উদ্বিগ্ন: বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতনের সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের মিছিল, কলকাতা, ২২ ডিসেম্বর। ছবি: পিটিআই।
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া’। কোনও কোনও বিহঙ্গ তবু পাখা বন্ধ করছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি কি সে রকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে?
নববর্ষে প্যারিস শহরের শঁজ়ে-লিজ়ে রাজপথে সন্ধ্যায় যে চিরাচরিত খোলা আকাশের নীচে এক বৃহৎ আলোকোজ্জ্বল সুরের আসর বসে, তা বন্ধ ঘোষণা হয়েছে আক্রমণের ভয়ে। কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন যে বন্ধ ঘরের দেওয়ালে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে টিভিতে প্রচারিত সেই অনুষ্ঠান দেখতে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্যারিসে ও গোটা ফ্রান্সে অভিবাসী যুবকেরা খ্রিস্টীয় প্রধান উৎসবের সময়ে গড়ে হাজারখানেক গাড়ি পুড়িয়ে মজা করে। সেই ‘ঐতিহ্য’ (এই শব্দটিই পশ্চিমি সাংবাদিকরা আজকাল ব্যবহার করেন) অনুসারে সদ্য গত নববর্ষের দিনে ১১৭৩টি গাড়ি জ্বলেছে, গত বছর যা ছিল ৯৮৪টি। ফলে মহা আশঙ্কা জেগেছে, দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা। এটা পশ্চিম ইউরোপের চেহারা, ক্রিসমাসের বাজারগুলি প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পাহারায় থাকছে। গত এক দশক ধরে পশ্চিম ইউরোপে ক্রিসমাস ও নববর্ষে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ এক স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় সংস্কৃতির এই প্রধান অনুষঙ্গ ক্রিসমাস এখন জেহাদিদের নিয়ন্ত্রণে। এ বার ভারতেও দেখা গেল ক্রিসমাসকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদীদের ‘জেহাদি’ আক্রমণের ঘটনা।
অতি সম্প্রতি, গত ২০২৫-এর নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রকাশিত হয়েছে। এর একটি বিশেষ দিক হল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকাকে পশ্চিমি শক্তি ও রাশিয়ার ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ থেকে বার করে এনেছেন। এই নীতি প্রকাশনায় ইউরোপকে ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধ করতে ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে বলা হয়েছে। প্রধান নীতিমালার শুরুতেই ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সুস্থিতি ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা প্রাধান্য পেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আমেরিকার ‘যুদ্ধং দেহি’ অবস্থান থেকে সরে আসার কারণ বেশ স্পষ্ট করেই বোঝানো হয়েছে এই নীতি-পত্রে। বলা হয়েছে যে আমেরিকার প্রশাসকরা এত দিন ভেবে এসেছেন যে, ইউরোপের সমস্যা হচ্ছে অপর্যাপ্ত সামরিক খাতে ব্যয় এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা। এটা অনেকটাই ঠিক, ১৯৯০-এ বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)-এর ২৫ শতাংশ ছিল ইউরোপের, এখন সেটা কমে হয়েছে ১৪ শতাংশ। কিন্তু আসল সমস্যা অনেক গভীরে। তা হল, সভ্যতার ক্রমবিলুপ্তিকরণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরোধীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা, অভিবাসন নীতি, বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ বন্ধ করা ইত্যাদির ফলে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত হচ্ছে। ইউরোপীয় জন্মহার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, অভিবাসন বৃদ্ধি ও উল্লিখিত নীতির জন্য ইউরোপ তার নিজস্ব পরিচয় হারাচ্ছে। আগামী কুড়ি বছরেই ইউরোপকে আর চেনা যাবে না।
এমনকি নেটো, পশ্চিমি সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এই নীতিপত্র। কয়েক দশকের মধ্যেই ইউরোপের কিছু দেশ মূলত অ-ইউরোপীয় হয়ে যাবে। তারা কি নিজেদের আর ইউরোপের অংশ হিসাবে ভাববে, না পৃথিবীতে তাদের নতুন পরিচয় খুঁজবে? ফলে তারা কি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে থাকবে? এই নতুন ইউরোপ ইউরোপীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের ঐতিহ্যের ধার ধারে না। ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পদচারণা এই পথেই দ্রুত এগোচ্ছে, বিভিন্ন দেশের অস্থায়ী জোট সরকার টিকে থাকার জন্য এই দুরবস্থাকে ব্যবহার করে ইউরোপের সঙ্কট আরও বাড়িয়ে তুলছে। সুতরাং, আমেরিকা ও ইউরোপের স্বার্থে আমেরিকার দায়িত্ব ইউরোপের সভ্যতার উপর নিজস্ব বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, একটি সুস্থির ইউরোপের গঠন ও আগের স্বধ্বংসী নীতিগুলি পরিত্যাগ করা। পুরনো আমেরিকা-রাশিয়া ঠান্ডা যুদ্ধের দিন শেষ, এখন যুদ্ধ সভ্যতার সঙ্কট নিরসনের।
