Pramatha Nath Bishi

অবক্ষয়কে ব্যঙ্গ করার সাহস

‘বাঙালীর মত নাচতে আর কেউ পারে না’, উচ্চারণে বাঙালির ক্রম-অবক্ষয়কে ব্যঙ্গবিদ্ধ করার সাহস যিনি তাঁর নাটকে আজীবন দেখিয়েছেন, তিনি প্রমথনাথ বিশী

ঋতম্‌ মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৪

রাষ্ট্রভাষা আয়ত্ত করতে পারলেই— ‘বাঙালী আবার ভারত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’।” এ-সংলাপ এক বাঙালি রাজনীতিকের; ১৯৪৬-এ প্রকাশিত প্রহসন পরিহাস বিজল্পিতম্‌-এর চরিত্র তিনি। পড়ে চমকে উঠেছিলাম, মাস দুই আগে এক অনলাইন ক্লাসে জনৈক হিন্দিভাষী শিক্ষকের সঙ্গে ‘রাষ্ট্রভাষা’র অপব্যাখ্যা নিয়ে মতান্তরের কথা মনে পড়েছিল। অথচ স্বাধীন ভারতের সংবিধানে ‘জাতীয় ভাষা’র কথাই নেই, ৩৪৩ অনুচ্ছেদে রয়েছে সরকারি কাজের দু’টি ভাষার উল্লেখ— হিন্দি ও ইংরেজি, আর অষ্টম তফসিলের ২২টি ভাষা। তবু ‘রাষ্ট্রভাষা’ বিতর্ক আমাদের পিছু ছাড়ে না!

নাটকে দেখি, নাট্যদলের আকস্মিক অনুপস্থিতিতে নায়িকা মিনির প্রণয়ী উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সম্পাদক, অধ্যাপক, রাজনীতিক, ডাক্তার, ফিল্ম-ডিরেক্টর, সাহিত্যিক আর আধুনিক নারীকে মঞ্চে বসিয়ে কথোপকথনের মাধ্যমে জমিয়ে তোলেন ‘মোটেই নাটক নয়’। নাট্যকার ঠাট্টা করেন যে-দেশে বহু ধর্ম বহু ভাষা, সে-দেশে হিন্দি বা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার নিরর্থক চেষ্টাকে। পাই ‘সরস্বতীর দিনমজুর’ এক সম্পাদককে, যাঁর সুবিধাবাদী নীতি: ‘আমরা কোন বিশেষ দলের নই, আবার সব দলেরই।’

‘বাঙালীর মত নাচতে আর কেউ পারে না’, উচ্চারণে বাঙালির ক্রম-অবক্ষয়কে ব্যঙ্গবিদ্ধ করার সাহস যিনি তাঁর নাটকে আজীবন দেখিয়েছেন, তিনি প্রমথনাথ বিশী (ছবি)। সাহিত্যিক, সমালোচক, রবীন্দ্র-অধ্যাপক প্রমথনাথ কিছু দিন আনন্দবাজার পত্রিকা-র সহকারী সম্পাদক পদেও কর্মরত ছিলেন; হয়েছিলেন টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি, রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য। পেয়েছেন রবীন্দ্র-শরৎ-বিদ্যাসাগর-জগত্তারিণী’সহ নানা পুরস্কার।

“জীবন-চৈতন্যবাদের আদর্শ-মানব ছিল ‘রামচন্দ্র’, সমাজ-চৈতন্যবাদের হাতে পড়িয়া সে ‘আরামচন্দ্রে’ পরিণত হইয়াছে।” রবীন্দ্রস্নেহধন্য, গান্ধী-অনুরাগী প্রমথনাথ সাহিত্যে চেয়েছিলেন জীবন-চৈতন্যকে। কিন্তু এ-যুগের সাহিত্য কেন নিছক ‘রাজনীতির বাহন’ হবে আর কেনই বা সাহিত্যিকেরা হবেন রাজনীতিকের ‘বিনাবেতনের কেরানী’, প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘জার্নালিজম ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে। দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে লেখকের প্রতিভার যোগ না হলে কেবল ‘বিদেশের ধার করা তত্ত্বের দ্বারা’ মহৎ সাহিত্যসৃষ্টি অসম্ভব, ভাবতেন তিনি। এ-কারণেই মাইকেল মধুসূদনের বিদেশি মডেলে লেখা দেশীয় কাব্যের শিল্পগুণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও অধিকতর মান্যতা দেন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে, বলেন: “দেশের ঐতিহ্যকে তাঁহারা আয়ত্ত করিতে পারিয়াছেন বলিয়াই বিদেশী ঐতিহ্য তাঁহাদের রচনায় এমন ফলপ্রসূ হইয়াছে।” নিজের সাহিত্যেও সেই ঐতিহ্য ও সমকালের দ্বিরালাপ রচনা করেছেন— উপন্যাসে, ছোটগল্পে।

