বিজ্ঞান নিয়ে লেখার চ্যালেঞ্জ: বিশ্লেষণ থাকবে, বোধগম্যও হবে
Books On Science

বিজ্ঞান-লেখকের দরবারে

তথ্যের যাথার্থ্যে এবং সেটাকে প্রকাশ করবার যাথাযথ্যে বিজ্ঞান অল্পমাত্রও স্খলন ক্ষমা করে না।... বস্তুত আমি কর্তব্যবোধে লিখেছি কিন্তু কর্তব্য কেবল ছাত্রের প্রতি নয়, আমার নিজের প্রতিও।” বিশ্বপরিচয় গ্রন্থের ‘উৎসর্গ’ অংশে এ কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ০৫:২১

ঘটনা এক: প্রকাশকের কাছে প্রবন্ধকার পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণা-জগতের কিছু নির্বাচিত ঘটনার বিবরণ ও বিশ্লেষণ দিয়ে পাণ্ডুলিপি সাজানো। কিন্তু প্রকাশকের মনে হল এই লেখা পাঠকের পছন্দ হবে না, কারণ লেখায় যথেষ্ট নাটকীয়তা নেই। যে ধরনের লেখা তাঁর পছন্দ, তার একটি উদাহরণ তুলে ধরলেন— যা শুরু হচ্ছে এক-এক জন বিজ্ঞানী ও তাঁর সহকারীর মধ্যে কাল্পনিক কথোপকথন দিয়ে। লেখক সংশয়ে পড়ে গেলেন— বিজ্ঞানের লেখাকে শুধু মনোগ্রাহী করার জন্য কি কাল্পনিক বিষয় বা সংলাপের অবতারণা মঞ্জুর করা যায়?

ঘটনা দুই: খ্যাত সংখ্যাবিদ শকুন্তলা দেবী যে শুধু সংখ্যার জাদুকর ছিলেন না, গণিতবিদ ছিলেন, এমন শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল আন্তর্জালিক একটি পত্রিকায়। কিন্তু পড়ে দেখা গেল, শকুন্তলা দেবীর বিষয়ে বহুপ্রচলিত তথ্যগুলোই সেখানে রয়েছে, লেখক কেন তাঁকে গণিতবিদ বলতে চাইছেন সে বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যাই নেই। লেখককে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গায় শকুন্তলা দেবীকে গণিতবিদ বলা হয়েছে তাই তিনিও বলেছেন, এর বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় তাঁর নেই।

এই দু’টি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় বিজ্ঞানের লেখালিখি বিষয়ে আমাদের বেশ কিছু চিন্তাভাবনা ও সংশয়ের মধ্যে ঢুকে পড়তে হয়, যা থেকে এই লেখার অঙ্কুরোদ্গম। সেই সংশয় প্রথমত পাঠকের অবস্থান নিয়ে— যে কারণে প্রকাশক মনে করেছেন যে যথেষ্ট নাটকীয় (অর্থাৎ তরল) না হলে সে লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছবে না। দ্বিতীয়ত, লেখকের দায়বদ্ধতার অভাব; যা নিয়ে লিখতে চলেছেন সে বিষয়ে নিজের ধারণাই স্পষ্ট নয়। এই কথাগুলো আসলে যে কোনও ভাষায় সাধারণের উপযুক্ত করে যে কোনও বিষয়কে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। এই ব্যাপারে এখনও যে ‘পাঠ্য’ মাধ্যমের বিকল্প নেই, সদ্যসমাপ্ত বইমেলার ব্যাপ্তির দিকে তাকিয়ে সে কথা স্বীকার করতেই হয়। তবে নিজে বিজ্ঞান নিয়ে বাংলায় লেখা প্রবন্ধ নিয়মিত পড়া ও কিছুটা লেখালিখির মধ্যে থাকায় এই আলোচনা বিজ্ঞানের প্রবন্ধেই সীমাবদ্ধ রাখা যাক।

প্রথমে দেখে নেওয়া যাক বাংলায় বিজ্ঞানের লেখা কত রকমের হতে পারে আর কোন লেখার পাঠক কারা। পাঠ্যপুস্তকের লেখা বাদ দিলে, বিষয়বস্তুর বিচারে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা প্রথমত হতে পারে বস্তুমুখী, মানে কোনও একটি বস্তুর বর্ণনা, তার উৎপত্তি, ব্যবহার, গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে আালোচনা। যেমন ধরা যাক ফুলারিন; কার্বনের এই রূপভেদটির আবিষ্কারের গল্প, বৈশিষ্ট্য, আশ্চর্য আণবিক গঠন (ঠিক ফুটবলের মতো) ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা একটি লেখার বিষয় হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিষয়মুখী, মানে একটি বিষয়ের (যেমন জিন প্রযুক্তি) সংজ্ঞা, তার বিভিন্ন পর্যায়, প্রয়োজনীয়তা, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি ও আশঙ্কা (কিছু থাকলে) সব নিয়ে আলোচনাও লেখার বিষয় হতে পারে। তা ছাড়া কোনও বিজ্ঞানীর (গবেষণা) জীবনের কথা এবং কোনও আবিষ্কারের নেপথ্যের কাহিনিও বিজ্ঞানমূলক লেখার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। বিষয়টা যা-ই হোক, বিজ্ঞানের লেখাকে অবশ্যই হতে হবে তথ্যসমৃদ্ধ কিন্তু সরস ও সহজবোধ্য। কিন্তু এই দু’টি গুণ যে মাঝে-মাঝেই পরস্পরবিরোধী হয়ে ওঠে, সে কথা আমরা ক্রমে বুঝতে পারব।

