Physical Exercise

শরীরচর্চা কি লক্ষ্যভ্রষ্ট

‘বলং বলং বাহু বলং’— সংস্কৃত প্রবচনটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে বহু দিনই উপস্থিত। সরলা দেবী লিখেছিলেন, বাঙালির ললাট থেকে কাপুরুষতার কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে।

আকাশ
শেষ আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ ০৫:২৬

শরীরচর্চা আজ বাজারি পণ্য, একটা সামাজিক আকাঙ্ক্ষা। এক সময় যে শরীর ছিল সুস্বাস্থ্যের প্রতীক, তা এখন প্রদর্শনের বস্তু। আয়নায় দাঁড়িয়ে পেশির রেখা গোনা, কয়েক সপ্তাহে ওজন কমানোর লক্ষ্য, চার-ছয় খাঁজের উদরলাভের প্রতিশ্রুতি— শরীরকে ঘিরে নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হল, শরীরচর্চার লক্ষ্য সুস্বাস্থ্য, না শরীরের দ্রুত রূপান্তর? মন্ত্রের সাধন, না শরীর পাতন?

‘বলং বলং বাহু বলং’— সংস্কৃত প্রবচনটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে বহু দিনই উপস্থিত। সরলা দেবী লিখেছিলেন, বাঙালির ললাট থেকে কাপুরুষতার কলঙ্ক মুছে ফেলতে হবে। মন, শরীরের যুগপৎ শক্তি আনতে হবে। সে ছিল এক সময় যখন বাঙালিকে দুর্বল, রোগা বলে বিদ্রুপ করা হত।

ঔপনিবেশিক যুগে এই অপবাদ ঘোচানোর চেষ্টা থেকেই বাংলায় শরীরচর্চার বিশেষ ধারা তৈরি হয়। গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলন থেকে বিপ্লবী গুপ্তসমিতি— সর্বত্রই শরীরকে দেখা হত জাতীয় শক্তির উৎস হিসাবে। লাঠিখেলা, কুস্তি, ছোরা, তরোয়ালচর্চা, মুগুর ভাঁজা, ডনবৈঠক— সবেতেই আত্মশক্তি সঞ্চয়ের প্রয়াস। জাতীয় আত্মমর্যাদার সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিল শরীরচর্চা। অম্বিকাচরণ গুহের আখড়া বাংলার শরীরচর্চার ইতিহাসে এক প্রতিষ্ঠান। সেখানে কুস্তি করেছেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। রবীন্দ্রনাথ থেকে বিদ্যাসাগরও শরীরচর্চার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ব্যাঘ্রবীর’ নামে কিংবদন্তি হয়েছিলেন। গোবর গুহ, বিষ্ণুচরণ ঘোষ, নীলমণি দাশ, মনোতোষ রায়, মনোহর আইচরা বাংলাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছিলেন। সেই শরীরচর্চা এবং আজকের শরীরচর্চার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল। তখন দেহগঠন চরিত্রগঠনেরই অংশ। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিয়ম, সংযম, অধ্যবসায়, দীর্ঘ সাধনা।

স্বাধীনতার পরবর্তী দুই দশককে বাংলার শরীরচর্চার স্বর্ণযুগ বলা চলে। বিশ্বমঞ্চে দেহসৌষ্ঠব প্রতিযোগিতায় বাঙালির সাফল্য তখন নিয়মিত। মনোতোষ রায় বিশ্বশ্রী হলেন, মনোহর আইচ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেলেন। শরীরচর্চা তখন দীর্ঘ পরিশ্রমের প্রতিশব্দ। কিন্তু ক্রমেই মধ্যবিত্ত জীবনের সংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং নগরজীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে পাড়ার আখড়া ও ব্যায়ামাগারের গুরুত্ব কমতে থাকে। বহু জায়গায় শরীরচর্চা মস্তানি, দাদাগিরির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশের সঙ্গে ব্যায়ামাগারের এক ধরনের দূরত্বও তৈরি হয়।

