Book Readers

নিবিষ্ট পাঠকের অনুসন্ধানে

প্রমথ চৌধুরী ‘বইপড়া’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মোটের উপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নোট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির গড়েন, সে দুইই বাধ্য হয়ে, অর্থাৎ পেটের দায়ে।”

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৬

আয়োজক সংস্থার সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত বছর বইমেলায় এসেছিলেন ২৭ লক্ষ মানুষ, বিক্রি হয়েছে ২৩ কোটি টাকার বই; গত বছর মেলায় আসা প্রত্যেকে প্রায় ৮৫ টাকা খরচ করেছেন বই কিনতে। বইপাড়ায় সর্বত্র বইয়ের বাজার তলানিতে ঠেকার যে ইঙ্গিত মেলে, সেই প্রেক্ষিতে এ তথ্য বেশ সুখের, তবে তার গা ঘেঁষেই জেগে ওঠে অনিবার্য প্রশ্ন: এই হিসাব বই প্রকাশক বা ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে জরুরি, কিন্তু পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির সূচক কি?

অনেকেরই বাড়িতে দেখা যায় আলমারি-ঠাসা বই, নতুনের মতো চকচকে, যেন মনুষ্যস্পর্শ পায়নি। প্রমথ চৌধুরী ‘বইপড়া’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মোটের উপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নোট পড়ে এবং ছেলের বাপেরা যে নজির গড়েন, সে দুইই বাধ্য হয়ে, অর্থাৎ পেটের দায়ে।” তবু, সাম্প্রতিক অতীতেও কি শিক্ষিত মেধাবী পাঠকের পাশাপাশি বই-পড়া সাধারণ বাঙালির সন্ধান মেলেনি? পাড়ার লাইব্রেরির খাতা জুড়ে থাকত মা-মাসি, দাদা-দিদি, কাকু-জেঠুদের নাম, যাঁরা নিছক পেটের দায়ে বই পড়তেন না। ভাল বইয়ের আদানপ্রদান চলত বন্ধুমহলে। মফস্‌সলের প্রাথমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষক সপ্তাহে এক দিন লাইব্রেরিতে ছাত্রদের সামনে উজাড় করে দিতেন নানা রঙের ও ভাবনার বই। কখনও একটি বই খুলে পড়ে শোনাতেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নিষ্ফল উপহার’ কবিতা শুনেছি তাঁরই কাছে। শিষ্য রঘুনাথ ‘কনকে মাণিক্যে গাঁথা’ দু’খানি বালা উপহার দিলেন গুরুদেবকে, পাঠরত গুরু তা পাশে রেখে মন দিলেন পাঠে। তারই একটি পড়ে গেল যমুনার জলে: “আহা আহা চীৎকার করি রঘুনাথ/ ঝাঁপায়ে পড়িল জলে বাড়ায়ে দু হাত/… বারেকের তরে গুরু না তুলিলা মুখ/ নিভৃত অন্তরে তাঁর জাগে পাঠসুখ।”

নিবিড় ভাবে এই যে পড়া বা পাঠ শোনার সুখ, সমাজমাধ্যমের আগ্রাসনের আগে তা-ই ছিল মানুষের বিনোদন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে পাঠরত চন্দ্রশেখরকে দেখিয়েছেন, “মৃৎপ্রদীপ সম্মুখে তুলটে হাতে-লেখা পুতি পড়িতেছিলেন।… রাত্রি গভীরা হইল। তখনও চন্দ্রশেখর প্রমা, মায়া, স্ফোট, অপৌরুষেয়ত্ব ইত্যাদি তর্কে নিবিষ্ট।… অনেক রাত্রি পর্যন্ত তিনি বিদ্যালোচনা করিতেন…।” আর নারীর পড়া? চোখের বালি-তে‌ আশালতা পড়ে, দেখে তার শাশুড়ি তাকে বলে, “নভেল পড়িয়া, কার্পেট বুনিয়া বাবু হইয়া থাকা কি ভালো?” চতুরঙ্গ-এ দামিনীর নভেল পাঠে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন লীলানন্দ স্বামী। পাঠে যেমন সুখ আছে, তেমন একটা আধিপত্যের আভাসও আছে। তাই কি তাকে দমিয়ে রাখতে পড়ায় বাধা দেওয়া? বঙ্গদেশ জানে, কী করে নারীকে আটকে দেওয়া হয়েছে পাঠের আয়োজন থেকে। রাসসুন্দরীর আমার জীবন থেকে প্রথম প্রতিশ্রুতি সুবর্ণলতা বকুলকথা-য় তার ছবি ধরা আছে।

