চাষি-মজুর, নারী-দলিতের যেন ‘সুরক্ষা’ ছাড়া চাওয়ার কিছু নেই
Society

দাক্ষিণ্যের রাজনীতি

মনরেগায় দেদার দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু তা গ্রামের মানুষের, বিশেষত মেয়েদের রোজগার বাড়াতে পেরেছে, তার ইঙ্গিত মেলে। কেন্দ্রের লেবার ব্যুরোর তথ্য, ২০১১-২০২২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের কৃষিকাজে মজুরি বেড়েছে পুরুষদের থেকে বেশি হারে।

স্বাতী ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩০

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে খেতমজুর-দিনমজুর তৃণমূল আমলে কেমন আছেন, এ প্রশ্নটা করলে দুটো উত্তর পাওয়া যায়। একটা উত্তর সরকারের। সেখানে চাষির মুখ হাস্যময়, ‘কৃষকবন্ধু’ অনুদানে তাঁর চাষের খরচ কমেছে, কৃষিঋণ পেয়ে চাষে বিনিয়োগ করেছেন, কৃষক মান্ডিতে তিনি তাঁর ফসল নিয়ে যান, তাঁর ধান সরকার বছরে দু’বার কিনে নেয় বাজারের থেকে চড়া দাম দিয়ে। অতিবৃষ্টিতে ফসল বিমার টাকা পাওয়ার আগেই অ্যাকাউন্টে ঢোকে ক্ষতিপূরণের টাকা, ত্রাণ তহবিল থেকে। রেশনের চাল, লক্ষ্মীর ভান্ডার অন্নচিন্তা থেকে বাঁচিয়েছে।

এই রঙিন ছবি এঁকেছে রাজনীতি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পৌঁছে দিয়েছিল ক্ষমতার শীর্ষে। যা ছিল প্রধানত ভূমিহীন চাষি আর খেতমজুরদের আন্দোলন। ক্ষমতায় এসে মমতা প্রতিদান দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কাজে লাগিয়েছিলেন দু’টি প্রকল্প— একশো দিনের কাজ (মনরেগা) এবং এমএসপি-তে ধান কেনা। মনরেগা রূপায়ণে বাম ফ্রন্ট ছিল ধীরগতি, কিছুটা আমলাতান্ত্রিক। যে বছর তৃণমূল ক্ষমতায় এল, সেই ২০১১-১২ সালে তৈরি হয়েছিল ১৫ কোটি কর্মদিবস। রাজ্যে মনরেগার শেষ বছরে (২০২১-২২) এক কোটিরও বেশি লোক ৩৬ হাজার দিন কাজ করেছেন।

মনরেগায় দেদার দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু তা গ্রামের মানুষের, বিশেষত মেয়েদের রোজগার বাড়াতে পেরেছে, তার ইঙ্গিত মেলে। কেন্দ্রের লেবার ব্যুরোর তথ্য, ২০১১-২০২২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের কৃষিকাজে মজুরি বেড়েছে পুরুষদের থেকে বেশি হারে। এমনকি, সারা দেশে মেয়েদের কৃষি-মজুরি যে হারে বেড়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে তার চেয়েও একটু বেশি হারে, বলছেন অর্থনীতিবিদ অরিন্দম দাস।

এমএসপি, বা ন্যূনতম দামে ধান কেনারও প্রসার হয়েছে। কেন্দ্রের রেশন ছাড়াও রাজ্য ‘খাদ্যসাথী’ (২০১৩) চালু করায় ধানের চাহিদা বেড়েছে। ২০১১ সালে ২০ লক্ষ টন ধান কেনা হয়েছিল, ২০২৫ সালে ৬৭ লক্ষ টন। ২০১০-১১ সালে এক লক্ষেরও কম চাষি সরকারকে ধান বিক্রি করেছিলেন, গত বছর করেছেন ১৫ লক্ষ চাষি। পনেরো বছরে পনেরোগুণ বৃদ্ধি, এ কি খুশির ছবি নয়?

