শিলিগুড়ি উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এবং পশ্চিমবঙ্গের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংযোগস্থল। এই শহর আজ এক ভয়াবহ পরিবেশগত সঙ্কটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক শীতকালীন মাসগুলিতে শিলিগুড়ির আকাশ এক ঘন বিষাক্ত চাদরে ঢাকা পড়ে থাকছে। এর নেপথ্যে কেবল ক্রমবর্ধমান যানবাহনের ধোঁয়াই নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি (ডব্লিউবিএসইডিসিএল) কর্তৃক পরিচালিত ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক তার প্রকল্পের বিশৃঙ্খল বাস্তবায়ন, ডন বস্কো ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা ভাগাড়ে বর্জ্য পোড়ানোর এবং বায়ুমান পরিমাপক সেন্সরগুলির রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা দায়ী। এই পরিস্থিতি একটি পরিবেশগত বিপর্যয়।
শিলিগুড়ির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভারতের অনেক বড় মেট্রো শহরকেও হার মানায়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী জনসংখ্যা ছিল ৫,১৩,২৬৪ জন, যা ২০২৫ সালে এসে ১০ লক্ষের গণ্ডি অনায়াসেই ছাড়িয়ে গেছে। বিপুল জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা। বর্তমানে শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছ’লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে, যার একটি বড় অংশ পুরনো এবং উচ্চ দূষণকারী। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, শিলিগুড়ির বাতাসে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটারের ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বহু গুণ বেশি।
উদ্বেগজনক বিষয় হল, দিনের বেলা যেখানে এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স (একিউআই) বা বাতাসের গুণমান সূচক মাপকাঠি কিছুটা সহনীয় থাকে, রাত বাড়ার সঙ্গে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ৮ ডিসেম্বরের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেলে চারটের সময় একিউআই ছিল ৮৩, কিন্তু রাত এগারোটায় তা লাফিয়ে ১৭৩-এ পৌঁছে যায়। এই রাতের দূষণ মূলত ভাগাড়ের ধোঁয়া এবং টেম্পারেচার ইনভার্সন বা তাপমাত্রার বৈপরীত্যের কারণে ঘটে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি শিলিগুড়ি শহরে মাথার উপরের বিদ্যুৎ সংযোগ সরিয়ে মাটির নীচ দিয়ে তার নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এক বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি উন্নয়নমূলক কাজ হলেও এর বাস্তবায়নের পদ্ধতিটি শহরবাসীর জন্য এক ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দফতরের মাধ্যমে ‘জ্যাক পুশিং’ এবং ‘মাইক্রো টানেলিং’ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এই আধুনিক পদ্ধতিতে মাটি না খুঁড়েই মাটির নীচে গর্ত তৈরি করে তার বসানো সম্ভব, যা রাস্তার কোনও ক্ষতি করে না এবং ধুলো উৎপাদন করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ঠিকাদার সংস্থাগুলি ব্যাপক ভাবে ‘ওপেন কাট’ বা সরাসরি রাস্তা খুঁড়ে কাজ করছে। ভারতীয় সড়ক কংগ্রেস (আইআরসি) এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কের পরিবেশগত গাইডলাইন না মেনে চলেছে রাস্তা কেটে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুতের তার বসানোর কাজ। এর ফলে বাতাসে পিএম ১০-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১.৭ থেকে ২.৮ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।
শিলিগুড়ির সচেতন নাগরিক মহলের প্রশ্ন— কেন এই প্রকল্পে এমন মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটল? এই প্রকল্পের আদি প্রস্তাব এবং বর্তমান বাস্তবায়ন পদ্ধতির মধ্যে যে ফারাক, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। শিলিগুড়ির বায়ুদূষণ সঙ্কটের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হল সেবক রোড সংলগ্ন ডন বস্কো স্কুল সংলগ্ন ২৮ একরের বিশাল ভাগাড়। প্রায় ৬৫ বছর ধরে এই স্থানটি শহরের সমস্ত বর্জ্য ফেলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ২.