‘সভ্যতার সঙ্কট’— একদা পরিচিত শব্দবন্ধটি আবার শোনা যাচ্ছে। ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক কালজয়ী প্রবন্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করাল আবহে আশি বছরের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিম ইউরোপ গড়ে উঠেছিল গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, নিপীড়িতের আশ্রয়দায়ী সমাজ হিসাবে। আজ তার আশি বছর পর আমাদের সেই অবিশ্বাসের অবস্থায় ফিরে আসতে হল— ইউরোপ ভুগছে সভ্যতার সঙ্কটে। সেই সঙ্কট— গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতার অপব্যবহার ও বিকৃতির সঙ্কটে ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছি আমরাও।
প্যারিসের এই অবস্থা এক দিনে হয়নি, গত দু’দশকে বার বার প্যারিসকে রক্তাক্ত করেছে মৌলবাদীরা, হত্যা করেছে। দশ বছর আগে বিখ্যাত ফরাসি ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদোর সম্পাদক-সহ ছ’জন সাংবাদিককে হত্যা করেছিল তারা। একই ভাবে মেদিনীপুর কুড়ি বছর আগেই এই সঙ্কটের বিপদ ঘণ্টা বাজিয়েছিল একেবারে ১ মে ২০০৫, শ্রমিক দিবসে। তখন বামফ্রন্টের শাসনকাল, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী। মে দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কবি তসলিমা নাসরিনকে কবিতা পড়তে দেওয়া হল না। মৌলবাদীদের সামনে নতজানু হয়ে বাম প্রশাসন আইনশৃঙ্খলার অজুহাতে তাড়িয়ে দিল কবিকে। মেদিনীপুর পথ দেখাল। এর দু’বছর পর, ২০০৭-এর নভেম্বরে বাম সরকার একেবারে একবস্ত্রে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই তাড়িয়ে দিল তাঁকে। পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলাদেশ হওয়ার দিকে পা বাড়াল। কবিতা দিয়ে শুরু, এ বার গান। মৌলবাদীরা কোনও রাখঢাক করে না। পূর্ব মেদিনীপুরের এক বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে এক জনপ্রিয় মহিলা সঙ্গীতশিল্পীর একটি সাম্প্রতিক সিনেমার গানে ‘জাগো মা’ থাকাতেই একেবারে সরাসরি মঞ্চে উঠে হেনস্থা করে তাঁকে বার করে দেওয়া হল। তসলিমা নির্বাসনের পর পশ্চিমবঙ্গের কবিরা দু’-এক দিন হইচই করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চুপ করে গিয়েছেন। এখন পশ্চিমবঙ্গের কবিরা সভ্যতার সঙ্কটে বুঝেসুজে কবিতা লেখেন, সিনেমা-টিভি সিরিয়াল বেয়াদবি করলে দমদম দাওয়াই-এর ভয় দেখিয়ে কাটছাঁট করা হয়।
১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সেনাকে পরাজিত করেছিল, পাকিস্তানি সংস্কৃতিকে নয়। সে জন্য বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার বছরেই ১৯৭২-এর অক্টোবরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুর্গাপুজো আক্রান্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব একেবারে দূর করতে পাকিস্তান পাকাপাকি ব্যবস্থা করেছিল— হিন্দু গণহত্যা এবং যার ফলে সেখান থেকে প্রায় পুরো হিন্দু সমাজই উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর সাহসী নেতৃত্বে ভারতীয় বদানত্যায় বাংলাদেশ গঠিত হওয়ায় হিন্দু উদ্বাস্তুরা প্রায় বেশির ভাগ তখন ফিরে গেলেন স্বভূমিতে। ফলে সংস্কৃতির সঙ্কট সেখানে রয়ে গেল। সেই সঙ্কট দ্রুত সমাধান করতে ভাঙা হল সঙ্গীত শিক্ষার অঙ্গন থেকে বাদ্যযন্ত্র, পোড়ানো হল যুবককে।
ইন্দিরা গান্ধী সাহস দেখিয়ে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমন কোনও সাহসী নেতৃত্ব এখনও নেই। ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তান-চিন-আমেরিকা অক্ষের ত্র্যহস্পর্শের হুমকি অগ্রাহ্য করে সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধে নেমে জয় পেয়েছিলেন। আজকের ভারতের অন্য পরিস্থিতি, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র শক্তিরাও তাকে উপেক্ষা করে। সঙ্কটের ছায়া কেবল ঘন হয়ে জমছে পৃথিবীময়, ভারতের সীমান্তেও।