India-US Trade Deals

কৃষির বাজার খোলার পরে

আমেরিকার কৃষি এমনিতে বিপুল ভাবে ভর্তুকিপুষ্ট— কৃষকরা বছরে মাথাপিছু ফেডারাল ভর্তুকি পান ৩০,০০০ ডলারের বেশি। কিন্তু তার পরও চাষের খরচ বেড়ে যাওয়া, পণ্যের দাম কমে যাওয়া, ধার— সব মিলিয়ে কৃষকরা জর্জরিত।

অংশুমান দাশ
শেষ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৫৯

বিবিধ চাপে থাকা আমেরিকান কৃষিক্ষেত্রের জন্য ভিন দেশে বাজারের আয়তন বাড়াতে আমেরিকা এখন মরিয়া— কখনও তেলের ফাঁদ পেতেছে, কখনও সরকারকে সাঁড়াশি চাপ দিয়েছে। ফলস্বরূপ বাংলাদেশ, ভারতের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বাণিজ্য চুক্তি। ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে এই প্রথম অন্তর্ভুক্ত হল কৃষিপণ্যও। ভারতের কৃষকরা বিপদ বুঝতে পারলেও, সরকারের গুণমুগ্ধ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মহা আহ্লাদিত।

আমেরিকার কৃষি এমনিতে বিপুল ভাবে ভর্তুকিপুষ্ট— কৃষকরা বছরে মাথাপিছু ফেডারাল ভর্তুকি পান ৩০,০০০ ডলারের বেশি। কিন্তু তার পরও চাষের খরচ বেড়ে যাওয়া, পণ্যের দাম কমে যাওয়া, ধার— সব মিলিয়ে কৃষকরা জর্জরিত। কৃষির বিপুল খরচ সামলাতে প্রচুর টাকা ঢালতে হচ্ছে সরকারকে। এই খরচ তুলে আনার, সামাল দেওয়ার উপায় কী? একটাই— কোনও বিশাল বাজারে জিনিস বিক্রি করার সুযোগ পাওয়া। তাই আমাদের ১৪০ কোটি মানুষের বাজারের দরজা খোলার তোড়জোড়।

আমদানি করা জিনিসের উপর শুল্ক চাপলে তা বিক্রি করার সময় সেটির দাম বেড়ে যায়— ফলে দেশের জিনিসপত্র কিছুটা সস্তা থাকে, কেনার সময় লোকে সেই সব জিনিসকেই অগ্রাধিকার দেয়। এটা নিজের দেশের উৎপাদক ও বিক্রেতাকে সুরক্ষা দেওয়ার একটা রাস্তা। যখনই আমরা আমেরিকা থেকে বিনা শুল্কে জিনিস আমদানি করব, আমাদের উৎপাদকের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কিন্তু আমেরিকার বাজারে প্রবেশাধিকার শুল্কহীন নয়।

আমেরিকায় আমাদের কৃষিপণ্য রফতানির বাজার এখনই বছরে ৫০০-৭০০ কোটি ডলারের মতো— মাছ, চাল, মশলা এ সব ক্ষেত্রে। আর আমরা আপেল, নানা রকম বাদাম, সয়াবিন তেল, তুলো এই সব আমদানি করি, প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের। আমরা এখনই কাগজে-কলমে খাদ্যে স্বনির্ভর। তা হলে এত আমদানির দরকার কী? একটা দেশে যত আমদানি বাড়ে, ততই বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি বা ক্ষেত্রবিশেষে বেকারত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে— এ কথা নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যদিও এ কথা শুধু আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির সূত্র ধরেই প্রযোজ্য নয়— নিউ জ়িল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চিন সব দেশ থেকে আমদানিকৃত ফসলের ক্ষেত্রেই সত্য। যেমন হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীরের কৃষকরা দেশে আপেলের চাহিদা মেটান। কিন্তু নিউ জ়িল্যান্ড, ইউরোপের আপেল এখনই সেই বাজারে মন্দা এনেছে। এ বার বিনা শুল্কের আমেরিকান আপেল আরও এলে সে বাজারে ভারতীয় পণ্য আরও কোণঠাসা হবে, তেমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

এই মুহূর্তে আমেরিকায় শূকর, মুরগি, দুগ্ধজাত পণ্য, তুলো, সয়াবিন আর ভুট্টার বিপুল উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা এই বাজারে ঢুকবে। বহু দিন ধরে নানা ভাবে আমেরিকা ভারতে শূকরের মাংস পাঠানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। চুক্তিতে এখন সয়াবিন নেই, কিন্তু সয়াবিন তেল আছে। ভুট্টা নেই, কিন্তু শুকনো ভুট্টা আছে মুরগির খাবার হিসাবে। আরও আশঙ্কার বিষয় হল, এই তালিকা ক্রমশ-প্রকাশ্য, চূড়ান্ত নয়। এ মাসের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ কাগজপত্র আসবে মনে করা হচ্ছে, তখন এই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। এর মাঝেই এক বার ডাল রফতানি করা হবে বলে খসড়া তালিকায় উল্লেখ ছিল— ভারতে তা নিয়ে প্রবল আপত্তি তৈরি হওয়াতেই সম্ভবত আমেরিকান সরকারের তালিকা থেকে তা নিঃশব্দে সরে গিয়েছে। কিন্তু চুপিচুপি আর কী ঢোকানো যাবে, তা আমেরিকাই জানে। ভারত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে জোড়হস্ত— আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া শর্ত অমান্য করার মতো শিরদাঁড়ার জোর তার আছে বলে ভরসা হয় না।

শুল্ক ছাড়াও আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে আর এক ধরনের বিধিনিষেধ থাকে। সেটার ব্যাপারে খুব একটা আলোচনাও দেখছি না। অথচ, সেটাই উপভোক্তাদের প্রধান মাথাব্যথার কারণ হওয়া উচিত। কোন ধরনের গুণমানেরর পণ্য আমরা ঢুকতে দেব, তাতে কোনও রাসায়নিক থাকবে না, কোনও পোকা থাকবে না, জিন পরিবর্তত ফসল হবে কি না, এ সবই সেই শুল্কবহির্ভূত বাধার মধ্যে পড়ে। অন্য দেশের ফসল নিজের দেশে ঢোকার সময় সব দেশই এই ধরনের বিধিনিষেধ জারি করে থাকে দেশকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে, ক্রেতা সুরক্ষা বজায় রাখতে। আমেরিকা ভারতকে এই শুল্কবহির্ভূত বিধিনিষেধের ছাঁকনি তোলার ক্ষেত্রেও চাপ দিচ্ছে। অথচ নিজেদের বিধিনিষেধ তারা শিথিল করবে না। আমেরিকার সয়া এবং ভুট্টা জিনগত ভাবে পরিবর্তিত। সয়া তেল ও শুকনো ভুট্টা আমদানি আরও বাড়লে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে জিনগত ভাবে পরিবর্তিত খাবারের উপাদানের পরিমাণ বাড়বে। এই প্রশ্নগুলি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

বহু দিন ধরে চাপ রয়েছে ফসলের ন্যূনতম ক্রয়মূল্য তুলে দেওয়ার, রেশন ব্যবস্থায় আমদানি করা চাল, ডাল ঢোকানোর। কারণ তা এক বিশাল বাজার, বিশাল মুনাফা। আদিযুগ থেকে খাবার এখনও উপনিবেশ সৃষ্টির অস্ত্র। উপনিবেশ এখনও মরেনি। ঔপনিবেশিকতার কাছে নতজানু হয়ে থাকার স্বভাব এখনও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

আরও পড়ুন