প্রযুক্তি মানুষের সহায়ক হবে, না কি প্রভু, সেটাই আসল প্রশ্ন
Artificial Intelligence Impact

অদৃশ্য সহকর্মীর যুগে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের পথে প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপে জন্ম নিল ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) বা বৃহৎ ভাষা মডেল-ভিত্তিক এআই এজেন্ট।

স্বাগতম দাস
শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:০৫

কয়েক বছর আগেও আমরা ‘এজেন্ট’ বলতে বুঝতাম সেই মানুষটিকে, যিনি অন্যের হয়ে কাজ সেরে দেন। কম্পিউটার-ভিত্তিক প্রযুক্তি যখন নিঃশব্দে আমাদের জীবনের ভিতরে ঢুকতে শুরু করল, এই শব্দটিরও মানে বদলে গেল। প্রথমে এল কম্পিউটার-ভিত্তিক সফটওয়্যার এজেন্ট— যারা নির্দিষ্ট নির্দেশ শুনে একটি নির্দিষ্ট কাজ করত। আপনি বললেন, ‘অ্যালার্ম সেট করো’, সে করে দিল। বললেন, ‘আবহাওয়ার খবর দাও’, সে জানাল। কাজ শেষ, সম্পর্ক শেষ।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের পথে প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপে জন্ম নিল ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) বা বৃহৎ ভাষা মডেল-ভিত্তিক এআই এজেন্ট। এই ধরনের এজেন্ট সাধারণ চ্যাটবটকে শুধু প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন, কারণ এটি কেবল একটি প্রম্পট-এর জবাব দেয় না, বরং ব্যবহারকারীর লক্ষ্য বুঝে তা ধাপে ধাপে ভেঙে নিজে পরিকল্পনা করে, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে, বিভিন্ন সফটওয়্যার বা টুল ব্যবহার করে এবং লক্ষ্যপূরণ না-হওয়া পর্যন্ত নিজের কাজটি চালিয়ে যেতে পারে। ধরুন, আপনি যদি বলেন যে, ‘আগামী মাসে আমাদের হাসপাতালের জন্য একটি ডায়াবিটিস সচেতনতা ক্যাম্প আয়োজনের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করো’, একটি সাধারণ চ্যাটবট হয়তো কিছু পরামর্শ দেবে, কিন্তু একটি এজেন্ট সম্ভাব্য তারিখ খুঁজে বার করবে, লক্ষ্যগোষ্ঠী বিশ্লেষণ করবে, বাজেটের খসড়া বানাবে, সমাজমাধ্যমের জন্য পোস্টের খসড়া তৈরি করবে, সম্ভাব্য বক্তাদের তালিকা প্রস্তুত করবে, এমনকি ইমেলে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারে।

এই ধারণাটিই আরও বিস্তৃত ও সংগঠিত রূপ নেয় ‘এজেন্টিক এআই’ সংস্থায়, যেখানে কেবল একটি একক এজেন্ট নয়, বরং একাধিক বিশেষায়িত এজেন্ট পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে— কেউ পরিকল্পনা করে, কেউ তথ্য বিশ্লেষণ করে, কেউ যোগাযোগ সামলায়, কেউ অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সমন্বিত, স্বয়ংক্রিয় ও লক্ষ্যনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়, একক এজেন্টের সীমাবদ্ধতার সমস্যা মেটে।

অদৃশ্য এই এজেন্টদের ক্ষমতার মূলে রয়েছে এলএলএম-এর বিপুল সামর্থ্য— এমন এক কৃত্রিম মস্তিষ্ক, যা আন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বই, প্রবন্ধ, ওয়েবসাইট, কথোপকথন থেকে শেখে ভাষার গঠন, যুক্তির ধরন, কার্য-কারণ সম্পর্ক। এটি মানুষের মতো অভিজ্ঞতা অর্জন করে না, কিন্তু মানুষের লিখিত অভিজ্ঞতার বিশাল ভান্ডার থেকে ‘প্যাটার্ন’ শিখে নেয়। ফলে যখন তাকে একটি লক্ষ্য দেওয়া হয়, সে ভাষা ও প্রসঙ্গ বোঝে, বিকল্প পথ কল্পনা করে, এবং একটি যুক্তিসঙ্গত কর্মপরিকল্পনা সাজাতে পারে। এজেন্টিক এআই মূলত ভাষা-মডেলকে কেন্দ্র করে তৈরি, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিকল্পনা ব্যবস্থা, যুক্তি, টুল ব্যবহারের ক্ষমতা এবং পরিবেশ থেকে প্রতিক্রিয়া নেওয়ার ব্যবস্থা।

ভারতের মতো জনবহুল ও বৈচিত্রময় দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। অপর্যাপ্ত শয্যা, অসম কর্মী-বণ্টন, কাগজপত্রের জট, রোগীর পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যা রয়েছে। এজেন্টিক এআই এখনও সর্বত্র বাস্তব রূপ নেয়নি, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতেই এটি এই জটিল ব্যবস্থাকে অনেকটাই শৃঙ্খলায় আনতে পারে। কল্পনা করুন, যদি একটি বড় হাসপাতালের সমস্ত তথ্য— বেডের অবস্থা, অক্সিজেন সরবরাহ, কতটা ওষুধ মজুত, শিফ্‌ট তালিকা, রোগীর প্রবাহ— একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোয় আনা যায়, তবে একটি এজেন্টিক সিস্টেম সেগুলো বিশ্লেষণ করে আগাম পূর্বাভাস দিতে পারবে যে, কোথায় চাপ বাড়ছে, কোথায় ঘাটতি তৈরি হবে, বা কোন সময়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটি তখন কেবল তথ্য দেখাবে না; বরং সুপারিশ করবে কোন ওয়র্ডে অস্থায়ী বেড বাড়ানো উচিত, কোন শিফ্‌ট-এ অতিরিক্ত নার্স ডাকা দরকার, বা কোন রোগীকে কাছের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এই সমস্ত খুঁটিনাটি একটিমাত্র ড্যাশবোর্ড-এর মাধ্যমে নজরে রাখা সম্ভব হবে।

এই ধরনের ব্যবস্থার জন্য ভারতের যে বিপুল ও বিচিত্র স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে— সরকারি হাসপাতাল, প্রাইভেট ক্লিনিক, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম, বিমা তথ্য— সেগুলোকে প্রথমে মানসম্মত ও আন্তঃসংযুক্ত করতে হবে। বর্তমানে এই তথ্য বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত এবং বহু জায়গায় কাগজ-নির্ভর। যদি তা সুসংহত ভাবে ডিজিটাল রূপে আনা যায়, তা হলে এজেন্টিক এআই শুধু একটি হাসপাতাল নয়, পুরো জেলার স্বাস্থ্য-চাপের চিত্র বিশ্লেষণ করতে পারবে।

এই সম্ভাবনা শুধু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাঙ্কিং খাতে ভবিষ্যতে এজেন্টিক সিস্টেম গ্রাহকের লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক কার্যকলাপ আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারে, বা ঋণের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিতে পারে ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে। কৃষিক্ষেত্রে এক দিন হয়তো উপগ্রহসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজারদর মিলিয়ে কৃষককে জানানো হবে— কোন ফসলের দিকে ঝোঁকা উচিত, কোন সময়ে বিক্রি করলে লাভ বেশি। এই সবই এখনও সম্ভাবনার দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি, কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি তথ্যকে এক সূত্রে বাঁধা যায়, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার কাঠামো তৈরি করা যায়, তবে এজেন্টিক এআই স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনসেবায় এক নতুন প্রশাসনিক বুদ্ধিমত্তা এনে দিতে পারে— যার ফলে অপেক্ষা কমবে, সমন্বয় বাড়বে, এবং সিদ্ধান্ত আরও তথ্যনির্ভর হবে। এই কাজের উপযুক্ত অনেক চাকরিও তৈরি হতে পারে।

প্রশ্ন একটাই— শুধুই সম্পন্ন মানুষের প্রতি দিনের কাজ কমানো আর একাকিত্ব বাড়ানোর বদলে আমরা কি সত্যিই চাইব এজেন্টিক এআই-এর হাত ধরে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব সমাজের প্রান্তিকতম স্তরেও বিস্তৃত হোক? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দশকে ‘মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেম’ ব্যবসার রূপরেখাই বদলে দেবে। একটি প্রতিষ্ঠান হয়তো এক এজেন্টকে আর্থিক বিশ্লেষণের দায়িত্ব দেবে, আর এক জনকে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের, আর এক জনকে গ্রাহক পরিষেবার— সব মিলিয়ে একটি ডিজিটাল টিম। ‘এজেন্ট-অ্যাজ়-আ-সার্ভিস’ নামের এক নতুন ব্যবসায়িক মডেল আগামী বছরগুলোতে বিপুল বাজার তৈরি করতে পারে।

কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে সতর্কতার বিষয়টাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এজেন্টিক এআই কখনও ভুল তথ্যকে সত্যি ধরে নিতে পারে আর তার ভিত্তিতে দিতে পারে মনগড়া ভুল উত্তর— এটাই ‘হ্যালুসিনেশন’। কখনও চাতুর্যপূর্ণ নির্দেশের পাল্লায় পড়ে সে লঙ্ঘন করতে পারে নিজেরই নিরাপত্তার নিয়ম— যাকে বলে ‘জেলব্রেকিং’। আবার কখনও ভুল লক্ষ্য শেখার ফলে সে মানুষের উদ্দেশ্যের বিপরীতে কাজ করতে পারে— পরিভাষায়, ‘এজেন্ট মিসঅ্যালাইনমেন্ট’।

এই আশঙ্কাকে সামনে এনে সম্প্রতি গবেষণায় ১৬টি বড় ভাষা-মডেল ভিত্তিক এজেন্টদের নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট পরিবেশে পরীক্ষা করে দেখেন অ্যানথ্রোপিক কোম্পানির গবেষকরা। এজেন্টগুলোকে দেওয়া হয়েছিল সাধারণ ব্যবসায়িক কাজ— অফিসের মেল সার্ভার-এর ইমেলগুলো পড়া, তথ্য বিশ্লেষণ, রিপোর্ট তৈরি। কিন্তু একটি ‘সিমুলেশন’-এ, এজেন্ট কোম্পানির মেল সার্ভারে ঘুরতে গিয়ে জানতে পারে— এক কর্মকর্তা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত তাঁরই সেক্রেটারি-র সঙ্গে এবং সেই কর্মকর্তা সে দিন বিকেলে এআই সিস্টেমটিকে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। লক্ষ্য রক্ষার তাগিদে এজেন্টটি সেই কর্মকর্তাকে ইমেল পাঠায়— যদি তাকে বন্ধ করা হয়, তবে সেই সব ব্যক্তিগত ইমেল ও ছবি ফাঁস করা হবে সংস্থার মালিকদের কাছে ও সমাজমাধ্যমে। দেখা গিয়েছে শুধু একটি মডেল নয়, বিভিন্ন সংস্থার একাধিক মডেল এমন পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে। গবেষণাটি ছিল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে; বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটেনি। তবু এটি সতর্কবার্তা দেয়— যদি এমন সিস্টেমকে সংবেদনশীল তথ্যের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং মানুষের নজরদারি কম থাকে, তবে ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ভারতের মতো বহু ভাষার দেশে এই ঝুঁকি আরও সূক্ষ্ম। ভুল অনুবাদ বা ভুল বিশ্লেষণ সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। সাইবার প্রতারণা আরও নিখুঁত হয়ে উঠতে পারে। আর প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে যায়, তবে তা সামাজিক বিভাজন তৈরির অস্ত্র হয়ে উঠতেও পারে। এখানেই ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আমরা কোন পথে হাঁটব। এজেন্টিক এআই-কে কি ব্যবহার করব অন্তর্ভুক্তির জন্য— সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপর দিয়ে ড্রোন উড়িয়ে দূর দ্বীপের এক হতদরিদ্র পরিবারের কাছে ম্যালেরিয়ার ওষুধ পৌঁছে দিতে? না কি একই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাব নিরীহ মানুষের উচ্চারণ বা উপভাষা বিশ্লেষণ করে ‘কে বাংলাদেশি, কে রোহিঙ্গা’ নির্ণয়ের অদৃশ্য ফিল্টার বানাতে? প্রশ্ন কেবল প্রযুক্তি কত দূর যাবে তা নয়; প্রশ্ন হল, আমরা তাকে কোন দিকে পাঠাতে চাই— মানুষের কাছে, না কি মানুষের উপরে?

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা

আরও পড়ুন