Special Intensive Revision

নাগরিকত্বই সন্দেহের লক্ষ্যে

বর্তমানে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হাজিরা দিতে ও নথিপত্র দাখিল করতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে এই উদ্যোগকে আর নিছক একটি নিরীহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না।

পলাশ পাল
শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:৫৩

ভারতের সংবিধান সভায় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নে একাধিক বার বিতর্ক হয়েছিল। দেশভাগ পরবর্তী গভীর অস্থিরতা, উদ্বাস্তু স্রোত ও সীমান্ত সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সংবিধান প্রণেতাদের কয়েক জন নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অনেকেই এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। এই প্রেক্ষিতে, ১০ অগস্ট ১৯৪৯, এক বক্তৃতায় জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ভারত যেন এমন রাষ্ট্রে পরিণত না-হয়, যেখানে নাগরিকত্বকেই সন্দেহের চোখে দেখা হবে।

নেহরুর যুক্তি ছিল, অতিরিক্ত কঠোর আইন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকেই ক্ষুণ্ণ করবে। আম্বেডকর নাগরিকত্ব প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের উপর জোর দেন। বলেন, নাগরিকত্ব কোনও শর্তাধীন সুবিধা নয়, বরং এক মৌলিক অধিকার, যেখানে রাষ্ট্রের সংযম অপরিহার্য।

বর্তমানে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হাজিরা দিতে ও নথিপত্র দাখিল করতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে এই উদ্যোগকে আর নিছক একটি নিরীহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না। বাস্তবে এর মাধ্যমে ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব— যা সংবিধানস্বীকৃত রাজনৈতিক অধিকার— ক্রমশ নথিনির্ভর প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়েছে সেই জনগোষ্ঠীগুলির উপর, যাঁদের জীবন বাস্তবতা বরাবরই অনানুষ্ঠানিক। বিশেষত, পরিযায়ী শ্রমিক, গ্রামের দরিদ্র, বস্তিবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। জন্মের সার্টিফিকেট, জমির দলিল, পাসপোর্ট— এ সব কখনওই তাঁদের জীবনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেনি। ফলে এসআইআর তাঁদের জন্য হয়ে উঠেছে ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব হারানোর স্থায়ী ভয়।

নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর যুক্তি হিসেবে দেখায় মৃত, স্থানান্তরিত, ভুয়ো বা বিদেশি ভোটার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া। কিন্তু বিহারের ক্ষেত্রে এই যুক্তিগুলি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণিত হয়নি। বিহারে, ২০২৫-এর এসআইআর-এ প্রায় ৬৮ লক্ষ নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে। চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায় ৭.৪২ কোটি নাম, যা আগের থেকে প্রায় ৪৭ লক্ষ কম। এর জন্য নিয়মিত সংশোধন বা বিশেষ সংশোধন যথেষ্ট ছিল, এসআইআর-এর মতো ব্যাপক, নথিভিত্তিক যাচাইয়ের প্রয়োজন ছিল না। যদি বিদেশি বা ভুয়ো ভোটার খোঁজাই লক্ষ্য হত, তা হলে প্রথম এসআইআর হওয়া উচিত ছিল অসমে। কারণে যেখানে নাগরিকত্ব প্রশ্ন দীর্ঘ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু বর্তমানে অসমে চলছে শুধু বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া। এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে: এনআরসি-তে বাদ পড়া মানুষের বড় অংশই ছিলেন হিন্দু, ফলে এসআইআর-এর মতো বড় মাপের বাছাই প্রক্রিয়া শাসক রাজনীতির পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেত।

পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বাস্তবতায় নথিগত দুর্বলতা আরও ব্যাপক। পাশাপাশি এখানে ‘ভুয়ো ভোটার’ শব্দবন্ধটি প্রায়শই সীমান্তবর্তী মানুষ, উদ্বাস্তু নাগরিক, সংখ্যালঘু ও পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এবং কখনও ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে তাঁদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এটি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মেরুকরণের একটি অস্ত্র। সম্প্রতি পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখ-কে পে-লোডারে চাপিয়ে ও সুনালী খাতুনকে ‘পুশব্যাক’ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা দেখায়— রাষ্ট্রস্বীকৃত নথিপত্র দেখানোর পরেও তাঁদের নাগরিকত্ব স্বীকৃত হয়নি।

‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র প্রশ্নে হয়রানি, এই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রান্তিক মানুষেরা এই প্রক্রিয়াকে নাগরিকত্ব হরণের একটি উপায় হিসেবে দেখবেন, সেটাই স্বাভাবিক। অথচ রাষ্ট্র বা নির্বাচন কমিশনের তরফে তাঁদের আশ্বস্ত করার মতো কোনও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বা প্রচার লক্ষ করা যায়নি।

বিহারে এসআইআর অনুষ্ঠিত হয় বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতেও এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর পরই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র অজুহাতে একাধিক নির্দিষ্ট নথি প্রদর্শনের শর্ত বহু নাগরিকের পক্ষেই পূরণ করা কার্যত অসম্ভব, তাই ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়লে নির্বাচনী ফলাফলের উপর তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পড়বে।

এই ঘটনাগুলি আরও দেখায় যে, কে ভোটার হিসেবে গণ্য হবে, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াকে ‘স্বাভাবিক’-বলে মেনে নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, একই পদ্ধতি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার পথ খুলে যাবে। এটি একটি স্থায়ী প্রশাসনিক নজির তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতের সমস্ত নির্বাচনের চরিত্র বদলে দিতে পারে। সব শেষে এসআইআর নির্বাচনী রাজনীতিকে নীতির প্রশ্ন থেকে পরিচয়ের প্রশ্নে নামিয়ে এনেছে। কে নাগরিক, কে সন্দেহভাজন, কে অপ্রয়োজনীয় ভোটার— এই সব বিভাজন তৈরির একটি পথ তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্র যখন নাগরিককে ঠেলে দেয় স্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে, তখন গণতন্ত্র রূপ নেয় নিয়ন্ত্রিত, শর্তাধীন এবং সঙ্কোচনশীল এক রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। ভারত যেন ক্রমশ সে দিকেই হাঁটছে।

আরও পড়ুন