তার পর বিশ্বায়ন। টেলিভিশনে আর্নল্ড শোয়ার্ৎজ়েনেগার, সিলভেস্টার স্ট্যালোন, মাইক টাইসন। বিজ্ঞাপনে পেশিবহুল শরীর। নির্মেদ নায়ক-নায়িকা। শরীরচর্চার ধারণাটাই বদলাতে থাকে। স্বাস্থ্য আর একমাত্র লক্ষ্য নয়; চেহারাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে চেহারাই প্রধান। আজ মফস্‌সল থেকে মহানগর— সর্বত্র জিম। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আধুনিক যন্ত্রপাতি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীরচর্চার আগ্রহ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। স্থূলতা, মধুমেহ, হৃদ্‌রোগের এই সময়ে নিয়মিত ব্যায়ামের গুরুত্বে বিতর্ক নেই।

সমস্যা অন্যত্র। শরীরচর্চার সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে বেড়েছে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা। তিন মাসে সিক্স প্যাক, কয়েক সপ্তাহে নাটকীয় ওজন হ্রাস, অল্প সময়ে পেশিবৃদ্ধি— এই সব প্রতিশ্রুতি বাজারের প্রধান হাতিয়ার। সমাজমাধ্যমে তারকাদের রূপান্তরের ছবি আকাঙ্ক্ষাকে ওস্কায়। সাপ্লিমেন্ট শিল্পের বিস্তার নজরকাড়া। হোয়ে প্রোটিন, ক্রিয়েটিন, প্রি-ওয়ার্কআউট— শব্দগুলি বহু তরুণ-তরুণীর দৈনন্দিন অভিধানের অংশ। অনেকগুলিরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যবহার উপকারীও হতে পারে। কিন্তু সমস্যা সেগুলিকে সাধারণ খাদ্যের বিকল্প বা অলৌকিক সমাধান হিসাবে দেখালে।

শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি এখনও আসে সাধারণ খাবার থেকেই— ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল, শাকসব্জি, ফল। কোনও সাপ্লিমেন্টই সেই ভূমিকা নিতে পারে না। কোন সাপ্লিমেন্ট কার জন্য উপযুক্ত, কতটা প্রয়োজন, আদৌ প্রয়োজন কি না— সিদ্ধান্ত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত পুষ্টিবিদের। জিমের সহব্যায়ামবীর বা নেট-প্রভাবীর নয়।

আরও উদ্বেগজনক, দ্রুত ফলের আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানুষকে আরও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেয়। আপাত সুস্থ মানুষ ব্যায়ামের সময় অসুস্থ হচ্ছেন, মৃত্যুও ঘটেছে। সব ক্ষেত্রেই শরীরচর্চা বা বিশেষ পদার্থ দায়ী— দাবি করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন তোলা যায়, যথাযথ স্বাস্থ্যপরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং সতর্কতার সংস্কৃতি কি জিম সংস্কৃতির সমান তালে গড়ে উঠেছে?

দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি আধুনিক যন্ত্র কেনার মতো সহজ নয়। চকচকে পরিকাঠামো গড়া সহজ। বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়া কঠিন। এই ব্যবধানই আজকের শরীরচর্চা সংস্কৃতির বৃহত্তম দুর্বলতা। শরীরচর্চা এন্ডরফিন, ডোপামিন, টেস্টোস্টেরনের মতো উপকারী হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়। আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করে।

তাই, শরীরচর্চা কেবল পেশি নির্মাণের প্রকল্প নয়— শরীর ও মনের সমন্বয়ের সাধনা। রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাঙট-পরা গুলি-পাকানো ধুলো-মাখা’ আধুনিকতার সমালোচনাতেই সতর্কবাণী ছিল, শক্তি যেন বাহ্যিক প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ না থাকে।

আরও পড়ুন