সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বললেন, বাংলাদেশ থেকে এই রাজ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটছে, এবং তার ফলে রাজ্যের জনবিন্যাস উল্লেখযোগ্য ভাবে বদলে গিয়েছে। শাহ বলছেন, জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার পিছনে মুসলমানদের অধিকতর হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ। কথাগুলো নতুন নয়। বিজেপি অনেক দিন ধরেই অনুপ্রবেশ নিয়ে সুর চড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে, মুসলমানদের অনুপ্রবেশের কারণে বদলে যাওয়া জনবিন্যাস পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের নিরাপত্তাহীন করেছে; তাদের ধর্ম, ঐতিহ্য এবং আত্ম-পরিচয়কে বিপন্ন করেছে। তাদের সাংস্কৃতিক পরিসর সঙ্কুচিত করেছে। এর থেকে মুক্তির উপায়, বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। কারণ একমাত্র বিজেপিই এই রাজ্যে হিন্দু সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারে। আসন্ন নির্বাচনেও অনুপ্রবেশ এবং বিপন্ন হিন্দুত্ব বিজেপির অন্যতম হাতিয়ার।
২০১১-র পরে আর জনগণনা হয়নি। ফলে তার পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ কতটা ঘটেছে, কিংবা ধর্মীয় জনবিন্যাস কতটা বদলেছে, তার কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। কিন্তু ২০১১ ও তার আগের জনগণনাগুলি থেকে অনুপ্রবেশ এবং ধর্মীয় জনবিন্যাসের পরিবর্তন সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা করা যায়। ২০০১-এর জনগণনায় দেখা যাচ্ছে, সে সময় যে সব মানুষ পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৭.২৪ লক্ষ মানুষ ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে এসেছিলেন, আর ২.৫৯ লক্ষ মানুষের পূর্ববর্তী বাসস্থান ছিল ভারতের বাইরে। অনুমান, এই ২.৫৯ লক্ষ মানুষের কিছু অংশ নেপাল কিংবা ভুটান থেকে এলেও একটা বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন।
এর পরের দশকে বহিরাগতদের সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা মানুষের সংখ্যা ২৩.৯০ লক্ষ এবং ভারতের বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা ২০.০৬ লক্ষ। অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০১১ এই দশ বছরে বিদেশি বহিরাগতদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে সাত গুণ। বলা শক্ত, তাঁদের মধ্যে কত জন আইনের পথে ভারতে ঢুকেছিলেন, আর কত জন বেআইনি ভাবে। কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যে বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন, এমন অনুমান অসঙ্গত নয়। দু’টি জনগণনাতেই দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে বিদেশি বহিরাগতদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। আশ্চর্য নয়, যে-হেতু পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত-রাজ্য।
অপর পক্ষে, গত তিনটি জনগণনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় জনবিন্যাস বদলাচ্ছে। ১৯৯১-এর জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ছিল ৭৪.৭% এবং মুসলমান ২৩.৬%। ২০০১-এর জনগণনায় হিন্দু ৭২.৫%, মুসলমান ২৫%। ২০১১-র জনগণনায় হিন্দু ৭০.৫%, মুসলমান ২৭%। ২০১১-র পরবর্তী সময়ে কী হয়েছে আমরা জানি না, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার দৃষ্টান্ত দিয়ে বিজেপি বলছে, গত ১০-১৫ বছরে জনবিন্যাস নিশ্চয় আরও বেশি হিন্দুদের বিরুদ্ধে গিয়েছে, এবং এর জন্যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশই মূলত দায়ী।
বাংলাদেশ থেকে যে বেশ কিছু মানুষ পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছেন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। রাজ্যে ধর্মীয় জনবিন্যাসের একটা পরিবর্তনও অনস্বীকার্য তথ্য। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বস্তুত, একটু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীরা এসে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে, এই দাবির কোনও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই।
বস্ত্রশিল্পের প্রসার এবং রফতানির উপরে ভিত্তি করে সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি যেমন দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই বাংলাদেশ তার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভারতের অনেক আগেই কমাতে পেরেছে। ফলে মাথাপিছু আয়ের নিরিখে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটলুক’ জানাচ্ছে যে, ১৯৯০ থেকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় কখনও ভারতীয় মাথাপিছু আয়ের সামান্য উপরে থেকেছে, কখনও সামান্য নীচে। ১৯৯০ থেকে ২০০২ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের উপরে ছিল। ২০০৩ থেকে ২০১৭ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ভারতের নীচে। আবার ২০১৮ থেকে ২০২৪ মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বাংলাদেশ ভারতের উপরে উঠে এসেছে। এখন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যদি গড় ভারতীয় আয়ের কাছাকাছি হয়, সেটা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয়ের উপরে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থার চেয়ে ভাল। তা হলে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গে কাজ খুঁজতে আসবেন কেন?