পাঠকের শ্রেণিবিচারেও বিজ্ঞানের লেখা মোটের উপরে দু’রকম হতে পারে: সামগ্রিক ভাবে বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে, আর বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় জনপ্রিয় ও পরিচিত করে তোলার উদ্দেশ্যে। প্রথম ধরনের লেখা প্রকৃতই সকলের জন্য, কিছুটা পড়াশোনা করা যে কোনও মানুষই যেন এই লেখা পড়ে বুঝতে পারেন। এ লেখাও বিষয়মুখী, কারণ তা মূলত বিভিন্ন বিষয়কে সাধারণের উপযুক্ত করে ব্যাখ্যা করে। প্রাকৃতিক ঘটনাবলি, যেমন দিনরাত্রি ও ঋতু পরিবর্তন, জলবায়ু বদল, ভূমিকম্প ইত্যাদির ব্যাখ্যা, বিভিন্ন রোগের উৎপত্তি ও প্রতিরোধের উপায় ইত্যাদি। এ ধরনের লেখা অবশ্যই বিজ্ঞানকে (মানে কার্যকারণ অনুসন্ধানের সংস্কৃতিকে) জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে লেখা হয়। সব ধরনের মানুষই যাতে এর পাঠক হতে পারেন, তা মাথায় রেখে এগুলি লেখা উচিত। অর্থাৎ এগুলো বিজ্ঞানের বিষয় হলেও মানুষের জীবনের অঙ্গ বলে এই সব বিষয়ে যাতে সকলেরই কিছুটা জ্ঞান (বোধ) তৈরি হয়, সেটা দেখা বিজ্ঞান-লেখকের কর্তব্য।

কিন্তু এর বাইরে যে-সব বিষয় শুধু বিজ্ঞানের এক-একটি বিশেষ শাখার অংশ এবং কিছুটা উচ্চস্তরের পাঠক্রমের (যেমন কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কিংবা ন্যানোবিজ্ঞান) অন্তর্গত, তাদের ক্ষেত্রে লেখককে প্রাথমিক ভাবে এই সংশয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যে, এই লেখা কার জন্য? বিজ্ঞানের বিষয়ে একেবারেই ওয়াকিবহাল নন এমন মানুষও যাতে এই লেখা পড়ে অন্তত কিছুটা বুঝতে পারেন এমন ভাবে লিখবেন, না কি বিজ্ঞানেরই ছাত্র বা অন্তত উৎসাহী পাঠক, এমন মানুষের জন্য লিখবেন? এখানে এসে মনে হয়, এটা মেনে নেওয়াই ভাল যে ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্বের সব লেখা যেমন সবাই পড়েন না, তেমনই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বিজ্ঞানের সব লেখাও সবাই পড়বেন না। তাই উচ্চতর বিজ্ঞানের লেখা খুব তরল করে সকলের পাঠযোগ্য করে লেখার চেষ্টা না করাই ভাল, তাতে সত্যিই ‘সবাই’ পড়বেন কি না তা নিশ্চিত নয় কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র বা নিয়মিত পাঠক যাঁরা উৎসাহভরে লেখাটি হাতে নেবেন তাঁরা হতাশ (বঞ্চিতও) হবেন। একই লেখা দিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভবই নয়।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হল লেখক কী লিখবেন, কেন লিখবেন। আন্তর্জালের দৌলতে তথ্যভান্ডার আমাদের হাতের মুঠোয় বলে যে কোনও বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করে তাকে বাংলায় অনুবাদ করে প্রবন্ধ লিখে ফেলা এখন খুবই সহজ কাজ। বিভিন্ন পত্রিকায় এমন অজস্র প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া যায় যাদের সরাসরি ‘ই টু বি’ অর্থাৎ ‘ইংরেজি থেকে বাংলা’ ধরনের লেখা বলা যায়। এমন অজস্র প্রবন্ধ পড়ে সংশ্লিষ্ট লেখকদের মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে করে যে, কিছু তথ্যের নীরস সমাহারই কিন্তু প্রবন্ধ নয়। কোনও বিষয়ে একটি-দু’টি প্রবন্ধ পড়েই সেই বিষয়ে লিখতে চাইলে সে-লেখা সরস ও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিজ্ঞান-লেখক শুধু নিজের পড়াশোনা ও গবেষণার বিষয়টুকু নিয়েই লিখবেন, এমন নিশ্চয়ই নয়। তিনি তথ্য সংগ্রহ করেই লিখবেন, কিন্তু তথ্যের সঙ্গে লেখকের নিজস্ব কিছু বিশ্লেষণ, উদাহরণ, মতামত, সব মিলিয়েই একটি লেখা মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। যে বিষয়ে নিজের তেমন পড়াশোনা বা জ্ঞান নেই, সেই বিষয়ে লিখতে গেলেই সে-লেখায় এই সব উপাদানের অভাব ঘটে আর তা থেকে পাঠকের কিছু প্রাপ্তি হয় না, মানে লেখার মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়। এমন লেখা লেখার দরকার কি? নির্বাচিত বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান না থাকলে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা সহজ ও সরস ভাবে উপস্থাপন করা কঠিন।

