উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসছে ঝর্না। যত বেশি জলের তোড়, ততই তার সৌন্দর্য। ঝর্না এবং জলপ্রপাতের রূপ এক এক জায়গায় এক এক রকম। কোথাও জলপ্রপাত নেমে আসে ধাপে ধাপে, কোথাও আবার জলের ক্ষয়কাজে তৈরি গিরিখাতই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই সব কিছুর মধ্যেই নজর কাড়ে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা জলধারা। আসলে উচ্চতার আকর্ষণই আলাদা।
জলপ্রপাত শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে নায়াগ্রা বা অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাতের মতো গর্জনকারী জলরাশির ছবি। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাতকে চোখেই দেখা যায় না। ভূপৃষ্ঠেও নেই সেই জলপ্রপাত!
বিশ্বাস হচ্ছে না? অবিশ্বাস্য মনে হলেও পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাত লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের গভীরে। লুকিয়ে থাকা সেই জলপ্রপাত এত বিশাল এবং শক্তিশালী যে তার কাছে পৃথিবীর প্রতিটি বিখ্যাত জলপ্রপাতই যেন শিশু!
পৃথিবীর বৃহত্তম সেই জলপ্রপাতে জলরাশি আছড়ে পড়ার কোনও শব্দ নেই, ঝোড়ো বাতাস নেই, পর্যটকদের ভিড় নেই। তবুও সেই ‘অদৃশ্য দৈত্য’ ক্রমাগত প্রবাহিত হচ্ছে। শান্ত ভাবে সমুদ্রের স্রোতকে রূপ দিচ্ছে এবং পৃথিবীর জলবায়ুকে এমন ভাবে প্রভাবিত করছে যা বেশির ভাগ মানুষ কল্পনাও করতে পারেন না।
কোথা আছে বিশ্বের বৃহত্তম সেই জলপ্রপাতটি? পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাতটি ডেনমার্ক প্রণালীতে গভীর জলের নীচে রয়েছে, যা সুমেরু মহাসাগরে গ্রিনল্যান্ডকে আইসল্যান্ড থেকে আলাদা করেছে।
বিশাল সেই জলপ্রপাত ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’ নামে পরিচিত। জলপ্রপাতটির কার্যপ্রণালীও পরিচিত জলপ্রপাতগুলির মতো নয়। সেই জলপ্রপাতে কোনও পাথুরে পৃষ্ঠের উপর জল আছড়ে পড়ে না। জলবিন্দুর কুয়াশাও তৈরি হয় না। বরং সেটি একটি ডুবো জলপ্রপাত। সমুদ্রের গভীরে থাকার কারণে ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’-এ জলের ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার পার্থক্যও অন্য জলপ্রপাতগুলির থেকে বেশ আলাদা।
‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’ কত বড় তা সঠিক ভাবে বলা যায় না। তবে যেখানে স্থলভাগের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত অ্যাঞ্জেলের উচ্চতা প্রায় ৩,২১২ ফুট (৯৮০ মিটার), সেখানে ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’-এর আনুমানিক উচ্চতা প্রায় ১১,৫০০ ফুট (৩৫০০ মিটার)। অর্থাৎ, ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’-এর উচ্চতা ভূপৃষ্ঠের উপর থাকা যে কোনও জলপ্রপাতের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
এত উচ্চতা সত্ত্বেও জলপ্রপাতটি সমুদ্রের জলের শত শত ফুট নীচে সম্পূর্ণ রূপে লুকিয়ে থাকে। ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’-এর উচ্চতা যেমন বিশাল, তেমনই ভয় ধরানো এর আয়তন।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, সমুদ্রের নীচের জলপ্রপাতটি অ্যামাজ়ন নদীর চেয়েও বেশি জল বহন করে। ফলে শুধু উচ্চতা বা আয়তনের দিক থেকে নয়, জলপ্রবাহের দিক থেকেও অন্য সব জলপ্রপাতকে টেক্কা দিয়েছে ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’।
কিন্তু কী ভাবে সমুদ্রের তলায় তৈরি হল ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’? বিশাল সেই জলপ্রপাতের নেপথ্যে লুকিয়ে কোন বিজ্ঞান? নর্ডিক সমুদ্রের থেকে ঘন, ভারী বরফের জল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং হালকা আটলান্টিকের জলের নীচে ডুবে যায়। ফলে সমুদ্রের ওই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী নিম্নগামী ঢেউ তৈরি করে সেটি, যা ঠিক জলপ্রপাতের মতো আচরণ করে।
এই কারণেই সমুদ্রের তলায় জলপ্রপাত থাকার ঘটনাটি প্রায় অবাস্তব বলে মনে হয়। বিশাল আকার এবং শক্তি থাকা সত্ত্বেও, ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’-এর ঠিক উপরেই জাহাজে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও মানুষও ওই জলপ্রপাত দেখতে পান না।
উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়া সমুদ্রের তলার বিশাল জলপ্রপাতটি সম্পূর্ণ রূপে অজানাই থেকে যেত মানুষের কাছ থেকে। ডেনমার্ক প্রণালীতে বিশদ সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয় জলপ্রপাতটি। গবেষকেরা জলের তাপমাত্রা, লবণাক্ত ভাব এবং গতিতে অস্বাভাবিকতা দেখে ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’ আবিষ্কার করেন।
বিশ্বের বৃহত্তম জলপ্রপাতটি ভূমি থেকে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে, তবে আমাদের গ্রহের উপর এর প্রভাব অনস্বীকার্য। পৃথিবীর বৃহত্তম জলপ্রপাত হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু এবং মহাসাগর ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’।
এটি ‘আটলান্টিক মেরিডিয়োনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (এএমওসি)’-এর একটি অংশকে চালনা করতে সাহায্য করে। এএমওসি বিশ্বের সমস্ত সমুদ্রের একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা, যা বিশ্বের এক সাগর থেকে অন্য সাগরে তাপ, লবণ এবং পুষ্টি পরিবহণ করে।
এই সঞ্চালন ব্যবস্থা স্থিতিশীল আবহাওয়ার ধরনে অবদান রাখে। সামুদ্রিক পুষ্টি বিতরণ এবং বিশ্বব্যাপী জলবায়ুকেও প্রভাবিত করে এএমওসি।
জলবায়ু পরিবর্তন বা সুমেরু জলের উষ্ণায়নের কারণে যদি এই প্রবাহ উল্লেখযোগ্য ভাবে পরিবর্তিত হয়, তবে এটি আবহাওয়ার ধরন, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠের স্তরকেও প্রভাবিত করতে পারে।
‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’ জলপ্রপাত হল সমুদ্রের তলায় লুকোনো এক বিস্ময়, যা পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলের নীচের জলপ্রপাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের গ্রহ এখনও অনেক আশ্চর্যজনক গোপন রহস্যে পরিপূর্ণ।
সব ছবি: সংগৃহীত।