স্বাভাবিক অবস্থায় কারও আসার কথা নয়। কিন্তু, হিন্দু সংখ্যালঘুদের জন্য বাংলাদেশের অবস্থা কোনও দিনই ‘স্বাভাবিক’ ছিল না। দেশভাগের পর থেকেই সীমান্তের ও-পারে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে একটা হিন্দু-বিদ্বেষের স্রোত বহমান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে সেই স্রোত হয়তো সাময়িক ভাবে ব্যাহত হয়েছিল, কিন্তু কোনও ভাবেই লুপ্ত হয়ে যায়নি। পরবর্তী সময়ে নানান রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতে বিদ্বেষের স্রোত কখনও প্রবল হয়েছে, কখনও ক্ষীণ। বর্তমানে তা অতিপ্রবল। অর্থাৎ বাংলাদেশে হিন্দুদের সর্বদাই একটা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ছিল, এবং আছে। ফলে পাকাপাকি ভাবে ভারতে চলে আসার কথা যদি কেউ ভাবেন, তা হলে হিন্দুরাই আগে ভাববেন।
অপর পক্ষে, বাংলাদেশে মুসলমানদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা নেই। সম্প্রতি সেখানকার আর্থিক সাফল্য তাঁদের রোজগারের নিরাপত্তাও দিচ্ছে। তাই পাইকারি হারে সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসার কোনও কারণ বাংলাদেশি মুসলমানদের নেই। নিজের দেশে সুখে থাকলে কেউ ভিটেমাটি ছেড়ে ভিন দেশে অনিশ্চয়তার মধ্যে আসতে চাইবেন কেন? তার মানে, গত তিন দশকে বাংলাদেশ থেকে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই হিন্দু। বাংলাদেশের জনগণনার তথ্যও সে দেশ থেকে ক্রমাগত হিন্দু বহির্গমনের দিকে নির্দেশ করছে। ১৯৯১-এর জনগণনায় বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ১০.৫%, ২০২২-এ সেটা কমে হয়েছে ৭.৯%।
এই আলোচনা থেকে দু’টি সিদ্ধান্ত এবং একটি প্রশ্ন উঠে আসছে। প্রথম সিদ্ধান্ত, যে-হেতু হিন্দুরাই বেশি সংখ্যায় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছেন, জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার জন্য ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’-কে দায়ী করা চলে না। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যে সব বাঙালি মুসলমানকে এখন ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্থা করা হচ্ছে, তাঁদের বেশির ভাগই আসলে ভারতীয়। প্রশ্নটা হল, অনুপ্রবেশের কারণে যদি জনবিন্যাস বদলে না থাকে, তা হলে কী কারণে বদলেছে?
দু’টি উত্তর। প্রথমত, ভারতের বিভিন্ন জনগণনায় দেখা গিয়েছে যে, এ দেশে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্বাভাবিক ভাবে বেশি। এর ফলে মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, বহু দিন ধরে সংখ্যালঘুদের যে সামাজিক নিরাপত্তা পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, হিন্দি বলয়ে সেটা নেই। ফলে বিভিন্ন সময়ে হিন্দি বলয়ের কম উন্নত অঞ্চলগুলি থেকে বেশ কিছু অবাঙালি মুসলমান পশ্চিমবঙ্গে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছেন। উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত কমে আসার কারণ শুধুমাত্র হিন্দুদের বহির্গমন নয়, মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের কম জন্মহারও বটে। হিন্দু এবং মুসলমানদের সার্বিক জন্মহারের ফারাকটা আগের চেয়ে কমে এলেও এখনও খানিকটা আছে। ভারতেও আছে, বাংলাদেশেও আছে। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে বেশি।
অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বিজেপির তির তার নিজস্ব হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককেই নিশানা করে ফেলছে না তো? এসআইআর নামক প্রক্রিয়াটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিন্তায় ফেলেছে। তাঁদের একটা বড় অংশ যদি বাংলাদেশ থেকে বিদ্বেষের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা হিন্দু হন, যাঁদের আনুগত্য বিজেপি অনায়াসেই আদায় করে নিতে পারত— তা হলে এসআইআর-এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে কি? এক সময় বলা হয়েছিল যে, সিএএ-র মাধ্যমে হিন্দু উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সে কাজটা বিশেষ এগোয়নি। উল্টে এখন এঁদের উপরে এসআইআর-এর খাঁড়া ঝুলছে। অল্প সময়ের মধ্যে এসআইআর শেষ করতে গিয়ে এমনিতেই বহু মানুষের বিরাগভাজন হয়েছে বিজেপি। তার উপরে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুরাও যদি বিজেপির প্রতি আস্থা হারান, তবে বিজেপির ছোড়া তির বুমেরাং হয়ে বিজেপিকেই আঘাত করবে।