কিছু সমস্যার আপাত-সমাধান, কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত
Bangladesh General Election 2026

ডিঙা ভাসল গহিন গাঙে

ভোটের ঠিক আগে জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ফরিদা ইসলাম কথাপ্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আমরা কিন্তু পোশাক বদলের আন্দোলনে ছিলাম না, আমাদের দাবি ছিল সমাজ পরিবর্তনের।

সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী
শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:৪৭
আশ্বাস: ভোটের আগে প্রচারে বিএনপি শীর্ষনেতা তারেক রহমান, ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি।

আশ্বাস: ভোটের আগে প্রচারে বিএনপি শীর্ষনেতা তারেক রহমান, ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি। ছবি: রয়টার্স।

বা‌ংলাদেশে সদ্য-অনুষ্ঠিত বহুপ্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল এখন আর কারও অজানা নয়। ২০২৪-এ জুলাই-অগস্টের তীব্র জনরোষে মাত্র কয়েক মাস আগে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। নবীন প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের একাংশ আস্থা রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপরে। আস্থা রাখেন সেই সরকারের প্রবাস-ফেরত প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপরে। পদ্মা-মেঘনা দিয়ে বিগত দেড় বছরে তার পরে অনেক জল বয়ে গেছে। সংশয় ছিল, শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত দিনে ভোট হবে কি না। শেষ অবধি মোটের উপরে শান্তিপূর্ণ এই নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। যে দেশে মোট জনসংখ্যা সাড়ে সতেরো কোটিরও বেশি এবং জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেরোশোর বেশি, সেখানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সমাজকে অস্থির এবং অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু এই নির্বাচন অনেকগুলি সমস্যার আপাত-সমাধানের রাস্তা দেখালেও বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রইল।

ভোটের ঠিক আগে জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ফরিদা ইসলাম কথাপ্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আমরা কিন্তু পোশাক বদলের আন্দোলনে ছিলাম না, আমাদের দাবি ছিল সমাজ পরিবর্তনের। এই কথাটা উঠেছিল তখন, যখন বাংলাদেশের নতুন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ভোটের প্রাক্কালে তাঁর এক্স হ্যান্ডলে মন্তব্য করেছিলেন যে, যখন মেয়েরা আধুনিকতার নামে ঘরের বাইরে রোজগারে যায়, তা কার্যত পতিতাবৃত্তিরই নামান্তর। এই মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করতেই দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, শফিকুরের এক্স অ্যাকাউন্টটি হ্যাকিংয়ের শিকার। সে যা-ই হোক, এই মন্তব্য আওয়ামী লীগ-বিরোধী মহিলাদের এ বারের ভোটে নিঃসন্দেহে অনেকটাই জামায়াতে-বিমুখ করেছে। যে ২৯৯টি আসনে (মোট আসন ৩৫০, এর মধ্যে ৩০০টিতে সরাসরি নির্বাচন হয়, আর বাকি ৫০টি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত) ভোট হয়েছে, তার ২১২টিতে বিএনপি জিতলেও অন্তত ৭৭টি আসনে কিন্তু জামায়াতে এবং তাদের এগারো দলীয় জোট জিতেছে। এই পরিস্থিতিতে বিগত দশকগুলিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্পে কাজ করার সুবাদে যে মেয়েরা রোজগারের সুযোগ পেয়েছেন, ‘আধুনিক’ না-হলেও তাঁদের সেই অধিকার ও স্বাধীনতা কতটুকু অক্ষুণ্ণ থাকবে তা সময়ই বলবে, এবং তা কিন্তু অনেকটাই নির্ভর করবে নবনির্বাচিত সরকারের উপরে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক গণতন্ত্র এক অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসন দাবি করে। বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি আপাতত সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এ বারের ভোট বিগত দুই বারের তুলনায় অনেক অবাধ ও ভয়হীন হলেও, দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণ-কলুষিত আওয়ামী লীগকে গোটা ভোটপ্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বাইরে রাখা কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলকতার পরিচায়ক নয়। উপরন্তু গণতন্ত্রের এই জয়োল্লাসেও পরিবারতন্ত্র অটুট রইল। তৃতীয়ত, এ বারের ভোটের সঙ্গে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি ভোটারদের এক গণভোটে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। গণভোটটি ২০২৫ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের উপর। হ্যাঁ অথবা না-বাচক উত্তরের মাধ্যমে ভোটদাতাকে এই আদেশের বিষয়ে সম্মতি জানানোর কথা ছিল। আদেশের মোট ৮৪টি প্রসঙ্গকে বস্তুত চারটি প্রশ্নের আকারে ভোটদাতার সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। এক, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোয় গঠন করা হবে। দুই, আগামী জাতীয় সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট হবে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গড়ে তোলা হবে। তা ছাড়া ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। একই রকম ভাবে মেয়েদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সংসদীয় কমিটি, মৌলিক অধিকার-সহ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, রাষ্ট্রপতির মেয়াদের বিষয়ও গণভোটে জিজ্ঞাস্য ছিল। এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উত্তর চাওয়া হয়েছে কিন্তু মাত্র এক কথায়। ৭০ শতাংশের মতো ভোটদাতা তাঁদের সম্মতি দিয়েছেন, ৩০ শতাংশ বিরুদ্ধমত দিয়েছেন।

