Body Shamming

পৌরুষের ভ্রান্ত নির্মাণ

পুরুষের শরীরের গঠন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠনের বিচার দিয়ে তার পৌরুষের বিচার সব সময়ই যে অন্যায়, তা নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব থাকতে পারে না।

ভাস্কর মজুমদার
শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০০

বা ‌ংলা ব্যান্ড ‘চন্দ্রবিন্দু’-র একটি গানের কথা, ‘আমাকে বেঁটে বোলো না’। নিজের শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতা পুরুষদের কতখানি বিপর্যস্ত করে, তার একটি উদাহরণ চন্দন আরোরা পরিচালিত ম্যায় মেরি পত্নী অর উয়ো (২০০৫) ছবির মিথিলেশ (রাজপাল যাদব) চরিত্রটি। সে শিক্ষিত, কর্মক্ষেত্রে সফল, কিন্তু কেবল বেঁটে বলে নিজেকে ছোট মনে করে। মিথিলেশ বিশ্বাস করতে পারে না সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী বীণা (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) তাকে ভালবাসে। এই সন্দেহের বশে তার জীবন ছারখার হয়ে যায়। শরীরের গঠন, গায়ের রং প্রভৃতি নিয়ে এমন অনেক ধারণা সমাজ ঢুকিয়ে দেয় আমাদের মধ্যে, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নিয়ে যায়। জীবনকে ঠেলে দেয় খাদের ধারে। একে আমরা বলি ‘বডি-শেমিং’।

আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনা রাজ্যের বাসিন্দা মাইকেল ফিলিপস (৩৮) এ বছরের গোড়ায় সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেছেন যে তাঁর শিশ্নের মাপ মাত্র ০.৩৮ ইঞ্চি, যা সম্ভবত বিশ্বে ক্ষুদ্রতম। এর কারণ পুরুষ-হরমোনের ঘাটতি। কিন্তু শিশ্নের দৈর্ঘ্য নিয়ে সমাজে যে সব ভুল ধারণা, হাসি-ঠাট্টা, তাকে চ্যালেঞ্জ করতেই তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। মাইকেল জানিয়েছেন তিনি সারা জীবনে কখনও নিশ্চিন্তে মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারেননি। সব সময়ে কাজ করেছে সঙ্কোচ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য। দেহের দৈর্ঘ্যের মতো, পুরুষাঙ্গের দৈর্ঘ্যও বিশ্বে পুরুষ পরিচয়ের পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠেছে। এক জন পুরুষের মেধা, ব্যক্তিত্ব, স্বভাব, চরিত্র— কোনও কিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আসে না যদি না এই শর্তটি পূরণ হয়। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ‘পুরুষ’ মানে ‘পরাক্রমী’— এই ধারণা তৈরি হওয়ায় ভালবাসাও হয়ে দাঁড়িয়েছে হার-জিতের খেলা। বহু পুরুষ নিজের গ্লানির কাহিনি সারা জীবনেও প্রকাশ করে উঠতে পারেন না।

অথচ, প্রাচীন গ্রিসে দেবতা বা বীরদের মূর্তিতে হ্রস্ব লিঙ্গ দেখা যায়, যা সে সময়ে আত্মসংযম এবং বৌদ্ধিক গুণের প্রকাশ বলে মনে করা হত। ইউরোপের রেনেসাঁস যুগে মিকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ মূর্তিতেও সেই ধারণার প্রকাশ। পুরুষের শরীরের গঠন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠনের বিচার দিয়ে তার পৌরুষের বিচার সব সময়ই যে অন্যায়, তা নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব থাকতে পারে না। তা হলে শিশ্নের দৈর্ঘ্য আলোচনায় এল কবে থেকে? ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক ক্যারোলাইন মেরি ওয়েস্ট একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যখন বিশ্বের সর্বময় কর্তা হয়ে উঠছে, ভোগবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন পর্নোগ্রাফির ছবি তৈরি শুরু হয় আমেরিকায়। সাদা-কালো বর্ণের নারী-পুরুষের যৌনতা, বয়সের অনেক তফাত থাকা নারী-পুরুষের যৌনতা এবং আরও নানা ধরনের তথাকথিত অপ্রচলিত যৌনতার দৃশ্য পর্নোগ্রাফিতে প্রচারিত হতে থাকে। নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। দেখা যাচ্ছে যে এই সময়কাল থেকেই বৃহদাকার পুরুষাঙ্গের পুরুষেরা পর্নোগ্রাফিতে বিজ্ঞাপিত হতে শুরু করে। ক্রমশ তারা ছড়িয়ে যায় বৃহত্তর সংস্কৃতিতে।

