আর্যভট্ট খানের অনুলিখনে কুমকুম চক্রবর্তীর ‘আমার ভুবন’ (রবিবাসরীয়, ৪-১) পড়ে তাঁর এই লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে প্রথমেই বলতে ইচ্ছে করছে, এমন আলোয় ভরা যাঁর ভুবন তাঁর প্রতিবন্ধকতা বলে কিছু থাকে না। তিনি শিখিয়ে দেন, আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ পর্বত-সাগর অতিক্রম করে মানুষ আলোর ঠিকানা খুঁজে নিতে পারে। আসলে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়োজন শুধু ভিতরের শক্তি।
সমাজে আজও বহু পরিবার কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে, তার উপর সেই মেয়েটির যদি শারীরিক বা মানসিক ভাবে কোনও সমস্যা থাকে, তা হলে তো আর কথাই নেই। আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, পরিবারকে পাশে পেয়েছিলেন বলেই তা কিছুটা হলেও সহজ হয়েছিল। ফলে এই ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পথের বড় কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটেও তিনি ছিনিয়ে নিতে পেরেছেন জয়ের মুকুট।
প্রতিকূলতাকে ভয় না পেয়ে, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই যাঁর জীবনের চ্যালেঞ্জ— তিনি শুধুমাত্র এক জন স্কুলশিক্ষিকা নন, জীবনপাঠেরও শিক্ষিকা। পৃথিবীর আলো না দেখেও অন্তরে যে জ্ঞানের প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছেন, সেই আলোই জগৎ-সংসারের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দীপাবলির আলোকশিখার মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
হেলেন কেলার, কবি জন মিল্টন, গ্রিক কবি হোমার, মিশরের বিশিষ্ট লেখক তাহা হুসেনের মতো তিনিও প্রমাণ করে দিয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে ওঠে। তিনি নিজের বিশেষ ক্ষমতাকে প্রবল শক্তিতে রূপান্তরিত করে দেখিয়েছেন যে কোনও বাধাই কাউকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি সে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে।
তাঁর এই শক্তির প্রেরণা সমাজের বুকে অনুপ্রেরণার আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর লড়াই আমাদের সকলের কাছেই শিক্ষণীয়। সেই সব মানুষ যাঁরা আজও কন্যাসন্তান জন্মালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, কিংবা বিশেষ ভাবে সক্ষম সন্তান নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাঁদের কাছে তাঁর এই জয়যাত্রা তো এক আলোকময় দিশা।
কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি
নিবেদিতপ্রাণ
আর্যভট্ট খানের অনুলিখনে কুমকুম চক্রবর্তীর ‘আমার ভুবন’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়ে কিছু কথা। দশককাল ধরে সবার ভালবাসায় স্নাত হয়ে শিক্ষাদানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও কুমকুমদেবীর মতো শিক্ষাপ্রাণ মানুষকে প্রধান ভূমিকা ও দায়িত্ব অর্পণ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিন্ত থেকেছেন। কারণ তিনি যে সঙ্গীতেও উচ্চডিগ্রিধারিণী। আসলে প্রতিটি বিষয়েই তাঁর নিবেদিত প্রাণ ও মন— এই নিষ্ঠা ও দক্ষতার কারণেই তিনি সবার অমলিন ভালবাসায় সমৃদ্ধ।
যাত্রাপথে যাঁরা প্রতিনিয়ত তাঁর সঙ্গী, তাঁদের প্রতি তিনি অকাতরে ভালবাসা উজাড় করে দেন। চরম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের ভুবনে আঁধারের মধ্যেই রামধনুর সাত রং খুঁজে পান এবং মনের রঙে চার পাশের মানুষকে রাঙিয়ে দিতে সক্ষম হন। আসলে এই ভুবন যে চোখ মেলে দেখা হিংসা, হানাহানি, পরশ্রীকাতরতা, মোহ ও লোভের ভুবন নয়। সে ভুবন কেবল অন্তরের ভালবাসা, উপলব্ধি এবং অহিংসায় ভরপুর— তাই সেখানে সৃষ্টিশীলতা অদম্য ও অনমনীয় মনোবলে কখনও কখনও স্রষ্টাকেও ছাপিয়ে যায়।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
গল্পের দুপুর
নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘মধ্যদিনের রাখাল’ (২১-১২) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নের সুদীর্ঘ সুন্দর অবসর বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথকে উদাস ও আকুল করে তুলত। বিশেষ ভাবে তাঁকে আচ্ছন্ন করে রৌদ্রপীত নিস্তব্ধ মধ্যাহ্ন। ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “আমি এর মোহ থেকে কিছুতেই আপনাকে ছাড়াতে পারিনে। এই আলো, এই বাতাস, এই স্তব্ধতা আমার রোমকূপের মধ্যে প্রবেশ করে আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে— এ আমার প্রতিদিনকার নতুন নেশা, এর ব্যাকুলতা আমি নিঃশেষ করে বলে উঠতে পারিনে।”
