Budget 2026

অমৃতকালের নীলনকশা

সমাজমাধ্যম-শাসিত অর্থব্যবস্থায় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দু’পয়সার মুখ দেখছেন, সে কথা অস্বীকার করা যায় না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ডেকে পুরস্কার দিচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে ছবি-টবি তুলছেন— কাজেই, অর্থমন্ত্রীও তাঁদের কথা ভেবেছেন।

অমিতাভ গুপ্ত
শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪৮
অপেক্ষা: দৈনিক কাজের খোঁজে দিল্লির রাস্তায় ভিড় জমিয়েছেন অদক্ষ শ্রমিকরা।

অপেক্ষা: দৈনিক কাজের খোঁজে দিল্লির রাস্তায় ভিড় জমিয়েছেন অদক্ষ শ্রমিকরা।

বাজেট-বক্তৃতা শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফোন করলেন বিজেপি-পন্থী এক খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ। বললেন, অতি চমৎকার বাজেট। কেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা শোনার পর জানতে চাইলাম, কর্মসংস্থানের ব্যাপারটা কী হল তবে? বললেন, আর্থিক উদারীকরণের পর বামপন্থীরা অভিযোগ করতেন, জবলেস গ্রোথ হচ্ছে। তার পর, ইউপিএ-র আমলে কর্মসংস্থান যোজনা-টোজনার মাধ্যমে আরম্ভ হল গ্রোথলেস জব। এত দিনে একটা দিশা পাওয়া গিয়েছে, যেখানে আর্থিক বৃদ্ধিই কর্মসংস্থানকে টেনে নিয়ে চলবে। আর্থিক সংস্কার হচ্ছে, পরিকাঠামোর দিকে সরকার নজর দিচ্ছে— শিল্প আসবে, বিনিয়োগ হবে, নিজে থেকেই তৈরি হবে অনেক কাজ। তার জন্য আর আলাদা প্রকল্প লাগবে না।

এত দিনে! গত কয়েক বছরের বাজেটে নির্মলা সীতারামন কী বললেন তবে? এখন এ সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হয়ে গিয়েছে— সরকারি ওয়েবসাইটেই প্রত্যেক বছরের বাজেট-বক্তৃতা দেওয়া থাকে, শুধু ডাউনলোড করে পড়ার অপেক্ষা। ২০২২-২৩ থেকে এ বছর, মোট পাঁচটা বাজেট বক্তৃতা ঘেঁটে দেখা গেল, ভাষার একটু এ দিক-ও দিক হয়েছে বটে, কিন্তু সরকারের অবস্থানটি মোটের উপরে অপরিবর্তিত। একদম সোজা কথায় যা দাঁড়ায়, তা হল: অন্তত গত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার কর্মসংস্থানের অভাবকে আলাদা সমস্যা হিসাবে দেখেনি— বলেছে, লগ্নি হলে কর্মসংস্থান আপনা থেকেই হবে। কোনও বাজেটে তার জন্য যুবশক্তির বিশেষ প্রশিক্ষণের কথা আছে; কোনও বাজেটে বলা হয়েছে যুবশক্তির উন্নতির জন্য উৎপাদন ব্যবস্থার কুশলতা এবং প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। কিন্তু, অন্য কিছুর পার্শ্বফল হিসাবে নয়, সরাসরি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সরকার কী ভাবছে, এই প্রশ্নের উত্তর অন্তত গত পাঁচ বছরের বাজেট-বক্তৃতায় নেই।

বলতেই পারেন, মহা মুশকিল তো! বিনিয়োগ এলে, নতুন শিল্প তৈরি হলে কর্মসংস্থান হবে, এ কথাটা মানতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা এক নয়, একাধিক জায়গায়। প্রথম কথা হল, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, বিনিয়োগ এলেই কর্মসংস্থানও বাড়ে, তবুও প্রশ্ন, বেসরকারি বিনিয়োগই কি আদৌ আসছে? প্রতি বাজেট-বক্তৃতাতেই অর্থমন্ত্রী আশাবাদী থাকেন যে, এই বার বিনিয়োগ এল বলে! এ দিকে, পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে ভারতে কর্পোরেট ক্ষেত্রের মূলধনি ব্যয় কার্যত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে গ্রোস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন নেমে গিয়েছিল এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে। সুতরাং, প্রথম ধাপেই আটকে যাচ্ছে বাজেটের আশাবাদ।