ব্রিটিশ আমলেই লিখেছিলেন মৌচাকে ঢিল-এর মতো রাজনৈতিক তর্কনাট্য। সেখানে এক দিকে প্রাচীন গৌড়ের মাৎস্যন্যায়ের প্রেক্ষিতে গোপালদেবের সিংহাসনলাভ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সুবিধাভোগীদের ক্ষোভ, অন্য দিকে আধুনিক গৌড়ীয় পুরাতত্ত্ব সমিতিকে কেন্দ্র করে বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বাচন-কারচুপি। মাৎস্যন্যায়ের ত্রাস গোপালদেবের মূর্তির সজীব হয়ে ওঠা এ-যুগের মানুষ চায়নি, তাই অযোগ্য লোকেরাই সংসারে জয়ী হয়ে জাতির দুর্দশা বাড়ায়— রয়েছে চিকিৎসা-ব্যবসায়ীদের প্রতি কটাক্ষ। আবার জাতীয় উন্মাদাশ্রম আর একটি রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ভাবী ঐতিহাসিক কমেডি, যেখানে পাই একুশ শতকের কাল্পনিক মন্ত্রিসভা আর একাধিক মানসিক বিশ্রামাগারের সুযোগান্বেষী ছবি। যদিও বেকার সমস্যা মেটাতেই গড়ে তোলা হয়েছে আশ্রম। আছেন বাক্‌পটু মন্ত্রিবৃন্দ, যুযুধান সংবাদমাধ্যম, কৌশলী মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের সব সমস্যার সমাধান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিষ্ক্রিয়তার ক্রিয়া: “পরবর্তী সমস্যা এসে আগের সমস্যাকে চাপা দিয়ে মেরে দিয়েছে।” মহিলা পুলিশ কমিশনার অপদার্থতম বলেই ক্রমিক প্রমোশনের ধাক্কায় উচ্চপদাসীনা এবং পরের লক্ষ্য মন্ত্রিসভা: ‘ওতে নাকি পদার্থ-অপদার্থ বিচারবোধ নেই।’ এমনকি অধ্যাপক হিসেবে প্রনাবির ব্যর্থতাকেও ঠাট্টা করেন তিনি। আসলে যুদ্ধ-দুর্নীতি-বেকারসমস্যা রোধ কিংবা রাজনীতি থেকে শিক্ষা বিস্তার— এ-সব ‘অসম্ভবের চেষ্টাতেই পাগল ধরা পড়ে।’ গোগোল-প্রাণিত নাটক গভর্মেন্ট-ইন্সপেক্টর-এও এমনই ঘুণ-ধরা সমাজের ছবি। তাঁর নাট্যচরিত্রদের কাছে জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম্’ও তাই অচল! এ-সব কমেডি/প্রহসন মিলনান্ত হলেও সরস বিদ্রুপের অন্তরালে বাঙালির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতি ক্ষোভ ও আশঙ্কা ব্যক্ত হয়েছে।

“এসব শিরঃপীড়া কেহ দীর্ঘকাল বহন করিবে না,” আধুনিক কবিতা নিয়ে এমন ভাবতেন তিনি। পুরাতনের মধ্যে নতুনের আবিষ্কারেই তিনি ‘প্রতিভার দৃষ্টি’ খুঁজে পান, কাব্যের নতুন বিষয় বা দুরূহ শব্দ তাঁকে ভরসা জোগাতে পারেনি। যদিও নাটকে মধুসূদন, কালিদাস রায়, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসুর কথা এনেছেন; কিন্তু তাঁর ভূতের গল্প-এ রাম-দার বাংলা কবিতাপ্রীতির উদাহরণ হিসেবে যে কবিতা পড়ি, তা ত্রিশের আধুনিক কবিদের ব্যঙ্গ করে লেখা (‘তপস্যার নৈরাজ্য বিলাসে’, ‘লেনিন লণ্ঠন জ্বালো’, ‘ক্রতুকৃতমের শেষ আকাশের চাঁদ’)। ঘোষেদের ভূতের বাড়িতে বসে সারা রাত এ-সব কবিতাপাঠের ফলে ব্রহ্মদৈত্য বাড়ি ছেড়ে পালায়, আধুনিক কবিতাপাঠই হয়ে ওঠে ভূত-বিতাড়ন মন্ত্র! সমাজতন্ত্র ও আধুনিক কবিতা নিয়ে তাঁর অভিমত একমাত্রিক হলেও এই শ্লেষ-মাখা কৌতুক নন্দিত করে। বাঙালি জাতিকে শিক্ষিত করার জন্য বার্নার্ড শ’র চাবুক হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রমথ চৌধুরী; সম্প্রতি ১২৫ পূর্ণ করা ‘প্রনাবি’র হাতে ছিল সেই চাবুকেরই সার্থক উত্তরাধিকার।

বাংলা বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন