যুগান্ত: ইয়র্কটাউনের যুদ্ধে নতুন আমেরিকার ‘বিপ্লবী’ বাহিনীর কাছে ব্রিটিশ ফৌজের সেনাপতি কর্নওয়ালিসের পরাজয় স্বীকার, ১৭৮১ সাল।
আমরা এই সত্যগুলি স্বতঃসিদ্ধ বলে মানি,” উত্তর আমেরিকার তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই, “যে সমস্ত মানুষ সৃষ্টি হয় সমান, তাদের সৃষ্টিকর্তা তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দেন, এবং তার মধ্যে থাকে জীবন, মুক্তি, এবং আনন্দ অন্বেষণ করার অধিকার।” উপনিবেশের প্রতিনিধিরা প্রথমে এই ঘোষণাপত্র লিখতে বলেন তাঁদের প্রাজ্ঞ সহকর্মী, দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে। সত্তরোর্ধ্ব ফ্র্যাঙ্কলিন ঠিক করলেন নতুন ভবিষ্যৎ আঁকার অধিকার তরুণ প্রজন্মেরই পাওয়া উচিত, ভার গেল তেত্রিশ বছরের টমাস জেফারসনের হাতে। সে যুগের ফরাসি মুক্তিচিন্তায় উদ্বুদ্ধ জেফারসনই মূল খসড়া তৈরি করেন, এবং তার কিছু রদবদল করে প্রতিনিধিরা ফিলাডেলফিয়ায় স্বাধীন, ঐক্যবদ্ধ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করার ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার পর এই উপনিবেশগুলি জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে পাঁচ বছর যুদ্ধ করার পর ব্রিটিশ শাসন শেষ করে স্বাধীন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই ঘোষণার আড়াইশো বছর পূর্ণ হল গত কাল।
ওয়াশিংটনে আমেরিকার জাতীয় মহাফেজখানায় মন্দিরের গর্ভগৃহের মতো একটি আধো-অন্ধকার ঘরে হাতে লেখা ঘোষণাপত্রটি, সমস্ত প্রতিনিধির সই সমেত, সাজিয়ে রাখা আছে। এ বছর সেই নথি দেখায় উৎসবের পরিবেশ, যারা দেখতে আসছে তারা অনেকেই পরে আছে ট্রাম্প-টুপি বা নানা ট্রাম্প-বাণী-সঙ্কলিত টি-শার্ট। আমেরিকার আড়াইশো বছর উদ্যাপনের দায়িত্ব ট্রাম্প একাই নিয়েছেন, কনসার্ট-মঞ্চ থেকে পাসপোর্ট পর্যন্ত নিজের মুখ দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছেন: ১৭৭৬ সালের গৌরব পুনরুদ্ধার করাই তাঁর রাজনীতির মূল সুর, শ্বেতাঙ্গ আমেরিকাকে আবার শ্রেষ্ঠ আসন তিনি দিয়েই ছাড়বেন। তাঁর কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশিত।
বরং যা আশ্চর্য করে, তা আমেরিকার এই ঐতিহাসিক জন্মদিন নিয়ে শিক্ষিত, যুবক আমেরিকানদের অনাগ্রহ, কিছুটা বিরাগ পর্যন্ত। তাঁদের চোখে আমেরিকার ইতিহাস শোষণের ইতিহাস, দাসত্বের ইতিহাস, ১৭৭৬-এর আজ়াদিও ঝুটা ছিল, কারণ কৃষ্ণাঙ্গরা ক্রীতদাস হয়েই রয়ে যায়। ওয়াশিংটন এবং জেফারসন, তাঁদের চোখে, শেষ পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ সমাজের প্রতিনিধি, যাঁরা নিজেরাও ক্রীতদাস রাখতেন, আর যাঁদের নিয়ে মাতামাতি করা ট্রাম্পের গাঁইয়া শ্বেতাঙ্গ সমর্থকদেরই সাজে। উদ্যাপনের ভার তাঁরাও তাই পুরোপুরি ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁর সমর্থকেরাই ভিড় করে সেই হাতে লেখা, প্রায় মুছে যাওয়া ঘোষণাপত্রটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখে আসছেন। ১৭৭৬ সালে আদৌ কোনও বিপ্লব হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেই বিপ্লবের উত্তরাধিকারী কে, এটাই আজ মূল প্রশ্ন।