বিনিয়োগ যদি বা আসে, তার অভিমুখ কোন দিকে হবে, সে বিষয়ে বাজেট-বক্তৃতা কী বলছে, সে হিসাবও দেখা দরকার। এ বছর, এবং তার আগের চার বছরের বাজেট-বক্তৃতায় যে ক্ষেত্রগুলি উঠে এসেছে, সেগুলি হল সেমিকন্ডাকটর, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক, লজিস্টিকস, পণ্য করিডর, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, মূলধনি পণ্য ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রগুলির প্রতিটিই মূলধন-নিবিড়। এখানে বিনিয়োগ যতই বাড়ুক, তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ে না। আর, যে চাকরি হয়, তার জন্য দক্ষতা প্রয়োজন। গত পাঁচ বছরের বাজেট খুঁটিয়ে পড়ে দেখুন, সেখানে বিবিধ পেশাদারি প্রশিক্ষণের কথা রয়েছে— কিন্তু, সরকার প্রশ্ন করেনি যে, প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে প্রস্তুত? প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি দীর্ঘ দিনের অবহেলা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, উচ্চ দক্ষতা অর্জন করার সাধ্যই দেশের শ্রমশক্তির সিংহভাগের নেই। কাজেই, বিনিয়োগ এলেও তার হাত ধরে কর্মসংস্থান আসবে, এমন বিশ্বাসে থিতু থাকা মুশকিল।

প্রতিটি বাজেটেই অর্থমন্ত্রী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে স্বনিযুক্তির ঘাড়ে কর্মসংস্থানের বন্দুকটি চাপিয়ে দেন। শ্রম সমীক্ষার পাতা ওল্টালে দেখা যাবে যে, সত্যিই ভারতের সিংহভাগ মানুষ ‘স্বনিযুক্ত’। তাঁদের একটা বড় অংশ পারিবারিক ক্ষেত্রে বিনা বেতনে স্বনিযুক্ত— অর্থাৎ, সরকারি খাতা-কলমে তাঁরা কর্মসংস্থানের হিসাব বাড়ান বটে, কিন্তু সেই ‘কর্মসংস্থান’ থেকে তাঁদের কোনও আর্থিক লাভ হয় না। কিন্তু, এই আলোচনায় তাঁদের কথা বাদ থাক। যাঁরা সত্যিই বেতনসমেত চাকরি করেন, অথবা অতি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন, তাঁদের অবস্থা কেমন, বাজেট-বক্তৃতায় সে কথা থাকে না। অসংগঠিত ক্ষেত্রে চাকরিতে কোনও রকম সামাজিক সুরক্ষা নেই, সে কথা আর আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। ‌সেই বিপুলায়তন অসংগঠিত ক্ষেত্রে গড় বেতন কেমন, সে বেতন কী হারে বাড়ে, বেতন বৃদ্ধির হার কখনও মূল্যস্ফীতির হারকে টপকাতে পারে কি না, এই সব প্রশ্নের উত্তর অর্থমন্ত্রী কখনও দেন না। কর্মসংস্থানের হিসাব বলতে সরকার ইপিএফও-তে অন্তর্ভুক্তির কথা বলে; কেমন ভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্র ক্রমে সংগঠিত হয়ে উঠতে পারে, সেই দূরতর ভবিষ্যতের কথাও বলে। কিন্তু, সংগঠিত ক্ষেত্রের মধ্যে কী ভাবে তৈরি হয়ে উঠছে অসংগঠিত ক্ষেত্রের বৃহদায়তন দ্বীপ, সে কথা বলে না। গিগ অর্থনীতি ভারতে প্রবল হারে বাড়ছে— সঙ্গে বাড়ছে সে ক্ষেত্রে কাজের চাপ, অনিশ্চয়তাও। বাজেট সচরাচর এই শ্রমিকদের কথা ভাবে না। এ বছরও ভাবেনি।

