দু’টি জনগোষ্ঠী পরস্পরের সংস্পর্শে এলে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান স্বাভাবিক। তবে সম্পর্কটা নির্ভর করে ক্ষমতার কমবেশির উপর। যাদের ক্ষমতা কম তারা অধিক ক্ষমতাশালীর সংস্কৃতিরঅনুকরণ করে। অনেক সময় সচেতন ভাবেই করে, ঊর্ধ্বমুখী সামাজিক সচলতার লক্ষ্যে। সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতিও অল্পবিস্তর থেকে যেতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী এম এন শ্রীনিবাসের ‘সংস্কৃতায়ন’ (‘সানস্কৃটাইজ়েশন’) তত্ত্বটি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। জনজাতি বা নিচু জাতের মানুষদের উঁচু জাতের সাংস্কৃতিক প্রতীক (দেবদেবী, পূজাপদ্ধতি, উপবীত) গ্রহণ করে জাতে ওঠার প্রয়াস এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এই রকম প্রয়াসে ব্রাহ্মণ্যবাদী থাকবন্দি জাতিসমাজের একেবারে শীর্ষে ব্রাহ্মণদের মধ্যে স্থান পাওয়ার আশা ছিল না। সচরাচর অনুকরণকারীরা ক্ষত্রিয়ত্বের দাবি করে জাতিসমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে চাইত। কোচদের রাজবংশী হওয়া এর একটি উদাহরণ। কখনও কখনও কোনও আদিবাসী গোষ্ঠীর শুধু এলিট স্তরটিই নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই ক্ষমতাবৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সংস্কৃতায়ন’ ঘটাত। যেমন মুন্ডাদের নাগবংশী রাজবংশ। আবার নিজেদের পৃথক ধর্মীয় গোষ্ঠী তৈরির দৃষ্টান্ত ওরাওঁ-দের ‘টানা ভগত’ বা নমশূদ্রদের মতুয়া হওয়া। দু’টিরই প্রণোদনা অবহেলিত বঞ্চিতদের কাছে ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী বৈষ্ণব ধর্মের আবেদন। অর্থাৎ ‘হিন্দুকরণ’ প্রক্রিয়া সব সময় আত্মপরিচয় বিসর্জন নয়, বরং প্রায় ক্ষেত্রে আত্মঘোষণারই দ্যোতক। মোটের উপর প্রক্রিয়াটি বৈচিত্রময় ও জটিল।
সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা প্রভৃতি আদিবাসীদের নিজেদের ধর্ম থেকে ক্রমে হিন্দু ধর্মের দিকে যাত্রায় কখনও কখনও একটি আপাত-বিরোধিতা লক্ষিত হয়। নিপীড়ক ‘দিকু’দের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের 'হুল’ (১৮৫৫) ব্যর্থ হওয়ার কয়েক বছর পর খেরওয়ার আন্দোলন শুরু হল। নিজেদের বোঙ্গা পুজো থেকে সরে এসে তারা ওই হিন্দু দিকুদেরই ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-আচরণ অনুসরণ করতে লাগল ‘শুদ্ধিকরণ’-এর উদ্দেশ্যে (যেমন রামচান্দোর পুজো, শুয়োর-মুরগি মারা বন্ধ করা)। এই আন্দোলনের ব্যাখ্যায় মার্টিন ওরান্স প্রদত্ত ‘র্যাঙ্ক কনসেশন সিনড্রোম’ তথা নিজেদের হীনতা স্বীকার করে নেওয়ার তত্ত্ব কিন্তু অনেক পণ্ডিতের কাছেই গ্রাহ্য হয়নি। কারণ পরাজয় স্বীকার নয়, বরং খেরওয়ার আন্দোলন হয়েছিল ‘সাঁওতাল রাজ’ প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তা ছাড়া সাঁওতাল সমাজের সবাই এ সব বিধিনিষেধ মানেওনি। ‘সাফা হোর’দের পাশাপাশি ‘ঝুটা হোর’রাও ছিল। আর খেরওয়ার তো ছিল একটা সাময়িক পর্ব। ত্রয়িজ়ি নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সাঁওতালদের আস্থার কথাই বেশি করে বলেছেন। তবুও ক্রমে সাঁওতাল সমাজে প্রতিবেশী হিন্দুদের কালী, দুর্গা প্রমুখের পুজো বহুব্যাপ্ত হয়।