এই যে পাঠক পড়েন, লেখক লেখেন, আশ্চর্য তার আকর্ষণ। তারাশঙ্করের কালিন্দী-তে মানদা অহীন্দ্রকে তিরস্কার করছে ফুলশয্যার দিন বসে বসে বই পড়ার জন্য: “আজকে হল… ফুলশয্যের দিন। আর আপনি ইয়া মোটা বইয়ের ভিতর মুখ গুঁজে বসে রয়েছেন।… বলি, উঠবেন কিনা বলুন?… কি রস যে ওই কালির হিজিবিজির মধ্যে আছে, কে জানে বাপু!” কী রস পাঠে? চোখের বালি-তে বিহারীকে লেখা মহেন্দ্রর চিঠি গোপনে পড়ছে বিনোদিনী, রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “চিঠির মধ্যে বিনোদিনী কী রস পাইল, তাহা বিনোদিনী জানে।” এই বিনোদিনীই একান্তে বিষবৃক্ষ পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

মিশেল স্টিফেন্স-এর দ্য ডেথ অব রিডিং যাঁরা পড়েছেন তাঁরা হয়তো বলবেন, সে অর্থে পাঠক কই আজ? প্রযুক্তির সর্বব্যাপী বিস্তার ও মেড ইজ়ি-র এই যুগে একটা অস্থির ব্যস্ততা চলছে নিয়ত। পড়ার অভ্যাস কমছে, সময়ও। তা বলে বই পড়া একেবারে উঠে যাবে বলে মনে হয় না। কোভিডকাল থেকে গত পাঁচ বছর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রছাত্রীরা বইয়ের বিকল্প হিসেবে অন্য মাধ্যম বেছে নিয়েছিল, তারা অনেকেই আবার বইপত্র নাড়াচাড়া করছে, খোঁজ করছে একাধিক রেফারেন্সের, নতুন লেখা এনে দেখাচ্ছে। এখন দরকার বই হাতে তাদের পাশে দাঁড়ানো, পড়ার অভ্যাস চাগিয়ে দেওয়া। শহরে শহরে বইমেলার আয়োজন নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা নেবে। বইমেলায় ছোটদের নিয়ে বাবা-মা আসছেন, বই পড়ার আনন্দ যদি নতুন প্রজন্মের মধ্যে চারিয়ে দেওয়া যায়, আবার নিবিষ্ট পাঠক গড়ে উঠবে।

প্রযুক্তি তার মতো এগোবেই, তার পরেও একক ও একাকী ‘আমি’র কাছে বই পরম বন্ধু, এ কথা তাদের বোঝানো দরকার। “স্মৃতি বিস্মৃতি নিয়ে বসে থাকি বইয়ের ঘরে। কখনও অনেক রাতে, একলা, কোনও একখানা বই হাতে তুলে নেব কিনা ভাবি, অগোচর কিছু কিছু নিঃশব্দ কথা হতে থাকে তাদের সঙ্গে”, লিখে গেছেন শঙ্খ ঘোষ। এই মুহূর্তে একান্ত নেট-বিভোর কোনও তরুণ মন কি এক দিন মিলে যাবে না এই অগ্রজ-অনুভূতির সঙ্গে?

বাংলা বিভাগ, বিধাননগর কলেজ

আরও পড়ুন