১৩ মিলিয়ন টন ‘লিগ্যাসি ওয়েস্ট’ বা দীর্ঘ দিনের পুরনো আবর্জনা স্তূপাকার হয়ে ছোটখাটো পাহাড়ের আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যা ও রাতের দিকে এই ভাগাড়ের ধোঁয়া থেকে নির্গত মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস, অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা এবং কুয়াশার সঙ্গে মিশে শহরের বায়ুমণ্ডলে একটি ঘন ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। এর ফলে বায়ুর মানের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটছে। উপরন্তু, শিলিগুড়ি শহরে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, সবুজ আচ্ছাদন ও প্রশস্ত সড়কের ঘাটতি থাকার কারণে বায়ু চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা দূষিত কণাগুলোর বিচ্ছুরণকে সীমিত করে দেয়। এই সম্মিলিত প্রভাবের ফলে শহরের বায়ুদূষণের ঘনত্ব মারাত্মক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হল সঠিক তথ্য সংগ্রহ। শিলিগুড়ি শহরে দূষণ পরিস্থিতি পরিমাপ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং পুরসভা কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় ‘কন্টিনিউয়াস অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশন’ স্থাপন করেছিল। বর্তমানে অভিযোগ, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষার খাতিরে এই সেন্সরগুলিকে প্রায়শই উদ্দেশ্যমূলক ভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হচ্ছে। মানুষকে বায়ুদূষণের প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে সচেতন ভাবে অবহিত করা হচ্ছে না। উল্লেখযোগ্য, ২০১৮ সালে শিলিগুড়ি শহরের জন্য প্রণীত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাকশন প্ল্যান’— যার উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সঙ্কট মোকাবিলায় সুসংহত পদক্ষেপ করা— আজ কার্যত একটি পরিত্যক্ত নথিতে পরিণত হয়েছে। শিশুরা এই দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার। বয়স্কদের উপর প্রভাব— নিঃশব্দ মৃত্যু ও মানসিক সক্ষমতার ক্রমাবনতি।
শিলিগুড়ির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রধানত তিনটি সংস্থাকে দায়ী করা যায়: শিলিগুড়ি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (এসএমসি), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি এবং পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। এসএমসি-র প্রধান ব্যর্থতা হল বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অস্বচ্ছতা। বায়ো-মাইনিং প্রকল্পের অনুমোদন পেতে এবং তা কার্যকর করতে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে, তার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। অন্য দিকে, ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর ব্যর্থতা মূলত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুতের তার স্থাপন প্রকল্পের তদারকি ও পরিকল্পনায় চরম গাফিলতি। শহরের রাস্তাঘাট পরিকল্পনাহীন ও অবৈজ্ঞানিক ভাবে খুঁড়ে ফেলার ফলে শুধু যে বাতাসে পিএম ১০ ও পিএম ২.৫ কণার ঘনত্ব বেড়েছে তা নয়, শহরের যানবাহন চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহ ভেঙে পড়েছে। যেখানে আগে যানজট মূলত প্রধান সড়কগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন পাড়া-মহল্লার গলি ও আবাসিক এলাকাতেও দীর্ঘস্থায়ী যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যা বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ— উভয় সমস্যাকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্য দিকে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ কেবল পরিসংখ্যান সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে, কোনও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা আইনানুগ পদক্ষেপ করছে না। তাই শহরের সচেতন নাগরিকরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা দাবি করছেন: প্রথমত, ডব্লিউবিএসইডিসিএল এবং পূর্ত দফতরের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক প্রস্তাবে কি ‘ওপেন কাট’ পদ্ধতির উল্লেখ ছিল? না কি তা পরবর্তী কালে খরচ কমাতে পরিবর্তন করা হয়েছে? যদি পরিকল্পনা পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তবে তা কারিগরি ও পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে হয়েছে কি না, স্পষ্ট হওয়া জরুরি। না কি এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী চক্রকে বাড়তি সুবিধাদেওয়ার উদ্দেশ্য কাজ করেছে? আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন— ভূগর্ভস্থ বিদ্যুতের তার স্থাপনের ক্ষেত্রে সর্বত্র কেন পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা করা হচ্ছে না? দ্বিতীয়ত, কেন আধুনিক ‘জ্যাক পুশিং’ পদ্ধতির বদলে আদিম ‘ওপেন কাট’ পদ্ধতি বেছে নেওয়া হল, তা নিয়ে ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা উচিত এবং একটিনিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে এর অডিট করানো প্রয়োজন।
গত বর্ষায় কলকাতায় ভূগর্ভস্থ তার-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় অন্তত বারো জনের মৃত্যু এক গভীর সতর্কবার্তা বহন করে। শিলিগুড়িও কি সেই একই বিপজ্জনক পথে এগিয়ে যাচ্ছে? মনে রাখা জরুরি, এই নগর তথা এই অঞ্চলকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য হিসাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।