগে পর্যন্ত প্রকাশিত দুই খণ্ড কবিতাসংগ্রহ, দু’টি গদ্যের বই, দশটি ইংরেজি বই। স্বদেশ-বিদেশ মিলিয়ে অন্তত দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। পেয়েছেন আলবার্ট শোয়াইটজ়ার পদক, ইউনেস্কোর বিশেষ পুরস্কার, দেশিকোত্তম, পদ্মভূষণ।
বেশি প্রবন্ধ লেখেননি। বরং তাঁর গদ্যের শতজল ঝর্নার ধ্বনি কয়েক হাজার চিঠির ভুবনে। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিগুলি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন নরেশ গুহ; বুদ্ধদেব বসু, জগদীশ ভট্টাচার্য ও শিবনারায়ণ রায়কে লেখা অমিয়-পত্র প্রকাশ্যে এসেছে। অসংখ্য চিঠি থেকে তাঁর ‘আত্মচরিতের খসড়া’র একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন নরেশ গুহ, সেও এখন গ্রন্থাকারে লভ্য। কালের গহ্বরে বিলীন যে অজস্র পত্রসাহিত্যের নমুনা, তাদের জন্য শোক করবে এমন কৌতূহলী ধ্রুপদী পাঠক ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছেন। তা না হলে বিশ্বপথিক অমিয় চক্রবর্তীর ১২৫ বছর এ ভাবে ভুলে থাকা যায়?