এ বারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী পর্যটন ক্ষেত্রে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। শ্রমনিবিড় বস্ত্রশিল্পের কথাও তাঁর বক্তৃতায় এসেছে। দু’ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান হতে পারে। তাঁর এ বছরের বক্তৃতায় বার দুয়েক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রসঙ্গও এল। সমাজমাধ্যম-শাসিত অর্থব্যবস্থায় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দু’পয়সার মুখ দেখছেন, সে কথা অস্বীকার করা যায় না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ডেকে পুরস্কার দিচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে ছবি-টবি তুলছেন— কাজেই, অর্থমন্ত্রীও তাঁদের কথা ভেবেছেন। তবে, আশা করা যায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে ওঠাকে তাঁরা কর্মসংস্থানের পথ ভাবছেন না।

গত পাঁচ বছরের বাজেট খুব খুঁটিয়ে দেখলেও একটা প্রসঙ্গ খুঁজে পাওয়া মুশকিল— তার নাম, অভ্যন্তরীণ চাহিদা। অর্থমন্ত্রী চাহিদার কথা বলেন না, কারণ তাঁদের বিশ্বাস, যথেষ্ট পরিকাঠামো তৈরি হলে, শিল্পমহলকে যথেষ্ট আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিলে বিনিয়োগ আপনিই আসবে। আর, হয়তো এটাও বিশ্বাস যে, বিনিয়োগ এলে, উৎপাদন হলে, বাজারে জোগান বাড়লে চাহিদাও তৈরি হবে নিজে থেকেই। গত একশো বছরে অর্থশাস্ত্র অবশ্য অন্য কথা শিখেছে— জোগান নিজের চাহিদা তৈরি করে নেয় না; চাহিদা তৈরি হয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থেকে। এবং, বেশির ভাগ মানুষেরই যে-হেতু উপার্জনের একমাত্র পথ শ্রমের বাজার, ফলে ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হয় চাকরি থাকলে, যথেষ্ট মাইনে থাকলে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট এই কথাটি স্বীকার করতে নারাজ, কিন্তু বাস্তব তো আর তাঁর বাজেটের অর্থনৈতিক দর্শন অনুসারে চলে না— ফলে, ভারতে অভ্যন্তরীণ চাহিদার জোয়ার তৈরি হয়নি। তারই ফল, এমএসএমই-গুলি যেমন যথেষ্ট লাভজনক হতে পারে না, ফলে সেখানে যথেষ্ট কর্মসংস্থান হয় না, তেমনই কর্পোরেট ক্ষেত্রও ব্যবসা বাড়াতে তেমন আগ্রহী নয়। ভারতের শ্রম বাজারের পরিসংখ্যানই হোক বা চাহিদার পরিসংখ্যান, সবই সাক্ষ্য দিচ্ছে এই বাস্তবের। এমনকি, নতুন চাকরির ক্ষেত্রে মাইনের বোঝার একটা বড় অংশ সরকার বহন করলেও যে বাজারে পণ্যের চাহিদা না-থাকলে শেষ অবধি কর্মসংস্থান বাড়ে না, প্রমাণ হয়ে গিয়েছে সে কথাও। কিন্তু, অর্থমন্ত্রী সম্ভবত অতীত খুঁড়ে বেদনা জাগানোর পক্ষপাতী নন। অতএব, নতুন বাজেট, নতুন আশাবাদ— পরের বছর দেখা যাবে, অন্য কোন কথা বলা যায়।

এমন নয় যে, অর্থমন্ত্রী যে দর্শন মেনে চলছেন, তা তাঁর নিজস্ব অর্জন। উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই উৎপাদন বাড়বে, অর্থব্যবস্থা গতিশীল হবে, এবং দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির সুফল আমজনতার ঘরে ছপ্পড় ফুঁড়ে ঢুকে পড়বে, এমন আর্থিক দর্শনে দুনিয়া ঢের চলেছে, এবং ঢের বিপাকেও পড়েছে। কিন্তু, যে বাজেটের শুরুতে যুবশক্তির কথা, আর সর্বত্র অমৃতকালের মহাবাণী, সেই বাজেটই কর্মসংস্থানের প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টাটুকুও করল না। এর মধ্যে যে প্রবঞ্চনা আছে, তা গোপন করা মুশকিল।

আরও পড়ুন