বিজ্ঞানের লেখাকে সরস ও বোধগম্য করে তোলার দু’টি উপাদান হল যথাযথ (বাংলা) প্রতিশব্দ ও তুলনার ব্যবহার। প্রতিশব্দ যেন ইংরেজি শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ না হয় সেটা দেখা, প্রয়োজনে নতুন প্রতিশব্দ সৃষ্টি করাও লেখকের কর্তব্য। তার জন্য শুধু বিজ্ঞান নয়, ভাষার উপর দখলও জরুরি। তেমনই, অতিসরলীকৃত বর্ণনা ও তুলনা যেন ভুল ধারণা গড়ে না তোলে, সেটাও দেখা লেখকের দায়িত্ব। গত বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ (সংক্ষেপে ‘মফ’) নামের একটি বিশেষ শ্রেণির রাসায়নিক যৌগ। বিভিন্ন প্রবন্ধে তার গঠন ও কার্যকারিতার বর্ণনা যে ভাবে লেখা হচ্ছিল তাতে সাধারণ পাঠকের মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এটা একটা খাঁচার মতো বস্তু, যাকে মরুভূমির মধ্যে বসিয়ে রাখলেও তার মধ্যে জল জমবে। মফ-এর গঠন অনেকটা খাঁচার মতো ঠিকই, তারা জলকে আলাদা করতেও পারে, কিন্তু সেটা আণবিক পর্যায়ে। গুঁড়ো-গুঁড়ো কঠিন পদার্থটা দেখে সে-সব বোঝার উপায় নেই। তেমনই ক্যানসার-আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করতে চৌম্বকক্ষেত্রের ব্যবহারের মতো একটি জটিল বিষয়কে এমন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেন কোষগুলোকে চুম্বক দিয়ে টেনে পৃথক করা যাবে। বলা বাহুল্য, এই কোনও ধারণাই ঠিক নয় এবং লেখকেরা বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা না-করেই লিখেছেন। খ্যাত বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-প্রচারক জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকরের প্রয়াণের পর বিভিন্ন প্রবন্ধে তাঁর একটি তত্ত্বকে ভগবদ্‌গীতার ধারণার সঙ্গে তুলনা করে লেখা হয়েছিল। এই রকম লেখা সাধারণ পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছয় ঠিকই, কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা গড়ে তোলে বলে আসলে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। তাই তথ্যসংগ্রহের ব্যাপারেও লেখককে সচেতন থাকতে হবে; প্রতিটি তথ্য নিজে বুঝে, যাচাই করে তবেই লেখায় ব্যবহার করা উচিত।

জনপ্রিয় বিজ্ঞানের লেখা মানে আসলে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য লেখা। কল্পবিজ্ঞান, বিজ্ঞানাশ্রয়ী গল্প, বিজ্ঞান-প্রবন্ধ তার ভিন্ন ভিন্ন ধারা। পাঠক এখানে গ্রহীতা, তাঁকে যতটা সম্ভব তথ্য ও ধারণা সরাসরি সরবরাহই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। ঠিক পথে পাঠকের কাছে পৌঁছনোর উপায় হল তথ্য অটুট রেখে (সূত্র উল্লেখ করে) লেখাকে সরস ও বোধগম্য ভাবে পরিবেশন করা; বিজ্ঞান লেখকের সেটা চ্যালেঞ্জও। সেই চ্যালেঞ্জ জিততে গেলে তাঁকে যত্নশীল ও পরিশ্রমী হতে হয়। নীরস তথ্যের উপস্থাপনা, কাল্পনিক সংলাপের আমদানি করে সে দায়িত্ব পালন করা যায় না। অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ হয়ে আধুনিক যুগের অজস্র বিজ্ঞান-লেখক এই বিষয়ে উদাহরণ।

রসায়ন বিভাগ, সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন