Chandrima Bhattacharya

‘মুখ্য প্রতিমন্ত্রী’ থেকে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি! চন্দ্রিমার বিদায়ে প্রায় গোটা মন্ত্রিসভাই হাতছাড়া দিদির, আরও জনবিরল কালীঘাট

মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকা এতগুলো দফতরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন চন্দ্রিমা যে, আমলারা কেউ কেউ আড়ালে তাঁকে ‘চিফ মিনিস্টার অফ স্টেট’ বা মুখ্য প্রতিমন্ত্রী বলতেন।

Advertisement
স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৯:০২
From Chief Minister of state to Trinamool State President! With Chandrima departure, Didi has lost almost her entire cabinet, making Kalighat even more deserted

চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।

যা অবশ্যম্ভাবী, সেটাই এত দিনে ঘটল। ছেলে সৌরভ বসু যে দিন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে ভিড়েছিলেন, সে দিনই অবিশ্বাস ঢুকে পড়েছিল দীর্ঘদিনের সম্পর্কে। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর উপস্থিতিতেই পার্টি অফিস হাতছাড়া হওয়া সেই ফাটলকে এতটাই চওড়া করে দেয় যে, শনিবার বারবেলায় দু’জনের দু’টি পথ দু’টি দিকে বেঁকেই গেল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শত্রু শিবিরে চলে গেলেন দলের সদ্যনিযুক্ত রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য! গত দু’মাসে মমতা যাঁকেই সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়েছেন, তিনিই বেঁকে বসেছেন। সেই তালিকায় নবতম সংযোজন চন্দ্রিমা।

Advertisement

শুক্রবার ঋতব্রতের নেতৃত্বে ফিরহাদ হাকিম, গোলাম রব্বানী, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামানেরা যখন বাইপাসের ধারে মেট্রোপলিট্যানের অস্থায়ী তৃণমূল ভবনে ঢুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন, চন্দ্রিমা তখন সেখানে। ঋতব্রতেরা আসার কিছু ক্ষণ পরে তিনি বেরিয়ে যান।

তার পর মমতা-গোষ্ঠীর অন্যদের বের করে দিয়ে, পুরনো ব্যানার সরিয়ে নতুন ব্যানার লাগানো হয়। তাতে লেখা তৃণমূলের চেয়ারম্যান অরূপ রায়। এর পর ফিরহাদরা ভবনে তালা লাগিয়ে দিয়ে চলে যান। ভবনের সামনে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। পরে সেখানে আসেন কুণাল ঘোষ। পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়, চাইলে তালা খুলে ভবনে ঢুকতেই পারেন। কিন্তু তালা ভাঙতে দেওয়া হবে না কোনওমতেই।

চন্দ্রিমা কোনও প্রতিরোধ তৈরি না-করেই ভবন ছেড়ে চলে আসায় প্রবল বিস্মিত হন মমতা। তাঁর মতে, দলের রাজ্য সভাপতিই যদি ঘাঁটি গেড়ে পড়ে থেকে অফিস রক্ষা না-করেন, তো কে করবে! শনিবার সকালে দলের সব পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে চন্দ্রিমা জানান, মমতা ফোনে তাঁকে বলেছেন, ‘‘তুমি ভবনটাই ওদের হাতে তুলে দিলে?’’ আহত চন্দ্রিমার সিদ্ধান্ত, বিশ্বাসটাই যখন ভেঙে গিয়েছে, তখন দায়িত্ব ধরে রেখে আর লাভ কী? এর পরেই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরে চন্দ্রিমার চলে যাওয়া নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। যদিও চন্দ্রিমা নিজে এখনও বলছেন ঋতব্রত শিবিরে তিনি নাম লেখাননি, সবটাই সময়ের হাতে।

তৃণমূল শিবিরের অনেকেই বলছেন, সময়ের সলতে পাকানো শুরু হয়েছে ২২ জুন। যে দিন নিউ টাউনের একটি হোটেলে ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক-কাউন্সিলরদের বৈঠকে হাজির হন চন্দ্রিমা-পুত্র সৌরভ। সে দিন চন্দ্রিমা বলেছিলেন, ছেলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাঁর নিজস্ব। ছেলের গোষ্ঠী-বদল কোনও বড় ব্যাপার নয় বলেও বুঝিয়েছিলেন সতীর্থ নেতাদের। এখনও মমতা-ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতা শনিবার বলেন, “চন্দ্রিমাদি বলেছিলেন, ছেলের সব বন্ধুরা ও দিকে চলে গিয়েছে, তাই ও-ও গিয়েছে।” মমতা-পন্থী তৃণমূলের দক্ষিণ কলকাতা জেলা সভাপতি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, “মান-অভিমান থাকতেই পারে। সে ক্ষেত্রে উনি পদ ছেড়ে বসে যেতে পারতেন। কিন্তু সরাসরি বিরোধী শিবিরে চলে যাওয়াটা কর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। অনেকেই নানা কথা জিজ্ঞেস করছেন। খুব খারাপ লাগছে।”

