এ পার বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলে সিঁদুরে মেঘ দেখছে ও পার বাংলা! কারণ, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের অবিলম্বে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের অর্থাৎ ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার থাকায় সেই ‘ওষুধ’ প্রয়োগে এখন আর নরেন্দ্র মোদী সরকারের সামনে কোনও বাধাই নেই। ফলে আসন্ন বিপদের আঁচ পেয়ে সুর চড়াচ্ছেন ঢাকার ক্ষমতাসীন ‘বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি’র (বিএনপি) নেতা-মন্ত্রীরা।
চলতি বছরের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হতেই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মুখ খোলেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বলেন, ‘‘ও পার বাংলায় ক্ষমতার পালাবদলের জেরে পুশ ইনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেবে ঢাকা।’’ সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যাপারে পাল্টা বিবৃতি দেয় নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়ে দেন, অনুপ্রবেশ এবং ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করবে কেন্দ্র ও রাজ্যের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দাবি, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বাংলাদেশের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, এ বারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম ইস্যু ছিল সীমান্ত পেরিয়ে ও পারের বাসিন্দাদের বেআইনি ভাবে ভারতে চলে আসা, যা নিয়ে প্রচারে ঝড় তোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে পদ্মশিবিরের রাজ্য নেতৃত্ব। ভোটে তার ‘ডিভিডেন্ট’ ঘরে তোলে বিজেপি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করছে তারা।
পশ্চিমবঙ্গের মতো অসমের ভোটেও বড় ইস্যু হয়েছে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ। সেখানেও তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরেছেন বিজেপির হিমন্ত বিশ্বশর্মা। বেআইনি ভাবে ঢুকে পড়া বিদেশিদের তাড়াতে ‘পুশ ব্যাক’-এর চেয়েও কড়া পদক্ষেপের কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বাংলাদেশকে ঘিরে আছে ভারতের তিনটি রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমকে বাদ দিলে তৃতীয় নামটি হল ত্রিপুরা। সেখানেও রয়েছে পদ্মনেতা মানিক সাহার নেতৃত্বাধীন সরকার।
বিশ্লেষকদের দাবি, এ-হেন পরিস্থিতিতে তিনটি রাজ্য থেকেই লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরানো শুরু করতে পারে নয়াদিল্লি। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর সেই ভয়টাই পাচ্ছে ঢাকা। ভারতের পূর্বের প্রতিবেশী দেশটির আর্থিক পরিস্থিতি খুব ভাল নয়। সেখানে অনুপ্রবেশকারীরা ঘরে ফিরলে পরিস্থিতি যে ভয়াবহ হবে, তা ভালই আন্দাজ করতে পারছে তারা। আর তাই এই ইস্যুতে হুঁশিয়ারি দিতে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার সরকারকে।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, স্বাধীনতার সময় থেকেই ভারতে শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ। এর মূল কারণ হল দেশভাগ, যাকে কেন্দ্র করে লাগাতার হিংসার ঘটনা ঘটতে থাকায় পশ্চিমবাংলা, অসম এবং ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন লাখ লাখ ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। তখন অবশ্য বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। ওই এলাকা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সীমান্ত না থাকায় প্রাণভয়ে এ পারে আসতে থাকেন বহু মানুষ।
১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষায় জন্ম হয় ‘বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স’ বা বিএসএফ নামের একটি আধা সামরিক বাহিনীর। কিন্তু তাতেও পূর্ব সীমান্তে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় কেন্দ্র। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে দানা বাঁধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যা বুটের নীচে পিষে দিতে ১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকা-সহ আজকের বাংলাদেশে সেনা নামায় ইসলামাবাদ। শুরু হয় ভয়ঙ্কর এক দমনমূলক অভিযান, নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান। তাঁর নির্দেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে আজকের বাংলাদেশে গণহত্যা চালান লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। ফলে ১৯৪৭ সালের মতো ফের এক বার সীমান্ত পেরিয়ে লাখ লাখ মানুষ প্রাণভয়ে আশ্রয় নেন ভারতের এই তিন রাজ্যে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কেউ কেউ আবার ছড়িয়ে যান দেশের অন্যান্য প্রান্তে। ফলে আরও জটিল হয় পরিস্থিতি।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে এ ভাবে বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরায় ঢুকে পড়ায় আতান্তরে পড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পরিস্থিতির মোকাবিলায় বার বার পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। যদিও তাতে কোনও ফল হয়নি। ফলে বিরক্ত নয়াদিল্লি ধীরে ধীরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ইসলামাবাদের বিমানবাহিনী আক্রমণ চালালে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বেধে যায় সংঘর্ষে। মাত্র ১৩ দিনের ওই লড়াইয়ে এ দেশের বাহিনীর হাতে পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয় ইয়াহিয়ার সেনা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের সামনে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের ৯৩ হাজার সৈনিককে যুদ্ধবন্দি করে এ দেশের ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, লড়াই শেষে ইয়াহিয়ার দেশকে দু’টুকরো করে দেন নয়াদিল্লির তৎকালীন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ’। পূর্ব দিকের অংশটি স্বাধীন বাংলাদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও সংঘর্ষ বন্ধ হওয়ার পর এখানে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ঢাকায় ফেরানোর ব্যবস্থা করেননি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা। ফলে তাঁদের সিংহভাগই রয়ে যান ভারতে।
