যুদ্ধ সমাপ্ত করে হরমুজ় প্রণালী খুলে দেওয়ার যে চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা আর ইরান, তাতে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন।তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কেবল ইরান নয়, লেবাননের উপরেও অস্ত্রবর্ষণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে আমেরিকাকে। লেবাননকে না রাখলে চুক্তি হবে না। ইজ়রায়েল যদি লেবাননের উপর আক্রমণ করে তা হলে ইরান পাল্টা-আক্রমণে বাধ্য হবে। শান্তিচুক্তি ভঙ্গ হবে। তাই আমেরিকার সঙ্গে কথাবার্তায় লেবাননের নিরাপত্তাকে একেবারে কেন্দ্রে টেনে এনেছে ইরান। প্যালেস্টাইনের উপর আক্রমণের অবসানের শর্ত কিন্তু দেয়নি।
ইরানকে নিয়ে এখন গর্বিত উন্নয়নশীল দেশগুলি। আমেরিকার ট্রাম্প-বিরোধী গোষ্ঠী এবং পশ্চিমের দেশগুলিও তার শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশের সামরিক আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে পেরেছে ইরান। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ আক্রমণ ইরান রুখে দিয়েছে কুশলতা এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে। অবশেষে আমেরিকা বাধ্য হয়েছে ইরানের অধিকাংশ দাবি মেনে নিয়ে শান্তির জন্য সচেষ্ট হতে। একটি প্রাথমিক চুক্তিতে (মেমোর্যান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) দু’পক্ষই সহমত হয়েছে, যা ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিপত্র হিসেবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াই কেঁচে যেতে পারে যদি ইজ়রায়েল আক্রমণ করে লেবাননকে। ইরান দাবি করেছে যে শান্তিকে অর্থপূর্ণ করতে হলে পশ্চিম এশিয়াঅঞ্চলে সব যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু লেবাননের উল্লেখ থাকলেও, প্যালেস্টাইন বা গাজ়ার উল্লেখ তারা করেনি।
তা থেকে আন্দাজ হয়, ইরান এখন মানবিকতার বিচারকে সরিয়ে রেখে গুরুত্ব দিচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক শর্তগুলিকে। ধর্মীয় মেরুকরণে বিপর্যস্ত লেবাননে এখনও হিজ়বুল্লারই প্রাধান্য। ইজ়রায়েল কখনও আক্রমণ করলে তাকে প্রতিহত করতে এই সশস্ত্র দলটি ইরানের হয়ে লড়বে, তা জানা কথা। ২০২৪ সালে ইজ়রায়েল হিজ়বুল্লার বেশ কিছু কম্যান্ডারকে হত্যা করেছিল তাদের পেজার, ওয়াকি-টকিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। যোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণের আগে কয়েকশো যন্ত্রের লিথিয়াম ব্যাটারির মধ্যে একটা বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয় ইজ়রায়েল। পরে একটি ‘ফেক’ মেসেজ-এর উত্তর দেওয়ার জন্য হিজ়বুল্লা কম্যান্ডাররা বোতাম টিপতেই যন্ত্র ফেটে প্রাণহানি ঘটায়। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে হিজ়বুল্লার শীর্ষ নেতা নাসরাল্লাকে। এর পর হিজ়বুল্লাকে ফের শক্তিশালী করতে ইরান তাদের দেয় উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন-সহ নানা অস্ত্র।
১৯৮২ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময়ে তৈরি হয়েছিল হিজ়বুল্লা। ক্রমে তা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে গেরিলা যুদ্ধে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজ়রায়েলকে হটিয়ে দেয় (২০০০)। ইরানের সমর্থন পেয়ে শিয়া-প্রধান হিজ়বুল্লা লেবাননের সুন্নি মুসলিমদের এবং খ্রিস্টানদের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এ বছর মার্চ মাসে লেবানন সরকার হিজ়বুল্লাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, কিন্তু হিজ়বুল্লা এবং ইরান সেই নিষেধাজ্ঞাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। হিজ়বুল্লা থাকার ফলে ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের সুবিধে হয়— দু’টি ভিন্ন যুদ্ধসীমান্তে নিজেদের সেনা ও গোয়েন্দা দলকে ভাগ করতে বাধ্য হয় ইজ়রায়েল। এ বছর মার্চ মাসে ইজ়রায়েলি সেনা লেবাননে ঢুকে বেশ কিছুটাএলাকা দখল করেছে। দক্ষিণ লেবাননকে নিয়ন্ত্রণে এনে হিজ়বুল্লাকে দমন করতে চায় ইজ়রায়েল। তার প্রধান উদ্দেশ্য, হিজ়বুল্লা থাকার ফলে ইরান যে সামরিক সুবিধা পায়, সেটা শেষ করে দেওয়া। ফলে ইরানও লেবাননকে চুক্তির মধ্যে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্যালেস্টাইনে চুক্তির মধ্যে আনার বিষয়ে ইরানের তেমন মাথাব্যথা নেই।
যদিও ইরান দীর্ঘ দিন সমর্থন করে প্যালেস্টাইনকে, কিন্তু প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র বাহিনী হামাসকে কখনওই হিজ়বুল্লার সমান গুরুত্ব দেয়নি। ৭ অক্টোবর, ২০২৩ ইজ়রায়েলের উপর হামাসের অপ্রত্যাশিত আক্রমণকে প্রকাশ্যে সমর্থন করলেও, তেহরানের নেতারা অখুশি হয়েছিলেন, কারণ ইরানকে আগাম না জানিয়েই তা করেছিল হামাস। সে সময়ে ইরান সংযত থাকার কৌশল নিয়েছিল। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়নি যাতে আমেরিকা বাধ্য হয় ইজ়রায়েলের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে। পরে যখন ইরানের উপর আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল এক যোগে আক্রমণ করল, তখন হিজ়বুল্লা ইরানের পক্ষ নিলেও হামাস যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। ইরান মনে করে, সুন্নি-প্রধান হামাস কোনও দিনই ইরানের নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখাবে না। তা ছাড়া ইরান মনে করে প্যালেস্টাইনের সঙ্কট অত্যন্ত জটিল, সহজে তার কোনও সমাধান মিলবে না। প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা অবশ্যই ইরানের কাছে একটা রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু লেবানন যে ভাবে ইরানের কাছে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, প্যালেস্টাইন তা নয়।
গাজ়া-বাসীরা খুব আশা করেছিল, আমেরিকার সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরান তাদের স্বার্থকেও তুলে ধরবে। কিন্তু ইরান চায় পশ্চিম এশিয়াতে সর্বাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের আসন পাওয়া। ‘প্যালেস্টাইনের পরিত্রাতা’ সেজে প্রশংসা পাওয়ার জন্য ইরান নিজের সুবিধাজনক অবস্থান হারাতে রাজি নয়। অন্য দিকে, ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের চাপে পড়ে আপাতত হিজ়বুল্লার উপর আক্রমণ বন্ধ করেছে, তবে স্পষ্ট করেছে যে লেবানন থেকে ইজ়রায়েলি সেনা সরবে না। ইরান-আমেরিকা শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হলে পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য কেমন হবে, কূটনৈতিক মহলের কাছে সেটা এখন মস্ত প্রশ্ন।