Great Nicobar Island

জঙ্গল ‘পণ্য’ নয়, বাস্তুতন্ত্র

২০১১-র জনশুমারি অনুযায়ী শম্পেনদের সংখ্যা ২২৯। আর নিকোবরি-দের সংখ্যা ১২০০-র কাছাকাছি। শম্পেনরা নদী উপত্যকার সংরক্ষিত বনভূমিতে বসবাস করেন আর নিকোবরিরা পশ্চিম উপকূলে কিছুটা চাষবাস, প্রধানত প্ল্যান্টেশন-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিধানকান্তি দাস
শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৮:২২

সম্প্রতি জাতীয় পরিবেশ আদালত ‘গ্রেট নিকোবর প্রোজেক্ট’-কে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়েছে। ফলে পরিবেশ ও বিপন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপপুঞ্জে পণ্যবাহী জাহাজের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শহর নির্মাণে আর কোনও বাধা রইল না। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ যেমন জীববৈচিত্রে ভরপুর, তেমনই ছ’টি অত্যন্ত বিপন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর বাসস্থান। নিকোবর অঞ্চলে নিকোবরি ও শম্পেন জনজাতিভুক্তদের দেখা যায়। ভারতে যে ৭০৫ তফসিলি জনজাতি রয়েছে, তার মধ্যে বেশ কিছু জনজাতি গোষ্ঠী অত্যন্ত বিপন্ন। ভারত সরকার গঠিত ইউ এন ধেবর কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সব বিপন্ন জনজাতিভুক্তের উন্নতির লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে একটি বিশেষ শ্রেণি তৈরি করা হয়, যাদের বলা হয় ‘পার্টিকুলারলি ভালনারেবল ট্রাইবাল গ্রুপ’ বা ‘পিভিটিজি’। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ছ’টি জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচটিই এই বিশেষ শ্রেণির মধ্যে পড়ে। এই গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি জমি ও জঙ্গলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এই জনজাতিভুক্তদের জমি ও জঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্ক ধ্বংস হবে।

২০১১-র জনশুমারি অনুযায়ী শম্পেনদের সংখ্যা ২২৯। আর নিকোবরি-দের সংখ্যা ১২০০-র কাছাকাছি। শম্পেনরা নদী উপত্যকার সংরক্ষিত বনভূমিতে বসবাস করেন আর নিকোবরিরা পশ্চিম উপকূলে কিছুটা চাষবাস, প্রধানত প্ল্যান্টেশন-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৪-এর সুনামিতে তাঁদের জমিজমা বন্যায় ভেসে যায় এবং এঁরা ক্যাম্পবেল বে-র ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেন। ১৬৬ বর্গকিমি জমিতে সুবিশাল প্রকল্প গড়তে এই সব বিপন্নদের জন্য সুরক্ষিত অঞ্চল ও বনভূমি নেওয়া হচ্ছে। জনজাতিভুক্তদের জমি ও বিচরণক্ষেত্র কতটা নেওয়া হবে, সেটা মানচিত্রে সুস্পষ্ট নয়। শুধু জনজাতি সংরক্ষিত অঞ্চল, জাতীয় উদ্যান ও রাজস্ব গ্রামের সীমানা পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রকল্পে জনজাতিভুক্তদের জমি ও বাসস্থানে জনজাতি-বহির্ভূত মানুষদের প্রবেশ রুখতে ১৯৫৬ সালের ‘আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর আইল্যান্ডস প্রোটেকশন অব অ্যাবরিজিনাল ট্রাইবস রেগুলেশন’ আইন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। অচিরেই এই বিপন্ন জনজাতিভুক্তদের নিজের জমি ও জঙ্গল থেকে উৎখাত হতে হবে।

২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য কোনও জমি নিতে হলে ‘সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন’ ও যাঁদের জমি নেওয়া হবে তাঁদের সম্মতি আবশ্যক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের সময় স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর বক্তব্য শোনা হয়নি বলে দাবি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন করার আগেই স্থানীয় বন ও আদিবাসী উন্নয়ন দফতর প্রকল্পের পক্ষে তাদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছে। পরে অবশ্য নিয়ম রক্ষার্থে একটি বেসরকারি সংস্থা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০২২ সালের বন সংরক্ষণ আইন-এর নতুন বিধির বলে ওই জনজাতিভুক্তদের প্রাক্-সম্মতিও নেওয়া হয়নি। বিধি অনুযায়ী, জঙ্গলের জমিতে বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’মূলক কাজ বা খনন কাজে বেসরকারি সংস্থাকে কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি অনুমতি দেবে। এর জন্য স্থানীয় জনজাতি সম্প্রদায়ের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার অনুমতি দেবে বন উপদেষ্টা কমিটির মাধ্যমে, যেখানে সরকারি আমলার প্রাধান্যই বেশি। আদিবাসীরা জঙ্গলের মুখ্য অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও কমিটিতে তাঁদের স্থান নেই। এ ছাড়া জমি থেকে উৎখাত করতে গেলে আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হয়, তার পর উৎখাত করা যায়। এর কোনওটাই মানা হয়নি। এই প্রকল্পের জন্য বিপন্নরা দ্বিতীয় বার পাকাপাকি ভাবে বাস্তুচ্যুত হতে চলেছেন। তাঁদের পুনর্বাসন করা হবে কি না, করলে কী ভাবে করা হবে বা কোথায় করা হবে, স্পষ্ট নয়। গবেষণা জানাচ্ছে, ভারতে প্রায় সমস্ত পুনর্বাসন প্রকল্পে উৎখাত হওয়া মানুষের অবস্থার অবনতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অন্যথা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পে সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের শহর গড়ে তোলা হবে। এর ফলে দ্বীপপুঞ্জে দ্রুত জনসংখ্যাগত পরিবর্তন হবে, ফলে বিশেষত শম্পেনদের জীবনে প্রভূত প্রভাব পড়বে। ইতিহাস বলছে, ছোঁয়াচে রোগ, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, জমি বিচ্যুতি অন্যদের তুলনায় ছোট গোষ্ঠীর উপর প্রভাব বেশি ফেলে। বহিরাগতদের সংস্পর্শে সংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা বাড়বে এবং জনসংখ্যা নাটকীয় ভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যদিও প্রকল্পে বিভিন্ন রক্ষাকবচের কথা বলা হয়েছে, ট্রাইবুনাল সেটা যথাযথ ভাবে পালন করতে নির্দেশও দিয়েছে। কিন্তু রক্ষাকবচের নিয়মকানুন কতটা বাস্তবে মানা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। এই প্রকল্পের ফলে স্থানান্তরিত উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে, দ্বীপপুঞ্জের বাস্তুতন্ত্র স্বতন্ত্র এবং নির্দিষ্ট অবস্থান-কেন্দ্রিক। এটা অন্যত্র নতুন করে তৈরি করা যায় না। এই নির্দিষ্ট সমুদ্র-উপকূলবর্তী বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে স্থানীয় মাটি, উদ্ভিদ, অণুজীব ও প্রাণিকুলের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। হরিয়ানাতে নতুন করে সমপরিমাণ জমিতে প্ল্যান্টেশনের মাধ্যমে বননির্মাণ করে এই ক্ষতি পূরণ করার দাবি পরিবেশ বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যার নামান্তর। এ ছাড়া বহু রাজ্যের বিরুদ্ধে বনসৃজনে ভূরি ভূরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আসলে তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর জন্য জঙ্গলকে ‘পণ্য’ হিসাবে দেখা হচ্ছে। জঙ্গলকে বাস্তুতন্ত্র হিসাবে দেখা জরুরি।

আরও পড়ুন