গত পনেরো বছরে মমতার মন্ত্রিসভায় চন্দ্রিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। বৃহত্তর কলকাতার নেতাদের মধ্যে চন্দ্রিমা ছাড়া ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, ব্রাত্য বসু ও জাভেদ খান এবং জেলার নেতাদের মধ্যে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অরূপ রায় ও সৌমেন মহাপাত্রেরা এই দেড় দশকে অধিকাংশ সময় মন্ত্রী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় এক দফতরে কাটিয়েছেন ফিরহাদ। পুর ও নগরোন্নয়ন গোড়া থেকেই তাঁর হাতে ছিল। ২০১৩-র ডিসেম্বরে মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে শশী পাঁজাও প্রায় গোটা সময়টাই নারী ও শিশুকল্যাণের দায়িত্বে ছিলেন।

এই মন্ত্রীদের মধ্যে ফিরহাদ, দুই অরূপ ও জাভেদ আগেই ঋতব্রত শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। ব্রাত্য, শশী চুপ। বিজেপির দিকে পা বাড়িয়ে আছেন সৌমেন। দিদির হাত ছেড়েছেন জ্যোতিপ্রিয়ও। বাকি ছিলেন শুধু চন্দ্রিমা। দল ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই যিনি দিদির অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ। চন্দ্রিমা এক সময় মহিলা কংগ্রেসের রাজ্য সভানেত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। তার পর দায়িত্ব পান মহিলা তৃণমূলের।

তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে ২০১২ সালে আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে চন্দ্রিমার যাত্রা শুরু। ক্রমে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বাড়তি দায়িত্ব। ২০১৬-র নির্বাচনে উত্তর দমদম কেন্দ্রে সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্যের কাছে হেরে যান চন্দ্রিমা। পরের বছর শুভেন্দু অধিকারীর ভাই দিব্যেন্দুকে কাঁথি দক্ষিণ আসন থেকে সরিয়ে লোকসভায় পাঠিয়ে চন্দ্রিমাকে জিতিয়ে আনেন মমতা। এ দফাতেও চন্দ্রিমা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, সেই সঙ্গে ই-গভর্নেন্স নিয়ে তৈরি নতুন দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী।

শেষের দিকে চন্দ্রিমা মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকা এতগুলো দফতরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন যে, আমলারা কেউ কেউ আড়ালে তাঁকে ‘চিফ মিনিস্টার অফ স্টেট’ বা ‘মুখ্য প্রতিমন্ত্রী’ বলতেন। অর্থ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, পরিবেশ, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, ভূমি ও ভূমি সংস্কার, পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান দফতরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন চন্দ্রিমা। ২০২৫ থেকে আবার রাজ্যের আবাসন পরিকাঠামো উন্নয়ন পর্ষদ ‘হিডকো’র চেয়ারম্যান।

চন্দ্রিমার এহেন উত্থানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজ্য সরকারের এক আমলার মন্তব্য, ‘‘নেত্রী কী চান, সেটা উনি মোটামুটি জানতেন। নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও ছিল। ফলে, ওঁর কাজে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল কম। পাশাপাশি, নিজে কাজ বুঝতেন, খাটতে পারতেন, অন্যকে খাটাতেও পারতেন।” পেশাগত জীবনে ডাকসাইটে উকিল দেবী পালের জুনিয়র ছিলেন চন্দ্রিমা, আসল শিক্ষাটা সেখানেই হয়েছিল।

ক্ষমতা হারানোর পরে প্রতিদিন বিকেলে মমতার বাড়িতে হাতেগোনা যে ক’জন হাজির হতেন, চন্দ্রিমা তাঁদের অন্যতম। শনিবার নিজেই হিসেব দিয়েছেন, গত দু’মাসে গরহাজির ছিলেন মাত্র দু’দিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সুব্রত বক্সী রাজ্য সভাপতির কাজ চালাতে রাজি না-হওয়ার পরে চন্দ্রিমার উপরেই ভরসা করেছিলেন দিদি। অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না-করেই। তা নিয়ে দলে ক্ষোভও ছড়িয়েছিল। ক্রমশ জনবিরল কালীঘাটে চন্দ্রিমার অনুপস্থিতি বড় ধাক্কা।

বিকেলে সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা অবশ্য বিষয়টি লঘু করে দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজ্য সভাপতি হিসেবে চন্দ্রিমার নিয়োগ ছিল সাময়িক, সুব্রত বক্সীর অসুস্থতার কারণে। তা ছাড়া, ছেলে উল্টো শিবিরে নাম লিখিয়েছে বলে তিনি অনেক দিন থেকেই পদত্যাগ করতে চাইছিলেন। “তাঁদের লাগেজ-ব্যাগেজ থাকতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়েই ভাবিত নই। আমার নেতা চাই না। কর্মীরা থাকলেই হল,” মন্তব্য মমতার।

চন্দ্রিমার বিদায়ের পরে বর্তমান পরিস্থিতিতে আর কাউকে রাজ্য সভাপতি নিয়োগ করছেন না মমতা। সুব্রত বক্সী সুস্থ না-হওয়া পর্যন্ত নিজেই সংগঠন দেখবেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় তৃণমূল ভবনের যখন হাতবদল হচ্ছে, তখন অসুস্থ বক্সীকে দেখতে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন মমতা। ছন্নছাড়া সংগঠনের ভার নিতে ‘অনিচ্ছুক’ বক্সীই এখন দিদির একমাত্র ভরসা।

Advertisement
আরও পড়ুন