হতে পারত, যদি রাজ্যের মানুষের জীবনের মাপ হত সরকারি প্রচারের মাপে। বড় ছবিটা চোখে পড়লে খুশির হাসি ছোট হয়ে আসতে চায়। কৃষকবন্ধু পাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গে এমন চাষি, ভাগচাষির সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। সেখানে ১৫ লক্ষ কতই বা? পঞ্জাবে দশ জন চাষির নয় জনই এমএসপি-তে বিক্রি করছেন, ছত্তীসগঢ়েও ৩৮ শতাংশ চাষি সে সুযোগ পান। দামের দিকে চেয়েও অখুশি হওয়ার কথা বাংলার চাষিদের— প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা কেন্দ্রের এমএসপি-র উপর আরও ৮০০ টাকা দেয় চাষিকে, পশ্চিমবঙ্গ সেখানে যাতায়াতের খরচ বাবদ দেয় ২০ টাকা। অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধরের বিশ্লেষণ, পঞ্জাব-সহ কয়েকটি রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে কুইন্টাল-প্রতি উৎপাদন খরচ বেশি। তাই এমএসপি পেলেও বাংলার চাষির লাভ থাকছে কম।

গ্রামীণ মজুরির অঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে ‘মাঝারি’ পর্যায়েই রয়ে গিয়েছে, তার স্থান সাত থেকে দশের মধ্যে, অসম বা বিহারের কাছাকাছি। কেরল, হরিয়ানা, তামিলনাড়ুর থেকে অনেক পিছনে। রাজ্যের ভিতরেও থেকে গিয়েছে অসাম্য, মেয়েদের কৃষি-মজুরি বাড়লেও পুরুষদের সঙ্গে ফারাক এখনও গড়ে ৩০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। নির্মাণক্ষেত্রে মেয়েদের মজুরি আজও পুরুষদের অর্ধেক। সরকার-ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি প্রায় কোনও কর্মক্ষেত্রে গ্রামীণ শ্রমিকরা পান না। বরং তাঁতের শাড়ি বুনে, কাপড়ে জরি বসিয়ে মেয়েরা চার-পাঁচ বছর আগে যে টাকা পেতেন, এখন পাচ্ছেন তার থেকেও কম। সংসার চালাতে মেয়ে-পুরুষ কেবলই কাজের সময় বাড়িয়ে চলেছেন।

মনরেগা চালু থাকতেই ভিন রাজ্যে কাজে যাওয়া বাড়ছিল। মনরেগা বন্ধ হওয়ার পর পরিযাণের মাত্রা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। গ্রামের মেয়েরাও ভিন রাজ্যে যাচ্ছেন, কখনও স্বামীর হাত ধরে, কখনও ঠিকাদারের হাত ধরে। সন্তানকে নিয়ে, কিংবা গ্রামে রেখে। এই মেয়েদের, শিশুদের ক্ষতি আর বিপদের বহর কতখানি, তা এখনও মাপা হয়নি।

অনেকে বলেন, পরিযায়ী শ্রম তো ভালই, ভিন রাজ্যে রোজগার হয় বেশি, রাজ্যের গ্রামে টাকা আসছে বেশি। তা হয়তো আসে— কাশ্মীর কি কেরলে কয়েক মাস কাজের শেষে পাওয়া থোক টাকা নিজের গ্রামে পাকা বাড়ি, নতুন বাইক হয়ে ঢোকে। হয়তো একটা দোকান কি একটা ভ্যান রিকশায় বিনিয়োগ হয়েও ঢোকে। কিন্তু সংসারের দৈনন্দিন খরচ জোগান যাঁরা, তাঁদের অবস্থা কেমন? ভ্যান ভাড়া, বাস ভাড়ায় তাঁদের রোজগারের এক-তৃতীয়াংশ চলে যায়। প্রাইভেট টিউটর, প্রাইভেট ডাক্তারের খরচ মেটাতে ধার হয়ে যায়। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলো শুধুই ‘খিচুড়ি ইস্কুল,’ তাই শিশু সামলাতে মেয়েদের কাজ ছেড়ে দিতে হয়। খেয়েপরে বেঁচে থাকার নিত্য-যুদ্ধের এই সৈনিকদের মুখ চেয়ে তৃণমূল সরকার কতটুকু বিনিয়োগ করেছে গ্রামীণ পরিকাঠামো, সরকারি পরিষেবায়?