বাংলাদেশের জন্মের পর বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে বলে আশা করেছিল নয়াদিল্লি। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বেলাগাম হয়ে ওঠে গরু পাচার ও অন্যান্য অপরাধমূলক কাজকর্ম। যুদ্ধ-পরবর্তী বছরগুলিতে কিছু কিছু জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেয় বিএসএফ। তাতে প্রাথমিক ভাবে কিছুটা অনুপ্রবেশ হ্রাস পেলেও পরে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় এর সূচক। এর জেরে ভারতীয় অর্থনীতিতে উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে চাপ। জাতি ও ধর্মীয় জনবিন্যাসে দেখা দেয় বড় বদল।
২০১৪ সালে এই বাংলার বর্ধমান শহরের অদূরে খাগড়াগড়ে ঘাঁটি গাড়ে ‘জামাতুল মুজ়াহিদিন বাংলাদেশ’ বা জেএমবি নামের কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠীর বেশ কয়েক জন। ভারতে নাশকতার উদ্দেশ্যে আইইডি তৈরি করছিল তারা। কিন্তু অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণ হওয়ায় উড়ে যায় ওই বাড়ি। মৃত্যু হয় দুই সন্ত্রাসীর। এই ঘটনার তদন্তে নেমে চোখ কপালে ওঠে নয়াদিল্লির। তখন থেকেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ বন্ধ করার উপর জোর দিয়ে আসছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।
পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর ফের এক বার সেই কথাই বলেছেন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জয়সওয়াল। তাঁর কথায়, ‘‘বেআইনি ভাবে এ দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অবশ্যই ফেরত পাঠানো হবে। এর জন্য ঢাকার সহযোগিতা চাই। ২,৮৬০টির বেশি নাগরিকত্ব যাচাই করার মামলা ও পার বাংলার সরকার ফেলে রেখেছে। তার মধ্যে অনেকগুলি পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনও নিষ্পত্তি হয়নি।’’
এখানেই থেমে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র আরও বলেছেন, ‘‘আমাদের নীতি হল যদি কোনও বিদেশি নাগরিক বেআইনি ভাবে ভারতে থাকেন, তা হলে তাঁকে অতি অবশ্যই দেশে ফেরত পাঠানো হবে। সে ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা অনুসরণ করবে নয়াদিল্লি।’’ সেই কারণেই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজে ঢাকা গতি আনুক, চাইছে কেন্দ্র। তাতে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরানোর কাজ অনেক বেশি সহজ এবং মসৃণ হবে বলে স্পষ্ট করেছেন জয়সওয়াল।
গত কয়েক বছর ধরেই বেআইনি অনুপ্রবেশ ইস্যুতে উত্তাল হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য প্রেসিডেন্ট হন বর্ষীয়ান রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কুর্সিতে বসতেই অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেফতার করে দেশে ফেরত পাঠাতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। তাঁদের একাংশকে হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে ঘরে ফেরায় ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ১.১০ কোটি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের চিহ্নিত করে ডিটেনশন ক্যাম্প নিয়ে যাওয়ার কাজে লিপ্ত আছে আমেরিকার আইস (ইউএস ইমিগ্র্যান্ট অ্যান্ড কাসটম্স এনফোর্সমেন্ট) নামের একটি বিশেষ পুলিশবাহিনী। এদের সাহায্যে গত এক বছর তিন মাসে মোট পাঁচ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীকে দেশছাড়া করতে পেরেছে ওয়াশিংটন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই প্রক্রিয়া চালু থাকলে আগামী পাঁচ বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের খরচ হবে ৩০,০০০ থেকে ৯০,০০০ ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। কারণ, বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কোনও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই নয়াদিল্লির হাতে। ওয়াকিবহাল মহলের অনুমান, ২০১৬ সালে সেটা দু’কোটি ছাড়িয়ে যায়, ১৯৭০ সালে যা ছিল এক কোটির বেশি।
বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে কিছু দিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কিছু দিনের মধ্যেই ওই বাসিন্দারা ফের সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে ভারতে। ফলে পুশ ব্যাকের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। দ্বিতীয় সমস্যা হল, অসমে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য বিশেষ ডিটেনশন ক্যাম্প রয়েছে। ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে নেই।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে নজরদারির জন্য কুমির ও সাপের মতো ‘প্রাকৃতিক বর্ম’ মোতায়েন করার চিন্তাভাবনা করছে ভারত! বিএসএফের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রকে উদ্ধৃত করে তেমনটাই উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদনে।
ওই সূত্র জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে নজরদারির জন্য কুমির এবং সাপের মতো সরীসৃপ ‘মোতায়েনের’ একটি প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। তবে এই নিয়ে সরকারি ভাবে এখনও কিছু জানায়নি নয়াদিল্লি।
ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।