Student Union Election

যে নির্বাচন হওয়ার কথা, হয়নি

ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে বার বারই অশান্তি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, সেই অশান্তিতে অগ্রণী ভূমিকা শাসক দলের ছাত্র সংগঠনেরই।

মধুমিতা দত্ত
শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৪

রাজ্যে এখন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে সাজ সাজ রব। কিন্তু, আর একটি জরুরি নির্বাচন বছরের পর বছর বকেয়া রয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন। দীর্ঘ ন’বছর রাজ্যের অধিকাংশ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভোট হয়নি। শুধু একক বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ যাদবপুর, রবীন্দ্রভারতীর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্বাচন হয়েছে। তাও বছর ছয়েক আগে। প্রথম দিকে নির্বাচন না-হওয়ার কারণ হিসাবে অতিমারির কথা বলত প্রশাসন। কিন্তু তার পরেও কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটি বছর। বিষয়টি আদালতের দোরগোড়াতেও পৌঁছেছে। প্রশাসন এমন যুক্তিও দিয়েছে যে, বেশ কিছু দিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্থায়ী উপাচার্য ছিল না, তাই নির্বাচন করানো সম্ভব হয়নি।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে বার বারই অশান্তি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, সেই অশান্তিতে অগ্রণী ভূমিকা শাসক দলের ছাত্র সংগঠনেরই। ভর্তিতে নাক গলানো-সহ ছাত্র সংসদের বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি নিয়ে বার বার অভিযোগ উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী একাধিক বার সেন্ট জ়েভিয়ার’স কলেজের আদলে রাজ্যের সমস্ত কলেজে অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। চেয়েছিলেন, সেন্ট জ়েভিয়ার’স-এ যে ভাবে দলীয় পতাকাহীন ছাত্র সংসদ পরিচালিত হয়, সেই মডেলে রাজ্যের সব কলেজে নির্বাচন হোক। উদ্দেশ্য, ক্যাম্পাস থেকে হিংসা দূর করা, পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখা।

২০১৭-য় এই বিষয় মাথায় রেখে নতুন বিধিও প্রকাশ করে সরকার। বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত ছাত্র সংসদের মেয়াদ দু’বছর হওয়ার কথা। বলা হয়, স্টুডেন্ট’স ইউনিয়ন নয়, নাম হবে স্টুডেন্ট’স কাউন্সিল। কিন্তু সেই বিধি নিয়ে বিতর্ক এবং বিরোধিতা শুরু হয়। ‘জ়েভিয়ার’স মডেল’-এর বাস্তবায়ন আজও হয়নি। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন না হওয়ার ফলে ক্যাম্পাসের ‘দাদাগিরি’ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলেজের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয়। বৈধ ছাত্র সংসদ না থাকলেও, প্রায় প্রতিটি কলেজেই শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের দাপট অব্যাহত। উদ্বেগের বিষয়, এই সব সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন এমন বহু ‘ছাত্রনেতা’, অনেক আগেই যাঁদের লেখাপড়ার পাট চুকেছে।

প্রাক্তন পড়ুয়াদের ‘দাদাগিরি’ ক্যাম্পাসগুলোতে ভীতিপ্রদ পরিবেশ তৈরি করেছে। ইউনিয়ন রুম আর সাধারণ পড়ুয়াদের স্বার্থে ব্যবহৃত নয়, বরং হয়ে উঠেছে বহিরাগত ও প্রাক্তনীদের আড্ডাস্থল। কসবার দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজের ঘটনা এই বাস্তবকে সকলের চোখের সামনে এনেছিল গত বছর। ওই কলেজের ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তারা শাসক দলের ছাত্রনেতা এবং প্রাক্তন ছাত্র। এর পরে কলেজে বহিরাগতদের দাপট কমাতে আদালতকে রাজ্যের সমস্ত কলেজের ইউনিয়ন রুম বন্ধের নির্দেশ দিতে হয়েছে। তার আগেই অবশ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের অন্তর্বর্তিকালীন উপাচার্য শান্তা দত্ত দে ক্যাম্পাসগুলির ইউনিয়ন রুমে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। এত উদ্যোগের পরেও অনেক ক্ষেত্রেই সেই দাপট কমেনি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার হস্তান্তর নয়, বরং সাধারণ মানুষের— এই ক্ষেত্রে, সাধারণ পড়ুয়াদের— মতামতের বহিঃপ্রকাশ। অথচ পশ্চিমবঙ্গে গত ন’বছরে বিধানসভা থেকে লোকসভা নির্বাচন ঠিক সময়ে সম্পন্ন হলেও থমকে আছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। অনেক পড়ুয়া কলেজে ভর্তি হয়ে পাশ করে বেরিয়েও যাচ্ছেন। ক্যাম্পাসে যে আদৌ তাঁদের ছাত্র সংসদ গড়ার ভোটাধিকার ছিল, অনেকে সে কথা টেরও পাননি। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীও বদলেছেন। কিন্তু ছাত্র ভোট হয়নি। বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি ধারাবাহিক ভাবে নির্বাচন দাবি করেছে, কিন্তু ফল মেলেনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগে বার বার শুধুই ‘আগ্রহী’ হওয়ার আশ্বাসটুকু মিলেছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী বার বার জানিয়েছেন, তাঁরা ছাত্র ভোট করতে খুবই আগ্রহী। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু মাসের পর মাস গেলেও ক্যালেন্ডারে ভোটের তারিখ আসেনি। গত বছর ১ মার্চ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই একই দাবিতে যে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটেছিল, তা প্রশাসনের টনক নড়াতে যথেষ্ট ছিল। শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে ছাত্রদের একাংশের বিক্ষোভ, শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি ভাঙচুর এবং সেই গাড়ির ধাক্কায় একাধিক পড়ুয়ার আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তার এক বছর অতিক্রান্ত। আরও একটি বিধানসভা ভোট সামনেই। অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি।

শিক্ষা প্রাঙ্গণ থেকে ছাত্র ভোটের অধিকার অপসৃত হলে তার অভিঘাত শুধু সেই পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না— বৃহত্তর সমাজেও সেই গণতন্ত্রহীনতার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ তার বহু নিদর্শন সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছে। তাই অবিলম্বে অবাধ ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রয়োজন। ইউনিয়ন রুমে তালা ঝুলিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রাক্তনীদের হস্তগত হওয়া ক্যাম্পাসগুলিকে সাধারণ পড়ুয়াদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই প্রধান দাবি। কয়েক মাস পরেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হবে। ছাত্র ভোট নিয়েও নতুন নির্বাচিত সরকারের সক্রিয়তা জরুরি। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ক্যালেন্ডার। গণতন্ত্রের গুরুত্বের কথা যদি শাসকদের স্মরণে না-ও থাকে, তবু এই ছাত্র-নির্বাচনকে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসাবেই দেখা উচিত।

আরও পড়ুন