তৃতীয় কথা, এই জুলাই সনদ কিন্তু জন-আন্দোলনের আবেগের প্রেক্ষাপটে রচিত। নিশ্চিত ভাবেই জুলাই আন্দোলনে অগণিত নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর ছায়াতেই এই রচনা। কিন্তু জনসাধারণের ভগ্নাংশ এবং মূলত কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের একাংশ এই সনদের রচয়িতা। তাই জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগে তৈরি এই সনদের চরিত্র কতটা গণতান্ত্রিক, সেই প্রশ্নটি রয়েই গেল। ৮৪টি অত্যন্ত জরুরি অথচ জনসাধারণের কাছে বহুলাংশে দুরূহ এই বিষয়গুলির সূক্ষ্ম দ্যোতনাকে কার্যত অবজ্ঞা করে এই সম্মতি নির্মাণের প্রয়াস শেষ পর্যন্ত আবেগের নৌকাকে ভাসিয়ে রাখতে পারবে তো?

চতুর্থত, মোট আসনের ৭০ শতাংশের বেশি বিএনপির দখলে এলেও প্রায় ২৬ শতাংশ আসন জামায়াতে ও তার সহযোগী দলগুলির নিয়ন্ত্রণে। এই অবস্থায় তারেক রহমান-সহ বিএনপি নেতৃত্বের একাংশ ভোটের আগে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত করতে গেলে তাঁদের প্রধান বিরোধী দল, অতীতের জোটসঙ্গী এবং মন্ত্রিসভারও সঙ্গী জামায়াতের নিরন্তর মোকাবিলা করতে হবে। উল্লেখ্য, খুলনায় ও একদা-জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির দুর্গ বলে পরিচিত রংপুরে এই ভোটে জামায়াতেরই আধিপত্য। অতএব, মোকাবিলা সহজ নয় মোটেই।

এ বারের ভোট ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। বিগত বছরগুলিতে নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায় পুরোমাত্রায় আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরে নির্ভরশীল ছিল। কূটনীতিতে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী ছাড়াও কোনও দেশের বিরোধী দলগুলির সঙ্গেও কথাবার্তার রাস্তা বন্ধ করা যে অনুচিত, তা ভারত প্রায় ভুলতে বসেছিল। ফলে ২০২৪-এর অগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের আপাত-আকস্মিক পতনের পরে এবং শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে অনেকটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হয়েছিল।

এই প্রেক্ষিতে তারেক রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে বেশ কয়েকটি প্রসঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অগ্রাধিকার পাবে। এ বছরেই গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ফুরোবে। দু’দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য নদীর জলের বিষয়েও কথা উঠতে বাধ্য। ঢাকার তরফে বাংলাদেশিদের ভারতে চিকিৎসা-ভিসার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। উঠবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতির কথাও। হাসিনাকে ঢাকার হাতে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও নতুন সরকারের কম গুরুত্ব পাবে না। অন্য দিকে, ভারতের বহুচর্চিত ‘পুবে কাজ নীতি’ (অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি)-র বাস্তবায়নে যেমন বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তেমনই বিমস্টেক-এর মতো আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সংগঠনেও বাংলাদেশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের বাণিজ্য ও পরিবহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অর্থবহ ভূমিকা নিতে শুরু করেছিল। উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঢাকার তাৎপর্য অনস্বীকার্য।

বিগত দেড় বছরে ভারতের সঙ্গে পড়শি বাংলাদেশের সম্পর্ক যে ধরনের টানাপড়েনের মধ্যে পড়েছে, তা অভূতপূর্ব। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই এ বার নিশ্চিত ভাবে সম্পর্কের এই অবনমন রুখতে সচেষ্ট হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই তারেক রহমানকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ভোটের কিছু আগেই বেগম খালেদা জ়িয়ার শেষকৃত্যে উপস্থিত থেকেছেন। নতুন বাংলাদেশ সরকারও ভারতের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। অতএব, সম্পর্কের অনুত্তাপ কাটতে পারে।

তবে কোনও দেশের বিদেশনীতির ক্ষেত্রে বৃহৎ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনই প্রাসঙ্গিক সে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ। তাই কোনও দেশের নিজস্ব রাজনীতির প্ররোচনামূলক বক্তৃতা-নিনাদের ছায়া ভিনদেশের সঙ্গে সম্পর্কে যাতে না-পড়ে, তা দেখা দরকার। দেশভাগ কখনওই পড়শি দেশের ভৌগোলিক গুরুত্বকে মুছে দিতে পারে না। ইতিহাস অনেক সময় রক্তাক্ত হলেও, ভৌগোলিক নৈকট্য, ভূগোলের অধিকার অস্বীকার করার কোনও উপায় সত্যিই আছে কি?

আরও পড়ুন