আজকে যে হস্তাক্ষর-খচিত ঘোষণাপত্রটিকে আদি দলিল হিসেবে মেনে পূজা করা হয়, সেটি মূলত সাজানোর জন্যে পরে লেখা, শুরু হয়েছিল অগস্ট ১৭৭৬ থেকে, সকলের সই পেতে পেতে বছর গড়িয়ে গিয়েছিল। অন্য দিকে, ৪ জুলাই রাতেই ফিলাডেলফিয়ার মুদ্রাকর জন ডানলাপ ঘোষণাপত্রটি ছেপে ফেলেন, এবং আমেরিকার পূর্ব উপকূলের প্রত্যেকটি শহরে— বস্টন, সালেম, প্রভিডেন্স, নিউ ইয়র্ক থেকে চার্লস্টন সর্বত্র ছাপাখানারা রাতারাতি এটি ছেপে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। এই ‘ডানলাপ ব্রডসাইড’ই— ব্রডসাইড অর্থে একটা বড় পাতার এক দিকে ছাপা— এই ঘোষণাপত্রের প্রথম রূপ, এবং ছোট ছোট ছাপাখানার অজস্র কপির দৌলতেই আমেরিকান সমাজের সর্বস্তরে তার কথাগুলি ছড়িয়ে যায়। এ দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে থাকা এই অজস্র ছাপা ঘোষণাপত্রগুলির দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হতে হয়, ১৭৭৬-এর মুক্তির আন্দোলন যে আমেরিকার সমাজে কতটা গভীর আলোড়ন তুলেছিল, বোঝা যায়। সর্বস্তরের মানুষ ১৭৭৬-এর মুক্তির বাণী অন্তর থেকে গ্রহণ করেছিলেন, এবং, রাজদ্রোহে মৃত্যুদণ্ডের ভয় অতিক্রম করে, দেশ জুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ বড় কম কথা নয়।
সেই মুক্তি কার বা কতটা, সেই নিয়ে বিতর্ক ১৭৭৬ সালেও ছিল, আজও আছে। স্বাধীনতা ঘোষণা যাঁরা করেছিলেন, এবং যাঁরা পরে সংবিধান লিখেছিলেন, তাঁদেরও এই নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। বিপ্লবের কান্ডারিদের বাসস্থান দেখলে তাঁদের চিন্তার এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়: ভার্জিনিয়ায় জর্জ ওয়াশিংটনের মাউন্ট ভার্নন বা টমাস জেফারসনের মন্টিচেলো কোনও প্রাসাদ বা অট্টালিকা নয়: সেগুলি গড়পড়তা বাড়ির মতোই, জেফারসনের ক্ষেত্রে অসংখ্য বই এবং যন্ত্রপাতিতে ভর্তি। যাতে কোনও ভাবেই নিজেদের রাজা-মহারাজা মনে না হয়, সে দিকে যথেষ্ট নজর দিয়েছিলেন, জেফারসন তো বিপুল দেনা মাথায় নিয়ে মারা যান। তবে তাঁরা যে শ্রেণিগত ভাবে বুর্জোয়া, সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁদের সাধারণ বাড়িগুলি ঘিরেই আছে বিপুল চাষজমি, যেখানে খাটত ডজন ডজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। আমেরিকার দক্ষিণ রাজ্যগুলিতে যে সমস্ত কুখ্যাত বাগানবাড়িতে দাসপ্রথা চলত, একঝলক দেখলে ওয়াশিংটন-জেফারসনের বাড়ি তার সমগোত্রীয়, ভার্জিনিয়া প্রদেশ থেকেই আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চল শুরু হয়। এ বিষয়ে জেফারসনের দোষ সবচেয়ে বেশি, ক্রীতদাস মহিলার সঙ্গে অবৈধ সন্তানের জেরে জীবদ্দশাতেই তাঁর দুর্নাম হয়। এক দিকে যাঁরা সৃষ্টিকর্তার দেওয়া মুক্তি এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অধিকারের কথা বলছেন, তাঁরা অন্য দিকে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস রাখছেন, এবং দাসপ্রথা চালিয়ে যাওয়ার নিদান দিচ্ছেন, এই দু’মুখো আচরণ অনেকেই ক্ষমা করেননি।
তবে তখন দক্ষিণের ক্রীতদাস-রাখা শাঁসালো জমিদার-শ্রেণির সমর্থন না পেলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যেত না, এবং স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দাসপ্রথার বিলোপ ঘোষণা করলে এই শ্রেণি বেঁকে বসত। ওয়াশিংটন, জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন বা জন অ্যাডামস আদতে এই শ্রেণিরই প্রতিনিধি, যদিও আঠারো শতকের মুক্তির বাণীর শিক্ষা তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ওয়াশিংটন আশা করেছিলেন দাসপ্রথা এমনিতেই উঠে যাবে, নিজের ক্রীতদাসদের মুক্তিও দেন। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে সমস্ত পক্ষকে একত্র করাই তাঁদের প্রধান কাজ ছিল, এবং যুদ্ধে দক্ষিণের জমিদাররা কিছু কম লড়াই করেননি। তাঁরা যথেষ্ট ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে মারাও যান, তাঁদের বহু ক্রীতদাস পালিয়ে ব্রিটিশ ফৌজে যোগ দেন। ঠিক এই যুক্তি দেখিয়েই তাঁরা স্বাধীন আমেরিকায় প্রচণ্ড ক্ষমতা জাহির করেন এবং দাসপ্রথা রেখে দেন।
