আপাতত কয়লার উনুনই ভরসা ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে দোকানের। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।
দুপুরে দম ফেলার ফুরসত থাকত না হোটেলকর্মীদের। টেবিলে টেবিলে তখন ক্রেতাদের ভিড়। সেখানে দুপুরের খাওয়া সারতেন পথচলতি মানুষজন থেকে শিয়ালদহ আদালতের আইনজীবী ও কর্মীদের একাংশ। আর এখন? দুপুরে ফাঁকা হোটেলে বসে গল্প জুড়েছেন কয়েক জন কর্মী। এক কর্মী মগ্ন মোবাইলে, আর এক জন মেঝেতে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। রান্না হয়নি। এক কোণে পড়ে কয়েকটি ফাঁকা গ্যাসের সিলিন্ডার। কাজ হারানো হোটেলকর্মী মহম্মদ রিয়াজ় বললেন, ‘‘সিলিন্ডার না মেলায় দিনকয়েক আগেই মালিক হোটেল বন্ধ করে দিয়েছেন।’’
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে জ্বালানি-সঙ্কটের কারণে শুধু শিয়ালদহ আদালত চত্বরের ওই হোটেলটিই নয়, ব্যাঙ্কশাল, আলিপুর আদালত চত্বরের হোটেলগুলিও সমস্যায়। কোনও হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ, কোনওটি টিমটিম করে চলছে। কোনও হোটেল আবার ইন্ডাকশন ও কয়লার ভরসায় চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। শিয়ালদহ আদালতের আইনজীবী শান্তনু দাস বলেন, ‘‘বাইরে খেতে গিয়ে দেখি, প্রায় সব হোটেল, খাবারের দোকানই বন্ধ!’’
শিয়ালদহ আদালতের ক্যান্টিনের অবস্থাও তথৈবচ। প্রায় ১০ বছর ধরে ক্যান্টিন চালাচ্ছেন রীতা সোনকর। সিলিন্ডারের অভাবে বন্ধ হওয়ার মুখে সেই ক্যান্টিন। মেনু কমিয়েও পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না। রীতার গলায় হতাশা, ‘‘কোনও খদ্দের নেই। ইন্ডাকশনে ডিম-টোস্ট যেটুকু করা সম্ভব, করা হচ্ছে। সিলিন্ডার না পেলে ক্যান্টিন বন্ধ করে দিতে হবে।’’ শিয়ালদহ আদালতের সরকারি আইনজীবী অসীম কুমার বলছেন, ‘‘বাইরে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যান্টিনও বন্ধের মুখে। প্রায় না খেয়েই কাজ করতে হচ্ছে।’’ ট্যাংরার এক মহিলা বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘‘বাড়ি থেকে কয়েকটা শশা এনেছি। কিন্তু শশা খেয়ে কি সারা দিন কাটানো যায়!’’
গ্যাস সিলিন্ডার না মেলায় শিয়ালদহ আদালতের বাইরেই ভাতের হোটেল বন্ধ করেছেন আবির শেখ। স্ত্রী, মা-বাবা, বোনের সংসার টানতে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে চটির দোকানে কাজ নিয়েছেন। বললেন, ‘‘হোটেলে দৈনিক প্রায় সাত হাজার টাকার বিক্রি হত। পাঁচ কর্মীর বেতন মিটিয়ে দিনে হাজার টাকার মতো লাভ থাকত।’’ ফলে, আয় প্রায় অর্ধেক কমেছে তাঁর। বেকার হয়েছেন পাঁচ হোটেলকর্মীও।
দুপুরে ব্যাঙ্কশাল আদালতের কাছেই গোবিন্দ মণ্ডলের দোকানের বিরিয়ানি, পরোটা, টিকিয়া-কাবাব রসনা তৃপ্ত করত অনেক আইনজীবীর। গ্যাস-ভোগান্তির জেরে তা-ও বন্ধ হতে বসেছে। গোবিন্দ বলেন, ‘‘আগে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকত। এখন ৩টের মধ্যেই বন্ধ করতে হচ্ছে। যেটুকু গ্যাস আছে, তা দিয়ে যত দিন চলে, চলবে।’’
আইনজীবী, কর্মী, বিচারপ্রার্থীদের ভরসা ছিল আদালত চত্বরে সন্ন্যাসী সামন্তের দোকানের চা-ঘুগনি, রুটি, ডিম কারি। গ্যাসের আকালে সেই সব রান্নার পাট চুকেছে। সন্ন্যাসীর কথায়, ‘‘কয়লার উনুনে শুধু চা বানাচ্ছি।’’ ফলে কার্যত অভুক্ত থাকতে হচ্ছে আইনজীবীদের। আইনজীবী সজল পালের আক্ষেপ, ‘‘দু’দিন শুধু পাউরুটি খেয়ে থেকেছি।’’ মামলার কাজে আদালতে আসা গিরিশ পার্কের রাজীব চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘দোকানে রোল-চাউমিন কিছুই মিলছে না।’’
৭২ বছর ধরে আলিপুর আদালত চত্বরে আইনজীবীদের খাবারের অন্যতম সেরা ঠিকানা নন্দী হোটেল। সেটির মালিক সুবীর নন্দী জানান, সিলিন্ডার না পেলে ব্যবসা চালানো বন্ধ করে দিতে হবে। ১৯৮৮ টাকায় একটি সিলিন্ডার কেনেন সুবীর। এক ব্যক্তি আশ্বাস দিয়েছেন, চার হাজার টাকা দিলে সিলিন্ডার মিলতে পারে। তবে তারও নিশ্চয়তা নেই। সুবীরের কথায়, ‘‘করোনা কালেও হোটেল বন্ধ হয়নি। যুদ্ধের জন্য হয়তো সেটাই করতে হবে!’’