—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
এক বধূকে খুনের মামলায় কেস ডায়েরিই উধাও হয়ে গিয়েছে। ১৬ বছর ধরে সে ভাবেই চলেছে বিচার প্রক্রিয়া। কেস ডায়েরি উদ্ধার করতে নিম্ন আদালত একাধিক বার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশকে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্ট উত্তর ২৪ পরগনা জেলা বিচারককে নির্দেশ দিয়েছে, মামলা যখন শুরু হয়েছিল, সে সময়কার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রত্যেক আধিকারিককে ডেকে তদন্ত করে কেস ডায়েরি পুনরায় তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে, হাই কোর্টের নির্দেশ মতো এই মামলায় নিয়োগ করা হয়েছে নতুন সরকারি কৌঁসুলিকে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৯ সালে। বারাসতে পুলিশ আবাসনে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল সোনালি দত্ত নামে এক বধূর। তাঁর স্বামী বারাসত পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। এখনও তিনি বারাসতেই কর্মরত। সোনালি ছিলেন নদিয়ার করিমপুরের বাসিন্দা। তাঁর ভাই গোপীনাথ করের কথায়, ‘‘দিদিকে খুন করা হয়েছিল পণের জন্য। ভগিনীপতি পুলিশে কর্মরত। আশ্চর্যজনক ভাবে আদালত, থানা, আদালতের জি আর বিভাগ— সব জায়গা থেকে মামলার কেস ডায়েরি লোপাট হয়ে গিয়েছে। ১৭ বছর ধরে দিদির খুনের বিচারের জন্য আদালতে ঘুরছি। সরকারি কৌঁসুলি কী ভাবে কেস ডায়েরি ছাড়াই মামলা লড়ছিলেন, সেটাও রহস্য।’’
বারাসতের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে ওই মামলা চলছে ২০০৯ সাল থেকে। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জে নির্দেশ দিয়েছেন, কেস ডায়েরি নতুন করে তৈরি করতে হবে। ওই মামলায় এ পর্যন্ত দু’দফায় সরকারি কৌঁসুলি বদল করা হয়েছে। হাই কোর্টনির্দেশ দিয়েছে, ওই মামলা সংক্রান্ত যে সব কাগজপত্র রয়েছে, সবেরই প্রতিলিপি তৈরি করে কেস ডায়েরি তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। হাই কোর্ট জানাচ্ছে, ২০০৯ সালে তদন্ত শুরু হওয়ার পরে পুলিশ কেস ডায়েরি-সহ চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছিল। ২০১১ সালে চার্জশিটের প্রতিলিপি অভিযুক্তদের দেওয়া হয়।
গোপীনাথ জানান, ২০১৫ সালে তিনি জানতে পারেন, কেস ডায়েরি ছাড়াই সরকারি আইনজীবী মামলা লড়ছেন। বিষয়টি তিনি ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের নজরে আনেন। তার পরেই ওই আদালত প্রথমে উত্তর ২৪ পরগনা এবং পরে বারাসত পুলিশ জেলার সর্বোচ্চ কর্তাদের নির্দেশদেয় যে, যে করেই হোক, কেস ডায়েরি খুঁজে বার করতে হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত কেস ডায়েরি মেলেনি। হাই কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, জেলার পুলিশ সুপারের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে যে, অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কেস ডায়েরির হদিস মেলেনি।
এই মামলায় সদ্য নিযুক্ত হওয়া সরকারি কৌঁসুলি বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানান, এ ভাবে একটি মামলারকেস ডায়েরি তিনটি জায়গা থেকে লোপাট হয়ে যাওয়া সত্যিই রহস্যজনক। তিনি বলেন, ‘‘বারাসতের ক্ষেত্রে কেস ডায়েরি থাকার কথা সিজেএমের জিআর বিভাগে। সেটির প্রতিলিপি থাকার কথা কোর্ট ইনস্পেক্টর ও থানার কাছে। কোথাও কেস ডায়েরির হদিস নেই। হাই কোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে, পরবর্তী শুনানির আগে তিনটি জায়গায় সেই সময়ে কর্মরত আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলা। ১৭ বছর ধরে বিচারের আশায় রয়েছেন এক ভাই।’’
গোপীনাথ জানান, পূর্ববর্তী সরকারি কৌঁসুলি কেস ডায়েরি ছাড়াই বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে সাক্ষী হিসাবে তাঁকে ডেকেছিলেন। সেই ডাকে সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে। উত্তরবঙ্গে শিক্ষকতার চাকরি করেন গোপীনাথ। তিনি বলেন, ‘‘হাসপাতালে দিদির দেহ দেখে গোলমাল ঠেকেছিল। আমি জেদ করে পুলিশে অভিযোগ করেছিলাম। প্রথমে পুলিশ অভিযোগ নিতেই চায়নি। তার পরে আদালতের চাপে পুলিশ মামলা রুজু করে। ভগিনীপতি ও তাঁর দুই আত্মীয় গ্রেফতার হন। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তিও পান। ভগিনীপতি পরে আবার বিয়ে করেন।’’