CPM in West Bengal

‘প্রকৃত বিরোধী’ হওয়ার লড়াই

ভারতের মাটিতে বামেদের উত্তরণের পথ মসৃণ ছিল না। পুঁজিবাদের প্রতিরোধ, আবার দলের মধ্যে নীতি ও আদর্শের ভেদে একের পর এক ভাঙন সামলে এগোনো যথেষ্ট কঠিন ছিল।

তূর্য বাইন
শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ০৬:৩৯

১৯৫২-য় প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)-র ১৬টি আসন জয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদালাভের মাধ্যমে স্বাধীন ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রে বামপন্থার জয়যাত্রা শুরু। এ বছর কেরলে পিনারাই বিজয়নের বাম সরকার পতনের মধ্য দিয়ে কি তার অবসান হল? ১৯৭৭-এ পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে কেরল ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে নানা রাজ্যে ক্ষমতায় থাকায় বাম আদর্শ ও নীতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। এমনকি ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনে বাম ফ্রন্ট ৬০টি আসনে জিতে বাইরে থেকে সমর্থনের মাধ্যমে ইউপিএ-১ সরকারের প্রাণভোমরা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।

ভারতের মাটিতে বামেদের উত্তরণের পথ মসৃণ ছিল না। পুঁজিবাদের প্রতিরোধ, আবার দলের মধ্যে নীতি ও আদর্শের ভেদে একের পর এক ভাঙন সামলে এগোনো যথেষ্ট কঠিন ছিল। ১৯৬৪-তে সিপিআই থেকে বেরিয়ে সিপিআই(এম) গঠনে বাম আন্দোলন কিছুটা ধাক্কা খায়। ১৯৬৯-এ ফের সিপিআই(এমএল) দলের প্রতিষ্ঠা এবং তাদের রাজনীতির ফলে জনসাধারণের একাংশে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়, তা অতিক্রম করে ১৯৭৭-এ পশ্চিমবঙ্গে বাম জোটের ক্ষমতা দখল মোটেই সহজ ছিল না। তবে মানতেই হবে, জরুরি অবস্থার সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধে দমন-পীড়ন ও সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার রক্ষায় বামেদের আপসহীন লড়াই, সাম্যের আদর্শ ও জনমুখী ভাবনা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প মনে হয়েছিল বলেই নব ইতিহাসের সূচনা সম্ভব হয়।

সে-সব এখন অতীত। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণরত বামেদের বিদায়ে আগামী দিনে কোনও প্রভাব পড়বে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে পনেরো বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার পর এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে দলের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। বিজেপির মতো সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শে বলীয়ান, সুশৃঙ্খল দলের বিরুদ্ধে এই ছন্নছাড়া তৃণমূল আদৌ যথার্থ বিরোধীর ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না সন্দেহ। এ ক্ষেত্রে বর্তমান শাসকের প্রকৃত বিরোধীর ভূমিকায় কারা উঠে আসতে পারে, সেই ভাবনা অবান্তর নয়। কংগ্রেস দু’টি আসনে জিতলেও তাদের শক্তি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ, বিরোধী হয়ে ওঠার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও সঙ্কল্পবদ্ধ কর্মীও তাদের নেই বলেই মত অনেকের। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হিসেবে বামেদের উত্থান এই মুহূর্তে অনেকের কাছেই কষ্টকল্পনা, কিন্তু তা কি অসম্ভব?

অস্বীকারের উপায় নেই, পশ্চিমবঙ্গে পনেরো বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও যে বামপন্থীরা আজও নিজেদের মত ও পথে অবিচল, সংখ্যায় তাঁরা যত নগণ্যই হোন, তাঁদের দার্ঢ্য উপেক্ষণীয় নয়। জাতীয় রাজনীতিতেও আদর্শগত প্রত্যয়ে অনড় বাম দলগুলির ক্ষমতা প্রাদেশিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সংসদীয় গণতন্ত্রে তাদের অংশগ্রহণ দেশের রাজনীতিকে যে বেশি জনমুখী হতে বাধ্য করেছিল, ঐতিহাসিক ভাবে তা অনস্বীকার্য। শুরুর দিকে মূলত তাদের চাপেই সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটি যুক্ত হয়, প্রণীত হয় ভূমি সংস্কার ও শ্রমিক সুরক্ষার মতো আইন। অগণিত বামপন্থীর আজও বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলা বা আর্থ-সামাজিক ভাবে পশ্চাৎপদ মানুষের পাশে থেকে তাঁদের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের দাবিতে লড়াই করতে হলে ক্ষমতায় থাকা প্রাক্‌-শর্ত নয়। তবে এও মনে রাখা দরকার, ক্ষমতার বাইরে থেকে শাসকের আধিপত্যজাত জনবিরোধী নীতি ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা খুব কঠিন।

মত ও পথ যত মহানই হোক, মানুষের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া কোনও লড়াই সফল হয় না। বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে এ রাজ্যে সংখ্যালঘুরা তৃণমূল কংগ্রেসে যে আস্থা রেখেছিলেন, এ বারের নির্বাচনের আগে থেকেই তাতে চিড় ধরেছিল; প্রকৃত উন্নয়নে শামিল করার পরিবর্তে তাঁদের মুখ্যত ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এই ধারণাও দৃঢ় হচ্ছিল। এই মুহূর্তের ডুবু-ডুবু তৃণমূলী নৌকায় যে তাঁরা পা রাখবেন না তা পরিষ্কার। একই অবস্থান নিতে পারেন এ রাজ্যের তথাকথিত অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত মানুষরাও। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার নতুন সরকার বাহ্যত করছে, তা তাঁদের কাছে গ্রহণীয় হবে না কেনই বা।

বামেদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো রাজ্যবাসীর পরিবর্তিত সত্তা। যাঁদের জন্য লড়াইয়ে তাঁরা দৃঢ়সঙ্কল্প, নানা ভাতা ও অনুদানের টোপে সেই মানুষই যদি তাঁদের থেকে মুখ ফেরান, তবে বামেদের প্রকৃত বিরোধী হয়ে ওঠার লক্ষ্য ব্যর্থ হবে। বিরোধীশূন্য শাসনে চেগে ওঠা পুঁজিবাদ, অসাম্য, ধর্মীয় মেরুকরণে বিপন্ন হবে গণতন্ত্রও।

আরও পড়ুন