আমরা ভুলে যাই, চলচ্চিত্রের উত্তেজনাপূর্ণ কাহিনি যেমন সাধারণ জীবনের কাহিনি নয়, কল্পনা ও অভিনয় মাত্র, পর্নোগ্রাফিও তেমন সাধযৌনাচার নয়। তবু সাধারণ মানুষের যৌনাচারকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে পর্নোগ্রাফি। পুরুষ শরীর খুব স্বাভাবিক ভাবে নানা ধরনের হয়ে থাকে। কেউ শ্বেতাঙ্গ হন, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ, কেউ লম্বা, কেউ বেঁটে, কারও ভুঁড়ি আছে, কেউ ছিপছিপে। যে-কোনও মানুষ সম্পর্কেই এই কথা সত্যি। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ পুরুষের শরীরকে পেশিবহুল, ‘অ্যাবস’-যুক্ত একটি যুবক শরীর হিসেবে বিজ্ঞাপিত করতে চায়। এতে যদি যাঁরা এমন শরীরের অধিকারী নন তাঁদের গ্লানি হয়, তাতে বিভিন্ন জিমনাশিয়াম, সেলুন এবং জামাকাপড়ের ব্র্যান্ডের ব্যবসা বাড়ে। পুরুষ মানে কী, তার একটা একরৈখিক ভাবনাও কিন্তু লিঙ্গবৈষম্য। তা সত্ত্বেও ক্রমাগত আমাদের চার পাশ এমনকি সমাজমাধ্যমও এখন হীনম্মন্যতা কাটানোর নানা আশ্বাস দেওয়া বিজ্ঞাপনে ভরা— বিভিন্ন তেল, মলম, ট্যাবলেটের সৌজন্যে।

‘পরাক্রমী’ পুরুষ তৈরির বিজ্ঞাপন যে কেবল বি-সমকামী সমাজে চলে তা কিন্তু নয়। সমকামী-রূপান্তরকামী জগতেও বি-সমকামী ধারণার বশবর্তী হয়ে তথাকথিত পরাক্রমী, যৌনসম্পর্কে অতি-পারদর্শী পুরুষকে ‘আদর্শ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এই ‘শীর্ষ’ পুরুষদের উপরেও একই চাপ কাজ করে। এতে তাদের যে পরিচয়ের সঙ্কট তৈরি হয়, তার খোঁজ কেউ রাখে না। সে-বিষয়ে কোনও আলোচনার পরিসরও তৈরি হয় না।

আবার, পুরুষ দেহধারী যে মানুষরা নিজের জন্মগত লিঙ্গপরিচয়ে খুশি নন, যাঁরা মনে করেন যে তাঁদের পুরুষ লিঙ্গের প্রয়োজন নেই, যাঁরা নারীতে রূপান্তরিত হতে চান, সমাজের চোখে তাঁরা ‘অপরাধী’ হয়ে ওঠেন। পুরুষ লিঙ্গ ত্যাগ করার ইচ্ছা তাঁদের উপর নামিয়ে আনে মারাত্মক সামাজিক হিংসা-হেনস্থা। আবার অন্য দিকে রূপান্তরকামী মানুষ যাঁরা জন্মকালে-ন্যস্ত নারী পরিচয়ে না-থেকে পুরুষ হতে চান তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষার অন্তরায়ও হয়ে উঠতে পারে শিশ্ন। বহু ক্ষেত্রে তাঁদের শল্যচিকিৎসার পরেও কটাক্ষ-কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিছু বছর আগে যৌনশিক্ষা বিদ্যালয় স্তরে চালু করেও সরকারকে পিছু হটতে হয়েছিল কারণ যৌনশিক্ষা খুব আশ্চর্যজনক ভাবে শ্লীল-অশ্লীলের আলোচনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত যৌনশিক্ষার অভাবে শরীর, সুখ, লিঙ্গ ও যৌনতা নিয়ে নানা কুসংস্কার ক্রমাগত সমাজে বেড়ে চলেছে। বহু মানুষ নীরবে কষ্ট সইছেন।

আরও পড়ুন