এ রাজ্যের গ্রামীণ পরিবারের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত মেলে নানা ভাবে— গার্হস্থ ভোগব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি খাবারের জন্য খরচ হয়, এই তথ্য থেকে। অসরকারি সংস্থার ঋণ-খেলাপিদের গৃহত্যাগের সংবাদ থেকে। সর্বোপরি শিশুদের বিপন্নতায়। অপুষ্ট শিশু, স্কুলছুট ছাত্র, স্কুলছাত্রীর সন্তানপ্রসব— প্রচার-আলোকিত প্রকল্পগুলোর পিছনে মিশকালো দারিদ্রের প্রমাণ।

গ্রামীণ দারিদ্রের দায় কেন্দ্রেরও বটে— ২০১৪ সালের পর মনরেগার মজুরিতে কিপটেমি গ্রামীণ মজুরি না-বাড়ার অন্যতম কারণ। কিন্তু রাজ্যগুলি কী ভাবে তার মোকাবিলা করেছে, তা-ও দেখতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চাষির রোজগার বাড়ানোয় নানা উদ্যোগ করেছে— কৃষক বাজার নির্মাণ, পেঁয়াজ চাষে উৎসাহ, ‘সুফল বাংলা’ প্রকল্পে চাষির থেকে আনাজ কেনা, ইত্যাদি। আক্ষেপ, গুটিকয়েক মান্ডি ছাড়া অধিকাংশ কাজে লাগেনি, সুফল বাংলা ‘স্কেল আপ’ করা যায়নি, নতুন নতুন ফসল যথেষ্ট বাজার ধরতে পারেনি। বিশ্বজিৎ ধর বলেন, “হিমাচল প্রদেশে গ্রামীণ মজুরি দ্রুত বেড়েছে, যার একটা কারণ সেখানে ফল প্রক্রিয়াকরণের বেশ কিছু কারখানা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘ফুড প্রসেসিং’ নিয়ে কথা অনেক হয়েছে, কাজ হয়নি।” পাট, চা-এর মতো কৃষি-নির্ভর শিল্পে বিশৃঙ্খলা ও অবনতি তৃণমূল জমানাতেও রোখা যায়নি। বরং, ভিন রাজ্যে আলু রফতানি আটকাতে সরকারি জোরাজুরি পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার নষ্ট করেছে। ট্রেন, ট্রাকের ভাড়ায় ভর্তুকি দিয়েও সে বাজার ফিরে পাননি ব্যবসায়ীরা।

পরিকাঠামো-পরিষেবায় বিনিয়োগ থেকে নগদ হস্তান্তরে সরে আসা, অনুদানের অঙ্কে উন্নয়নকে মাপা— প্রায় সব দলই এই করছে। তার ভাল-মন্দ নিয়ে বিতর্কে চাপা পড়ে যাচ্ছে একটি জরুরি কথা। রাজনীতির একটা লক্ষ্য নীতি-প্রকল্প তৈরি করা, রূপায়ণ করা। অন্য লক্ষ্যটি হল সমাজের মনকে বদলানো। চাষি, শ্রমিক, নারী, দলিত— চির-অপমানিত নানা গোষ্ঠীকে সমাজ কী চোখে দেখবে, তাদের কথাকে কতটুকু মূল্য দেবে, তা-ও ঠিক করে রাজনীতি। বাম আমলের গোড়ার দিকের যেমন চাষের জমিতে ভাগচাষির দাবি, স্থানীয় স্বশাসনে গ্রামবাসীর ভূমিকাকে স্বীকার করে বাম ফ্রন্ট দরিদ্রের প্রতি ন্যায়কে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। ইউপিএ-১ সরকার শিক্ষা, খাদ্য, কাজের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে এনেছিল নাগরিকের মর্যাদার সামাজিক বোধ। তার পর থেকে অধিকার, ন্যায়, সমতার ভাবনা দূরে সরেছে, নেতারা কেবলই প্রাধান্য দিচ্ছেন দাক্ষিণ্যকে। যেন ‘সুরক্ষা’ ছাড়া সমাজের কাছে, দেশের কাছে চাষি, শ্রমিক, নারী, দলিতের কিছুই পাওয়ার নেই। এই অবস্থানে নরেন্দ্র মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধ নেই। তাই খেতমজুর, দিনমজুরের দিকে চেয়ে সমাজের মনে জাগে একটাই প্রশ্ন— কে এঁদের একটু কম ক্ষতি করবে।

আরও পড়ুন