বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল বিশ্লেষণ করতে বসে প্রথম ও প্রধান কথাটি নিয়ে সম্ভবত কোনও সন্দেহ থাকে না। এই নির্বাচন বার করে আনল তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালের বিষয়ে রাজ্যবাসীর ক্ষোভ-ক্রোধ চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছনোর ছবি। এক দিকে মন্ত্রী-নেতা-উচ্চস্তর কর্মীদের লাগামছাড়া দুর্নীতি; অন্য দিকে দলপোষিত তোলাবাজি-সিন্ডিকেট। পাশাপাশি শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক মানব-পরিকাঠামো যে কার্যত ভেঙে পড়তে দেখা গিয়েছে, তার পিছনেও এই দ্বৈত কারণ। একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা প্রভাব ফেলেছে অন্য ক্ষেত্রগুলির উপরেও। যেমন, সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্য স্কুল শিক্ষক নিয়োগে যে বিপুল দুর্নীতির সাক্ষী থেকেছে, তার প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা। অসাধু পথে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের অপসারণের ফলে বহু স্কুলে শিক্ষকের ঘাটতি হয়েছে; আবার, দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকাতেও ক্ষতি হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতার আরও একটি বড় নিদর্শন ২০২৪ সালের আর জি কর-কাণ্ড। সে কাণ্ডের পিছনেও ছিল সামূহিক দুর্নীতি— যা চলেছিল শাসক দলের প্রশ্রয়ে। আর জি কর ঘটনা মর্মান্তিক, কিন্তু একক দৃষ্টান্ত নয়। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও হাসপাতালে গেলেই একই প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবি চোখে পড়তে পারে— যে ব্যর্থতা রোগের শিকড়ে পৌঁছতে গেলে উল্লিখিত ঠিক একই দ্বৈত হেতু চোখে পড়ে। বহু ব্যয়ে কেনা অত্যাধুনিক যন্ত্র পড়ে থাকে অবহেলায়, রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষা করাতে হয় বাইরের নির্দিষ্ট কোনও বেসরকারি পরীক্ষাকেন্দ্রে; হাসপাতালের ফার্মাসি থেকে সরকারি ওষুধ চালান হয়ে যায় বাইরে, সাদা কাগজে লিখে দেওয়া ফর্দ অনুসারে রোগীর পরিজনকে সে ওষুধ কিনে আনতে হয় বাইরের দোকান থেকে— এই সবই দুর্নীতি এবং তোলাবাজির বিবিধ প্রকরণ।
একই কারণে রাস্তা তৈরির জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ বিভিন্ন স্তরে ‘কাটমানি’ দিতে খরচ হয়ে যায়, ফলে তৈরি হওয়ার পরের দিনই রাস্তা বেহাল হয়। কয়লা থেকে গরু, জঙ্গলের কাঠ থেকে নদীর বালি, ভেড়ির মাছ থেকে বন্যাত্রাণের ত্রিপল, সবই এই আমলে হয়ে উঠেছিল দলীয় মনসবদারদের জন্য অর্থকরী সম্পদ। যিনি যতখানি এলাকা গায়ের জোরে অথবা রাজনৈতিক প্রতিপত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন, তত দ্রুত তাঁর আর্থিক উন্নতি ঘটেছে। চোখের সামনে লাগাতার এই বিপুল দুর্নীতি ঘটতে দেখলে এক সময় যে তা মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়ায়, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সে কথার সাক্ষ্য বহন করছে। শাসক দলের শীর্ষ নেতারা হয় এই দুর্নীতি দেখেননি, অথবা দেখেও অগ্রাহ্য করেছেন।
তবে, সার্বিক ভাবে ভারতীয় রাজনীতি, এবং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে সাক্ষী মানলে বলতে হয়, এমন দুর্নীতিতে মানুষ বিরক্ত হলেও সচরাচর তার প্রভাব ভোটবাক্সে পড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে অপশাসনের যে মাত্রাটি ডুবিয়েছে, তা হল, তারা সাধারণ মানুষকে দলের জুলুম থেকেই রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সন্দেশখালি-কাণ্ডের কথা এখনও গণস্মৃতিতে রয়েছে, যেখানে গভীর রাতে বাড়ির মহিলাদের তুলে আনা হত শাসক-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের ফাইফরমাশ খাটতে। রাজ্যে কান পাতলেই শোনা যায়, কী ভাবে একশো দিনের কাজ থেকে আবাস যোজনার বরাদ্দ, যে কোনও টাকা হাতে পেতে আগে কাটমানি দিতে হয়। টোটোচালক থেকে বাজারের খুচরো ব্যবসায়ী, প্রত্যেকেই বলবেন, কী ভাবে শাসক দলের নেতাদের হাতে কোনও কোনও দিন রোজগারের গোটা টাকাটাই তুলে দিতে বাধ্য হতেন তাঁরা। স্থানীয় স্তরের এই অত্যাচার বন্ধ করার চেষ্টাই রাজ্য প্রশাসন করেনি। পুলিশ চোখ বন্ধ করে থেকেছে; দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিচু তলার নেতাদের সতর্ক করেননি, শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা। এই নির্বাচনেও এমন অনেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগের পাহাড় জমেছে। ফল পরিষ্কার। মানুষ ক্ষমা করেননি।