WB Elections 2026

সম্পাদক সমীপেষু: সমাজের দর্পণ

বাংলার প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ী তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে বার বার দেখিয়েছেন ভোটের সময় রাজনীতির নাটকীয় রূপ। একই ভাবে পিকেএস কুট্টি তাঁর কার্টুনে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রশ্ন এবং প্রতিবাদ।

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৭:৩০

বাংলা কার্টুন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের দর্পণ, বিশেষ করে ভোটের সময়ে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসে, ততই কার্টুনে ফুটে ওঠে রাজনীতির নানা রং, প্রতিশ্রুতির খেলা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

বাংলার প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ী তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে বার বার দেখিয়েছেন ভোটের সময় রাজনীতির নাটকীয় রূপ। একই ভাবে পিকেএস কুট্টি তাঁর কার্টুনে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রশ্ন এবং প্রতিবাদ। কার্টুনিস্ট রেবতীভূষণ ঘোষ, অমল চক্রবর্তী, দেবাশীষ দেব-দের রাজনৈতিক কার্টুনও গভীর ভাবে প্রভাব ফেলে।

ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা, নেতা-নেত্রীদের আকস্মিক জনদরদি হয়ে ওঠা, আর ভোটের পরে সেই প্রতিশ্রুতির হারিয়ে যাওয়া— এই সব দৃশ্য বাংলা কার্টুনে প্রায়ই দেখা যায়। কার্টুনিস্টরা রসিকতার মাধ্যমে এমন বাস্তব তুলে ধরেন, যা অনেক সময় মানুষ সরাসরি বলে উঠতে পারেন না।

এই কার্টুনিস্টরা সংবাদপত্র ও সমাজমাধ্যমে নিয়মিত কার্টুন প্রকাশ করে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের কাজ মানুষকে শুধু হাসায় না, ভাবতেও বাধ্য করে— আমরা কাকে ভোট দিচ্ছি, কেন দিচ্ছি, এবং ভবিষ্যতে এই নির্বাচনের প্রভাব কী হতে পারে।

ভোট মানে কেবল একটি দিন নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কার্টুন সেই সচেতনতার বার্তা সহজ ভাষায় পৌঁছে দেয়। একটি ছোট কার্টুন অনেক সময় বড় বক্তৃতার থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটে কার্টুন একটি শক্তিশালী সামাজিক ভাষা— যেখানে কৌতুকের মধ্যে উঠে আসে সত্য, ব্যঙ্গের মাধ্যমে জাগে সচেতনতা। গণতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এই কার্টুনগুলির ভূমিকা অপরিসীম। তাই, ভোটের সময় কার্টুনের বার্তাও বুঝে নেওয়া জরুরি— কারণ আমাদের ভোটই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

সুশান্ত রায় চৌধুরী, কলকাতা-৭৮

বর্ষবরণ

কিছু দিন আগেই একটি নিরুপদ্রব বাংলা নববর্ষে (১৪৩৩) পা দিলাম। বাংলার যে সমস্ত অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির পুজো, চড়ক, গাজন প্রচলিত আছে, সেখানে একমাত্র বাংলা নববর্ষের আবির্ভাব উল্লেখযোগ্য ভাবে উপলব্ধি করা যায়। বাকি গ্রামবাংলা ‘হালখাতা’র সাবেক ব্যবসায়িক লেনদেনে পয়লা বৈশাখের উপস্থিতি টের পায়। চলতি সময়ে অবশ্য স্মার্টফোনের দৌলতে এই ছবি খানিকটা হলেও বদলেছে। আন্তর্জালের মাধ্যমে নিজেকে পৃথিবীর কাছে উপস্থাপনের প্রতিযোগিতা খড়ের চালের নীচেও প্রবেশ করেছে। ফলে, বাংলা নববর্ষ যাপনও একটু বিস্তৃতি পেয়েছে বইকি, তবে তা কখনওই ইংরেজি নববর্ষকে ছাপিয়ে নয়।

কলকাতা শহর-সহ মুষ্টিমেয় শহরাঞ্চলে বরাবরের মতো এ বারও কয়েকটি সংগঠন, সংস্থার নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথে পথে আলপনা অঙ্কন এবং গণমাধ্যমে কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল রাজ্যের নববর্ষ উৎসবযাপন। উচ্চারিত হল বাংলা ভাষা এবং জাতিকে রাজনৈতিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার বার্তা, প্রচারিত হল সম্প্রীতির কথা। আমাদের শৈশবের বর্ষবরণে কিন্তু এ সব চোখে পড়েনি। তবে, ওই সময় থেকেই যে নববর্ষ আমাদের মৃদু হলেও আলোড়িত করত, তা ছিল ইংরেজি নববর্ষ— পয়লা জানুয়ারি। অন্তত বাজারের ছোট কেক একটা হলেও বাড়িতে আসত। অধিকাংশের বাড়িতে আবার তা-ও আসত না।