রবীন্দ্রনাথের গল্পসৃষ্টির সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িত এই মধ্যাহ্ন, যাকে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘গল্পের দুপুরবেলা’। দিবাসুপ্ত কুঠির বাড়িতে নিঝুম মধ্যাহ্ন যেন তাঁর কাছে মধ্যরাত্রির সমতুল্য। স্তব্ধ দুপুরে দোতলা কুঠির চার পাশের আলো, বাতাস, তরুশাখার কম্পন যেন তাঁর সব গল্পের ভাষা জুগিয়ে দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যে মধ্যাহ্নের স্থান সঙ্কীর্ণ হলেও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে তা নয়। অন্য জমিদারদের মতো তিনি ভোজনের পর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে মধ্যাহ্ন কাটাতেন না। বাংলার অসীম সমতল শস্যক্ষেত্রের মধ্যে জনহীন, শ্রান্ত মধ্যাহ্নের নিস্তব্ধ ভাব তাঁকে বরাবর মুগ্ধ করেছে। তিনি উপভোগ করেছেন মধ্যাহ্নের এক নিবিড় ভাবসৌন্দর্য এবং সেই সময় রচনা করেছেন গল্প, গান, কবিতা। নানা বর্ণের জলজ ফুল, পতঙ্গ, পাখির সঙ্গে কবি রবির ঔৎসুক্যপূর্ণ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। অলস দিনে এরা ছিল তাঁর জন্য বড় সত্য। জোড়াসাঁকোর খরদীপ্ত মধ্যাহ্ন তাঁকে শৈশব থেকেই স্বপ্নাবিষ্ট করত। ফেরিওয়ালার উচ্চসুরের হাঁক, উড়ে যাওয়া চিলের ডাক তাঁর মনকে যেন উড়িয়ে নিয়ে যেত। দুপুরে দাদার কাছে ইতিহাসের গল্প শোনার মজাই ছিল তাঁর কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
আসলে রবীন্দ্রনাথের জীবনে মধ্যাহ্নের অবকাশকাল, মাঠ-ঘাটের নিস্তব্ধতা শুধু নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘশ্বাসের গান হয়ে থাকেনি; তা ছিল ঐশ্বর্যময়, সৌন্দর্যময় সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে আনন্দে আকুল হওয়ারও সময়। মধ্যাহ্ন-প্রেক্ষাপটে রচিত বেশ কিছু গানেও শোনা যায় মাধুরীমঞ্জীরের গুঞ্জরণধ্বনি। মধ্যাহ্নের অবকাশকাল অনেক সময়ই রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
সঙ্গীতসাধক
‘অর্ঘ্য সেনের জীবনাবসান’ (১৫-১) শীর্ষক প্রতিবেদন পড়ে কিছু কথা মনে এল। সে প্রায় চার দশক আগের কথা। তখন আমি থাকতাম নৈহাটিতে। আমরা বেশ কয়েক জন মিলে ‘রবীন্দ্রজন্মোৎসব ১২৫’ পালনের জন্য তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। অনুষ্ঠানের তোড়জোড় ছিল বটে, যদিও সরকারি সাহায্য বা তথাকথিত স্পনসরের টাকায় অনুষ্ঠান আয়োজনের চল তখন ছিল না। চাঁদা তুলে খরচ মেটাতে হত। কাজেই কম বাজেটে ভাল শিল্পীর সন্ধান করতে হত আমাদের। এই কথা মনে রেখেই রবীন্দ্রগানের অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে আমরা হাজির হয়েছিলাম শিল্পী অর্ঘ্য সেনের কাছে। যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেওয়ার সামর্থ্য নেই, এ কথা জানিয়ে আমন্ত্রণের চিঠি তুলে দিতেই তিনি অনন্য দৃষ্টি মেলে বললেন, “মার্জনা করবেন, আমি আপনাদের অনুষ্ঠানে যেতে পারব না। আজকাল অনুষ্ঠানে যাই না, গানের সে পরিবেশ আর নেই।” আমরা সকাতরে জানালাম, রবীন্দ্রগানের যোগ্য পরিবেশেই অনুষ্ঠান পালিত হবে। এই কথায় আশ্বস্ত হয়ে এবং আমাদের পীড়াপীড়িতে তিনি শেষ পর্যন্ত আমন্ত্রণ গ্রহণে সম্মত হলেন। বললেন, “ঠিক আছে, আমি লালগোলা প্যাসেঞ্জারেই যাব। এক জন তবলচি রাখতে পারবেন তো?” আমরা সম্মতি জানিয়ে ফিরে এলাম।
সে দিনের অনুষ্ঠান ছিল নৈহাটি স্টেশন লাগোয়া বিদ্যালয় ‘আদর্শ বিদ্যানিকেতন’-এর প্রাঙ্গণে। রবীন্দ্র-অনুগামীদের সমাগমে শান্ত পরিবেশেই অনুষ্ঠান চলছিল। অর্ঘ্যবাবু যথাসময়ে এলেন, অনুষ্ঠানের মনোরম পরিবেশ দেখে প্রীত হলেন এবং টানা চল্লিশ মিনিট গান গেয়ে খুশিমনেই ট্রেনে ফিরে গেলেন। ট্রেনভাড়া বা কোনও পারিশ্রমিকও নেননি সে দিন!
আমরা কিন্তু তখনই বুঝেছিলাম— নিছক কোনও সঙ্গীতশিল্পী নন, তিনি ছিলেন যথার্থই সঙ্গীতসাধক। এমন শিল্পী আজ বিরল বলেই মনে হয়।
শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