এই নিয়ে টানাপড়েন চলে আরও আশি বছর। আমেরিকার বিপ্লবের মূল উপজীব্য ক্ষমতার এক নয়, একাধিক ভরকেন্দ্র তৈরি করা। বিপ্লবের যুগ থেকেই উত্তর এবং দক্ষিণের রাজ্যগুলির পার্থক্য ছিল: উত্তরে আস্তে আস্তে কল-কারখানা তৈরি হতে থাকে, দাসপ্রথা লোপ পেয়ে শ্রমিকশ্রেণি উঠে আসে। কিন্তু দক্ষিণের অর্থনীতি বড় বড় জমিদারিতে কৃষিকাজ, ক্রীতদাসদের বিনামূল্যের শ্রমে সেখানে চলত তুলোর চাষ। ১৮৬০ সালে এই দুই রকম অর্থনীতির রেষারেষি এসে পড়ে সেই দাসপ্রথার পুরনো প্রশ্নে। দাসপ্রথার প্রসারকে কেন্দ্র করে এ বার হয় গৃহযুদ্ধ, যাতে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ পরাজিত হয়, এবং যুদ্ধশেষে আব্রাহাম লিঙ্কন সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্তি দেন। ১৭৭৬ সালের ঘোষণার এই একটি প্রতিশ্রুতি ১৮৬৫ সালে রাখা হয়।
আমেরিকান বিপ্লবের পরিণাম কেবল উত্তর অতলান্তিক সাগরে আটকে থাকেনি। একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ১৭৮১ সালে ইয়র্কটাউনে একটি রোমাঞ্চকর যুদ্ধে মূল ব্রিটিশ ফৌজকে ওয়াশিংটন পর্যুদস্ত করেন, যাতে আমেরিকার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। সে দিন পরাজিত ব্রিটিশ ফৌজের সেনাপতি ছিলেন কর্নওয়ালিস— আমাদের চেনা কর্নওয়ালিস, যিনি আমেরিকায় হেরে কলকাতায় গভর্নর জেনারেল হয়ে এসে বাংলায় জমিদারি প্রথা চালু করেন। আমেরিকার তেরোটি উপনিবেশ হাতছাড়া হয়ে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারে মন দেয় ভারতবর্ষে। গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকার দক্ষিণ থেকে তুলোর জোগান আটকে যায় বলেই বম্বেতে তুলো চাষ শুরু হয়। তার পর থেকে আমেরিকার মুক্তি আন্দোলন মুগ্ধ করেছে আমাদের একের পর এক দেশনায়ককে, লালা লাজপত রাই এবং গদর পার্টির বিপ্লবীকুল থেকে আম্বেডকর পর্যন্ত, ১৯৪৬ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস লেখে যে ভারতীয়রা নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে ‘ভারতের জর্জ ওয়াশিংটন’ হিসেবে দেখছে।
বিপ্লবের উত্তরাধিকার বিচার করা সহজ নয়, এক জনের মুক্তি প্রায়ই হয় আর এক জনের দাসত্ব। বহু দিন অবধি আমেরিকায় মুক্তির প্রশ্ন বলতে আমরা বুঝতাম কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য জাতির সমানাধিকার; আজ ট্রাম্প যুগে বিদ্রোহ করেছে পুঁজিবাদের অসম চাপে জর্জরিত গরিব শ্বেতাঙ্গরা, তাদের কাছে মুক্তি মানে নতুন করে শ্বেতাঙ্গ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। এই বৈপরীত্যও ১৭৭৬-র অধিকার: সে দিন মুক্তি বলতে ওয়াশিংটনরা বুঝেছিলেন কেবল ইংল্যান্ডের রাজার থেকে মুক্তি, স্বাধীনতার পরের দাসত্বের কথা ভাবেননি। কিন্তু শত ঘাত প্রতিঘাত সত্ত্বেও সেই মুক্তিচিন্তা থেকেই এক দিন দাসপ্রথা লোপ পায়, কৃষ্ণাঙ্গরা সমানাধিকার পান, নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। পূর্বপুরুষদের শত দোষ থাকলেও ন্যায্য উত্তরাধিকার ত্যাগ করা কোনও কাজের কথা নয়; দিনের শেষে তা আমাদেরই ইতিহাস, আমাদেরই সম্পদ, আমাদেরই রয়েছে তাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার অবিচ্ছেদ্য অধিকার।