Bengali Industrialist

বিনিয়োগে আত্মঘাতী বাঙালি

পঞ্চম (২০০৫) ও ষষ্ঠ (২০১৩) অর্থনৈতিক সেনসাসে দেখা গেছে যে, গোটা ভারতেই রিটেল দোকানের সংখ্যা বেড়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে তার চেয়েও বেশি হারে।

সুব্রত দত্ত
শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:০০

সম্প্রতি সিঙ্গুরে এক ‘অনিচ্ছুক’ কৃষককে প্রশ্ন করেছিলাম, টাটাদের জমি দিতে আপত্তি করেছিলেন কেন? উত্তর এল, “সিপিএমের উপরে আমাদের রাগ ছিল।” অপারেশন বর্গায় জমি কেড়ে নেওয়ার রাগ।

সিঙ্গুরের কৃষি এলাকার শ্রমজীবী মানুষ এখন অ-কৃষিক্ষেত্রে বিবিধ কাজ করে পেট চালান। অনেকে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে চলে গিয়েছেন অন্য রাজ্যে। এলাকায় শিল্প বলতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে হিমাদ্রি কেমিক্যালস-এর মাঝারি মাপের কারখানা। নানা জায়গা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকরা আসেন সেখানে কাজে। সিঙ্গুরের কিছু শ্রমিকও কাজ করেন সেখানে। উৎপাদনের কাজ ছাড়াও সেখানে সিকিয়োরিটির কাজ, গাড়িতে মাল ওঠানো-নামানোর কাজ, এবং ঝাড়ুমোছার মতো অদক্ষ শ্রমের কাজ আছে।

শিল্পের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্কের ছবিটা এখন চুম্বকে এ রকমই।

চিরকালীন ছবি অবশ্য এমন নয়। সমাজবিজ্ঞানী বিনয় ঘোষ বহু পর্যটকের কাহিনি থেকে ইতিহাস ঘেঁটে দেখিয়েছেন যে, গুপ্তযুগ, পালযুগ ও সেনযুগে বঙ্গদেশের সওদাগররা যথেষ্ট অর্থবান ছিলেন এবং তাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তিও ছিল। মঙ্গলকাব্য থেকে তিনি দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে চাঁদ সওদাগরের মতো বণিকরা কী অগাধ সম্পত্তি অর্জন করেছিলেন! বিনয়বাবুর প্রশ্ন, যে বাংলার সমাজজীবনে বাঙালি সওদাগরদের এত প্রতিপত্তি ছিল, সেই বাঙালি সওদাগর শ্রেণি পরবর্তী কালে, পুঁজিবাদী যুগে, পুঁজিপতি বা শিল্পপতি না-হয়ে কেন ‘দালাল ও দোকানদারের স্তরে নেমে এলেন’? পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে কারখানা এখন প্রায় নেই, আছে শুধু দোকান আর দোকানদার। অন্য রাজ্যে পণ্য তৈরি হয়, আর আমরা সেই পণ্য বিক্রি করি।

পঞ্চম (২০০৫) ও ষষ্ঠ (২০১৩) অর্থনৈতিক সেনসাসে দেখা গেছে যে, গোটা ভারতেই রিটেল দোকানের সংখ্যা বেড়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে তার চেয়েও বেশি হারে। তা হলে কি দোকানদারি করা ছাড়া বাঙালির আর গতি নেই? আছে, তবে তা আরও করুণ। জাতীয় নমুনা সমীক্ষা সংস্থার বিভিন্ন রাউন্ডের তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে অসংগঠিত ক্ষুদ্র উৎপাদন শিল্পের সংখ্যা অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় খুব বেশি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু এতে আনন্দের কিছু নেই। কারণ, এগুলির বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই (৯৫%-এর মতো) মালিক ছাড়া আর কোনও কর্মী নেই, এতটাই ছোট মাপের সেগুলি। এই ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগ তখনই তৈরি হয়, যখন সেই মালিকের সামনে উপার্জনের কোনও বিকল্প পথ থাকে না।

বাঙালি একটা শিল্প-সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারল না কেন? বিনয় ঘোষ দেখিয়েছেন যে, নানা কারণে সামন্ত আমলের বাঙালি সওদাগরদের গরিমা নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারেনি। একটি উদাহরণ, উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগকারী ঋণ নিয়ে লগ্নি করতে উৎসাহ পেতেন না। পরবর্তী কালে, ব্রিটিশ আমলে, দ্বারকানাথ ঠাকুর শিল্পপতি হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিস্তর। অর্থনীতিবিদ অমিয় কুমার বাগচি দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশরা পক্ষপাতিত্ব করতেন, ফলে দেশীয় শিল্পপতিরা সরকারি কাজের বরাতগুলি পেতেন না, সেগুলি পেতেন ইউরোপীয় শিল্পপতিরা। সেই বাধা এড়াতে উইলিয়াম কারের সঙ্গে জোট বেঁধে নতুন যৌথ কোম্পানি খুলেও দ্বারকানাথ সুবিধা করতে পারেননি। বিনয়বাবুর মতে, দ্বারকানাথের নিজেরও কতকগুলি ভুল ছিল, এবং সেগুলির জন্যে শেষ পর্যন্ত তাঁর আর শিল্পপতি হয়ে ওঠা হল না, দেনায় জর্জরিত হয়ে জমিদারির স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করলেন।

অন্য দিকে, রামদুলাল দে সরকার (১৭৫২-১৮২৫) কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ‘কানাকড়ি থেকে কোটিপতি’ হয়েছিলেন। বিলেতের লন্ডন টাইমস পত্রিকা তাঁর পুত্রদের জার্মানির ধনকুবের পরিবারের উত্তরসূরিদের সঙ্গে তুলনা করে ‘রথ্স্চাইল্ড অব বেঙ্গল’ নামে সম্বোধন করেছিল। নিজের চারটি জাহাজে করে রামদুলালের বাণিজ্য-পণ্য বিদেশে পাঠানো হত। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় আমেরিকার এক ব্যবসায়ী ভুল বানানে নিজের একটি জাহাজের নাম রেখেছিলেন ‘রামদোলোল’। মৃত্যুর সময় রামদুলাল রেখে যান প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা। বিনয় ঘোষ বলছেন, যে বিপুল মূলধন রামদুলালের পুত্র ও নাতিরা পেয়েছিলেন, ‘তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে বাংলাদেশের টাটা’ কিংবা বড় শিল্পপতি তাঁরা হতে পারতেন। কিন্তু তাঁর দুই পুত্র ছাতুবাবু ও লাটুবাবু ‘নাচ-গান-হল্লায়, কবিগানে-আখড়াই গানে, বুলবুলির লড়াইয়ে, শখের পায়রা ও বাঁদরের বিয়েতে, বাইনাচ ও খ্যামটা নাচে’ পিতার কষ্টার্জিত টাকা ‘তামাকের ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিয়েছেন’। বাঙালির নিজস্ব বড় পুঁজির যবনিকা হয়েছিল, তাই অন্য রাজ্য থেকে আজ পুঁজি ডাকতে হয়।

জমিদারি মনস্তত্ত্বের প্রভাবে, পুঁজিবাদী সংস্কৃতির অভাবে, একটা শিল্প-সাম্রাজ্য গড়ার সুযোগ হারিয়েছিল বাংলা। তারও অনেক পরে, বাম-সংস্কৃতির প্রভাবে, সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণতর হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে ভাল বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, সরকারের ঘরেও রাজস্ব তেমন ঢোকে না। তাই শিল্পায়নেরই চেষ্টা করতে হবে পশ্চিমবঙ্গকে। বর্তমান সরকার প্রতি বছর বাণিজ্য সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগ ধরার ও শিল্পস্থাপনের চেষ্টা করছে, তবে এখনও বড় সাফল্য আসেনি।

আরও পড়ুন