দিন দিন বেড়েই চলেছে নানাবিধ উপকরণে ইংরেজি নববর্ষের উন্মাদনা। ২৫ ডিসেম্বর থেকেই কলকাতা শহর এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা শহর, শহরাঞ্চল, গ্রামেগঞ্জে এই বর্ষবরণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। নাচানাচি, হইহুল্লোড়, আনন্দানুষ্ঠানে সম্পন্ন হয় বর্ষবরণ। চলে সেলফিতে মুহূর্ত ধরে রাখার প্রচেষ্টা। এই সময় বাংলার কালীপুজোও হার মানে পটকা বাজির দৌরাত্ম্যে।

আজও বাংলা নববর্ষ আসে যায়। কিন্তু শহর, শহরাঞ্চল ছাড়া বাংলার গ্রামগুলিতে তার পদচারণা ভীষণই কোমল শান্ত। তার মানে এই নয় যে ইংরেজি বর্ষবরণের মতোই হইহুল্লোড়ে, মাইকের তাণ্ডবে, বাজির দৌরাত্ম্যে যাপিত হোক বাংলা নববর্ষ। বরং বাংলা তার নিজের মতো করে নিজেকে ভালবাসুক। তবে যে আপনার, তার কদর আরও একটু বেশি হওয়া উচিত নয় কি?

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-১৫২

সুযোগ কোথায়

আকাশ বিশ্বাসের ‘উচ্চশিক্ষায় কেন এই অনাগ্রহ’ (১৪-৪) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। প্রবন্ধকার তাঁর লেখনীতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশেষত কলেজগুলিতে শিক্ষানীতির গভীর সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। রাজ্যের ঘুণধরা শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘ দিন ধরেই বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। প্রতি বছর বিরাট সংখ্যক ছাত্রছাত্রী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে এলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি পাওয়ার সঠিক কোনও দিশা পাচ্ছে না। অতএব বাধ্য হয়েই উচ্চতর শিক্ষা বা গবেষণার স্বপ্ন ছেড়ে যুক্ত হচ্ছে জীবিকার সংগ্রামে। আর সে জন্যই উচ্চশিক্ষা এদের কাছে বিলাসিতা।

উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি যত দিন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে না পারছে, তত দিন ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অনাগ্রহ বাড়বে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান পরিকাঠামোয় মৌলিক কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন। চাই শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সংযোগ স্থাপন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নতুন প্রযুক্তি ও শিক্ষণপদ্ধতির সঙ্গে গতি মেলানো। যুক্ত হোক মূল্যায়ন পদ্ধতির নব সংস্করণ। অগ্রাধিকার দেওয়া হোক ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভাবনী এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার উপর। শুধুমাত্র গতানুগতিক লিখিত পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মেধা যাচাইয়ের দিন শেষ। উপযুক্ত কর্মসংস্থানই হবে কলেজগুলির চালিকাশক্তি।

সুব্রত পাল, কলকাতা-৩৮

দৌড়ে ক্লান্ত

‘ইঁদুরদৌড়ে শামিল অভিভাবকেরাও’ (পত্রিকা, ৪-৪) শীর্ষক প্রবন্ধটি এক নিষ্ঠুর বাস্তবকে তুলে ধরেছে। অভিভাবক-অভিভাবিকারা সহজ সত্যটি মানতে চান না যে, একটি চারাগাছকে সার দিয়ে যতই বড় করার চেষ্টা করা হোক, মুক্ত প্রকৃতির আলো-জল-বাতাস না পেলে সে ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারে না। নার্সারি থেকেই শিশুদের মনে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, অলিম্পিক্সের গোল্ড, সিলভার, ব্রোঞ্জ পদকের বাইরে অন্য যে কোনও পারফরম্যান্স যেমন মূল্যহীন, ঠিক তেমনই পরীক্ষায় প্রথম তিনের মধ্যে থাকতেই হবে।

এত অল্প বয়স থেকে জোরে দৌড়তে দৌড়তে এই ছেলেমেয়েগুলির অনেকেই মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের মতো বড় পরীক্ষায় গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ছে, হোঁচট খাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা জানাই। ছেলে তখন রিষড়ার একটি স্কুলের প্রাথমিক বিভাগে পড়ে। এক দিন প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে ওর পরীক্ষার শেষে ওকে আনতে গিয়েছিলাম। পরীক্ষা শেষে ছোট ছেলেমেয়েগুলো ক্লান্ত-ঘর্মাক্ত শরীরে বাইরে বেরোতে শুরু করেছে। হঠাৎই এক অভিভাবিকাকে দেখলাম, তাঁর মেয়েটিকে এক ঝটকায় এক পাশে টেনে নিয়ে গেলেন। তার পর কোন প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। একটা উত্তর ভুল হওয়ার জন্য ওখানেই মেয়েটির গালে পড়ল চড়।

উপস্থিত সবাই হতবাক। এত ছোট মেয়েটিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিশ্রাম দিয়ে, খাবার খাইয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত না? এত বছর বাদেও মেয়েটির কান্না আর তার মায়ের নিষ্ঠুর মুখ ভুলতে পারিনি।

অরূপরতন আইচ, কোন্নগর, হুগলি

আরও পড়ুন