১৯২০-র দশক থেকে অন্য ব্যাপার। বাইরে থেকে পরিকল্পিত হিন্দুকরণের প্রকল্পে শামিল হওয়া, যদিও নিজেদের তাগিদও নিশ্চয়ই ছিল। আর্যসমাজীরা সাঁওতালদের ধর্মান্তরিত করে হিন্দু বানাতে থাকে। ১৯৩১-এর সেন্সাসে তারা অনেকে নিজেদের ‘হিন্দু’ পরিচয় নথিবদ্ধ করে। সদ্য-আহৃত হিন্দুত্বের উৎসাহে জিতু সাঁওতাল মালদহের আদিনা মসজিদ দখল করতে যান। তার পরেও অবশ্য মোটের উপরে সাঁওতালরা নিজেদের আদি পরিচয় অনেকেই ছাড়েনি। আজও অনেকে সাঁওতাল পরিচয় সগর্বে ধরে রেখেছে। আবার এটাও ঠিক যে, সম্প্রতি ভারতব্যাপী হিন্দুত্বের উত্থান তাদের উপরেও প্রভাব ফেলেছে। ফলে সাঁওতালদের জাহের-এরার থানে হিন্দু দেবদেবীরা স্থান পাচ্ছেন, অনেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমর্থক। এ সব কতটা ক্ষমতায়নের কৌশল? কতটা সত্যি নিজেদের বদলে ফেলা? কতটা অপ্রতুলতা বা হীনতা স্বীকার? উত্তর সহজ নয়।
প্রশ্নগুলি মনে এল শুধু সাঁওতাল বা জনজাতিভুক্তদের কথা ভেবে নয়, সামগ্রিক ভাবে বাঙালির কথা ভেবে। বেশ কিছু বছর ধরেই শুধু জনজাতিভুক্তরাই নয়, সমস্ত বাঙালির উত্তর ভারতীয় ধাঁচে হিন্দু হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া প্রকট হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে যেন, বাঙালি হিন্দু আগে কিছুটা কম হিন্দু ছিল (যেমন বাঙালি মুসলমানকেও উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের তুলনায় ঊন-মুসলমান ভাবা হত)। উত্তর ভারতের হিন্দুদের কিছু প্রতীক, যেগুলি একটি ক্ষমতাবিস্তারী রাজনীতি দ্বারা প্রত্যয়িত, সেগুলি গ্রহণ করে বাঙালি জাতে উঠছে। অপ্রধান দেবতা রামের গুরুত্ব বৃদ্ধি, হনুমান-ভক্তি, মোটের উপরে প্রবল ধর্মাচ্ছন্নতা— এর বড় লক্ষণ। এমনিতে অবশ্য হিন্দু সংস্কৃতিতে বহুবিধতাই ঐতিহ্য (নাস্তিকতাও যার অন্তর্ভুক্ত), নানা রকমের ধর্মীয় প্রতীক সেখানে অনায়াসেই মান্যতা পায়, যে কারণে তা আদিবাসী গোষ্ঠীগুলিকেও সহজে গ্রহণ করতে পারে (নির্মলকুমার বসুর কথায় ‘হিন্দু মেথড অব ট্রাইবাল অ্যাবসর্পশন’)। কিন্তু সম্প্রতি মনে হচ্ছে, প্রক্রিয়াটি তার থেকে বেশি কিছু।
যেমন, একটি ভ্রষ্টাচারী সরকারকে পাল্টানো নাহয় দরকার ছিল, পাল্টিয়ে খুশি হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য ত্যাগী সন্ন্যাসীর বিনম্র গৈরিকও নয়— আগ্রাসী আগুনে-কমলা রঙের পোশাক পরে উল্লসিত ‘জয় শ্রীরাম’ চিৎকার, অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের কপালে গেরুয়া তিলক লাগানোর দরকার ছিল না। ব্যাপারটা অনেকটা সংস্কৃতির রূপান্তর বলেই মনে হচ্ছে। সরকার পাল্টাতে গিয়ে বাঙালি কি নিজেকেও পাল্টে ফেলল?
