Cockroach Janta Party

মা ফলেষু...

গত প্রায় দেড় দশক ধরে কেন্দ্র-পরিচালিত পরীক্ষাগুলি একের পর এক কেলেঙ্কারিতে নিমজ্জিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্নপত্র ফাঁস। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা চলাকালীন প্রবল প্রযুক্তি বিভ্রাট।

শেষ আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ ০৪:২৫

পরীক্ষা বিভ্রাট ও ভারতীয় রাজনীতি— বিষয়টি ক্রমেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ‘আরশোলা’ আন্দোলনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। এই আন্দোলন কতখানি রাজনৈতিক, তার অভিমুখ কী দাঁড়াবে, রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে কি না ইত্যাদি প্রশ্নই এখন চর্চায়। সন্দেহ হয়, এর ফাঁক দিয়ে গলে যেতে পারে অধিকতর মৌলিক জিজ্ঞাসাটি— কেন্দ্রপরিচালিত পরীক্ষাসমূহের দুর্নীতি ও দুরাচারে ছাত্রসমাজের দুর্দশা নিয়ে যে জিজ্ঞাসাকে শাসক দলের নিরন্তর লজ্জাকণ্টক করে তোলার কথা ছিল। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এমন কোনও ঘোষণা করেনি যাতে পরিস্থিতির গুরুত্ব নিয়ে তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিতমাত্রও পাওয়া যায়। রাজধানীর সেই আশ্চর্য সিজেপি আন্দোলনের যে প্রধান দাবি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সাত দিনের মধ্যে সরানো— স্বভাবতই তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। সিজেপি-কে আন্দোলন করতে দেওয়ার নৈতিক গৌরবেই আপাতত শাসক বিজেপি ও দেশব্যাপী বিজেপি-মোহিত জনসমাজ আটখানা হয়ে আছে, আন্দোলনের বিষয়বস্তু এখনও গভীর তিমিরেই নিমজ্জিত।

অথচ ঘটনা হল, আন্দোলনটি কেবল বহু-আশঙ্কিত নয়, বহু-বিলম্বিতও বটে। গত প্রায় দেড় দশক ধরে কেন্দ্র-পরিচালিত পরীক্ষাগুলি একের পর এক কেলেঙ্কারিতে নিমজ্জিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্নপত্র ফাঁস। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা চলাকালীন প্রবল প্রযুক্তি বিভ্রাট। এর মধ্যে পড়ে, স্কুলশেষের পরীক্ষা সিবিএসই, বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা যেমন নিট এবং জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কর্মনিয়োগ পরীক্ষা যেমন শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশ রেলওয়ে ও অন্যান্য স্টাফ সিলেকশন পরীক্ষা— প্রকৃতপক্ষে ঘটছে দেশবাসীর অসীম সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতার পরীক্ষা। সরকারের জ্ঞাতসারে প্রতি বছর দেশবাসীর কেরিয়ার নামক ভাগ্য নিয়ে আক্ষরিক অর্থে ছিনিমিনি খেলা চলছে। যে-হেতু দুর্ঘটনা নয়, দুর্নীতি এই সব কেলেঙ্কারির উৎসে, বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হওয়া গিয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু যে স্বল্পসংখ্যক অভিযোগ বিচারের দ্বারে পৌঁছেছে, তার কোনও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা হয়নি, কাউকে কোনও দায় স্বীকারও করতে হয়নি। অথচ, সংক্ষিপ্ত নজরেই বোঝা যেতে পারে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার চেহারা কতখানি ভয়ঙ্কর। গত দুই দশকে অন্তত ৪৫টি প্রশ্ন-ফাঁসের মামলায় শাস্তিবিধান হয়েছে মাত্র দু’টি ক্ষেত্রে। প্রায় হাজার দুয়েক অভিযুক্ত, তার মধ্যে অর্ধেকেরও কম সংখ্যার জন্য চার্জশিট তৈরি হয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকারের এবং তথাকথিত ‘ডাবল এঞ্জিন’ চালিত রাজ্যগুলিতে সুশাসনের প্রচার বেড়েছে অতুলনীয় মাত্রায়।

কত দিন এই অবজ্ঞা ও অবহেলা চলতে পারে, সেটাই এখন দেখার। এ দেশের বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন প্রত্যাশার সামনে এই নির্দায় অব্যবস্থা এক দিন না এক দিন উত্তর দিতে বাধ্য। এই পরীক্ষাগুলি কেবল সাধারণ মান নির্ধারণের ব্যবস্থা নয়, এর উপরে নির্ভর করছে ভারতের মতো দেশের মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির শিক্ষা ও জীবিকার পথসন্ধান, পরবর্তী কালের স্বাস্থ্য পরিষেবা অর্জনের সুযোগ, সুষ্ঠু জীবনযাপনের সম্ভাবনা। সুতরাং অজুহাত দিয়ে এই ক্ষোভকে চাপা দিয়ে রাখার কথা যদি শাসকরা ভাবেন, তাঁদের বোঝা দরকার ‘এ কেবল দিনে রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রে’ অসন্তোষ নিবানোর বৃথা চেষ্টা। এই মুহূর্তে সর্বশক্তিতে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী না হলে পরিস্থিতি কঠিনতর হতে পারে।

আরও পড়ুন