অবশ্য বাঙালি আত্মপরিচয়ে বরাবরই অনেক ফাটল— অঞ্চল, শ্রেণি, জাতি, ধর্মের। জনজাতি বা দলিতরা কতটা বাঙালি বলে গণ্য? ‘লোকটা বাঙালি নয়, মুসলমান’-ও তো বহুশ্রুত। বাঙালি পরিচয়টিতে শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু ভদ্রলোকদের আধিপত্যবাদ স্পষ্ট। ইদানীং যদিও মুসলমান বাদে অন্য পরিচয়গুলিকে সংহত করে অন্য রকম বাঙালি সংস্কৃতি নির্মাণের চেষ্টা চলছে। এ প্রশ্নও করা যায়, এই তথাকথিত উদারমনস্ক এমনকি বামপন্থী ভদ্রলোকদের আধিপত্যের আওতায় যে বাঙালি সংস্কৃতি, তাতে কতখানি গভীরতা, নৈতিকতা ও প্রত্যয়ী সাহস ছিল বা আছে? ঔপনিবেশিক আমলে ছিল সাহেব হওয়ার প্রবল চেষ্টা। অন্য দিকে এমন একটা সংস্কৃতির নির্মাণ, যেখানে শিল্পসাহিত্যের উপর অতিরিক্ত ঝোঁক দিয়ে সেটাকেই ‘সংস্কৃতি’ ভাবা (অ্যান্ড্রু সার্তোরি কথিত ‘কালচারালিজ়ম’), নির্বিচার ঐতিহ্যকীর্তন, তার পর সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ক্রমবর্ধমান অশিক্ষায়ণ ও স্থূলতা; তৎসত্ত্বেও গর্বিত প্রাদেশিকতায় মজে থাকা। যদি বা মনন ও জীবন মিলিয়ে সত্যিকারের উৎকর্ষ অর্জন করে থাকেন কতিপয় বাঙালি, তাঁরা নিশ্চয়ই বাঙালির প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে পারেন না।
উপরন্তু নব্য-উদার অর্থনীতি নিয়ে এসেছে পণ্যকামী বিনোদনমুখী বিশ্বায়িত সংস্কৃতি। ধনতেরস, ‘সঙ্গীত’ বা লেহেঙ্গার বাঙালি বিয়ের অঙ্গ হয়ে ওঠার পিছনে তো কোনও রাজনৈতিক তাগিদ নয়, ওই বাজার-তাড়িত সংস্কৃতি। আজ বিশ্ব জুড়ে সর্বস্তরের মানুষেরই ‘উন্নয়ন’ তাড়নায় প্রকৃতি-পরিবেশের সর্বনাশ নিয়ে উদাসীনতা, কোনও অপরায়িত গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা ও আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজের যত অপ্রাপ্তি মিটিয়ে নেওয়া। বাংলা তথা ভারত বিশ্বের বাইরে নয়।
আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গে কিন্তু মানতে হবে— বেঁচে থাকার মানেই পারস্পরিকতা। তা-ই শুধু বাঙালি বা ভারতীয় নয়, জনজাতি, দলিত, হিন্দু, মুসলমান সব আত্মপরিচয়ই ‘সূচনাবিন্দুর বেশি কিছু নয়, জীবনের অভিজ্ঞতায় যাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই হয়— অন্ধ ভয় ও বিদ্বেষ ছাড়া আত্মপরিচয়ের বিচ্ছিন্নতার উপর জোর দেওয়ার কোনও কারণই নেই।‘ (এডওয়ার্ড সাইদ) ইতিহাসবিদ, নৃতত্ত্ববিদরাও বলেন, সংস্কৃতির বিশুদ্ধতার ধারণা নিতান্ত অলীক, নানা সংস্কৃতির স্রোত মিলেমিশেই জায়মান মানব সংস্কৃতি।
সুতরাং মনে হতেই পারে, বাঙালি নিজের সংস্কৃতির একটু সংস্কার সাধন করলই বা। সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বাংলার অন্তর্ভুক্তিও তো প্রয়োজন। তবে কতটা রাজনৈতিক স্বয়ংক্রিয়তা বজায় রাখলে যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সঙ্গত হবে; সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কতটা সমঝোতা করা যাবে; হিন্দু, অ-হিন্দু সকলের জন্য স্নেহ-মায়ার আঁচল বিছিয়ে না রাখলে ‘সোনার বাংলা’ গড়া যাবে কি না— আশা করি, বাঙালি সে সব বুঝে নেবে।
আর এও জানা যে, জিতু সাঁওতালের হিন্দু আগ্রাসনের শ’খানেক বছর পরেও জিতু মুন্ডাকে মৃত দিদির অ্যাকাউন্টের সামান্য ক’টা টাকা আদায় করতে দিদির কঙ্কাল কবর থেকে তুলে ব্যাঙ্কে নিয়ে যেতে হয় উত্তরাধিকারের প্রমাণ দাখিলের জন্য।