Democracy

সম্পাদক সমীপেষু: গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ

এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালেও স্বৈরশাসন চলছে বহু প্রান্তে, এবং সেই শাসনব্যবস্থা চালু রাখতে কোনও এক জন একনায়কের প্রয়োজন হয় না। আজকের বিশ্বব্যবস্থাই সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে নিজ স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখে।

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২১

“‘ভাল একনায়ক’ নেই” (১৬-১২) শীর্ষক প্রবন্ধে সুহাসিনী ইসলাম সঠিক ভাবেই বলেছেন যে, কোনও স্বৈরাচারী শাসকের পক্ষে গণতান্ত্রিক বা উদার হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর শাসনের প্রতি দফাতেই তাঁকে জনগণের উপর নিপীড়ন উত্তরোত্তর বাড়িয়ে যেতে হবে, না হলে তিনি আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না। যদিও এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালেও স্বৈরশাসন চলছে বহু প্রান্তে, এবং সেই শাসনব্যবস্থা চালু রাখতে কোনও এক জন একনায়কের প্রয়োজন হয় না। আজকের বিশ্বব্যবস্থাই সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে নিজ স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখে। গণতন্ত্রের আড়ালেই চলে ভয়াবহ নিপীড়ন। ইরানীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডারিয়াস রেজালি তাঁর টর্চার অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি বইতে দেখিয়েছেন, কী ভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শারীরিক অত্যাচার, প্রহার ও নির্যাতনের দাগ গোপন করে রাখার কৌশল বার করে, যাতে চূড়ান্ত স্বৈরাচারী হয়েও নিজেকে ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে তুলে ধরা যায়। তিনি লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র শুধু নির্যাতনই করে না, নির্যাতনের জন্য আন্তর্জাতিক মানও নির্ধারণ করে দেয় হিটলার-মুসোলিনি-তোজোর মতো। ঘোষিত স্বৈরশাসকরা হয়তো আরও বেশি নির্যাতন করেছেন, কিন্তু আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এমন সব কৌশলের পথপ্রদর্শক এবং রফতানিকারক, যা আধুনিক বিশ্বে প্রতিবাদী নাগরিকদের উপর নির্যাতনের ভাষা হয়ে উঠেছে; এমন এক পদ্ধতি, যা কোনও চিহ্ন রাখে না।

“ইতিপূর্বে আর-কোনো রাজা সিংহাসনে চড়িয়া বসিয়া রাজত্বের পেখম সমস্তটা ছড়াইয়া দিয়া এমন অপূর্ব নৃত্য করে নাই। প্রজারা চারি দিকে অসন্তোষ প্রকাশ করিতে লাগিল— ছত্রমাণিক্য তাহাতে অত্যন্ত জ্বলিয়া উঠিলেন; তিনি মনে করিলেন, এ কেবল রাজার প্রতি অসম্মানপ্রদর্শন। তিনি অসন্তোষের দ্বিগুণ কারণ জন্মাইয়া দিয়া বলপূর্বক পীড়নপূর্বক ভয় দেখাইয়া সকলের মুখ বন্ধ করিয়া দিলেন; সমস্ত রাজ্য নিদ্রিত নিশীথের মতো নীরব হইয়া গেল”— রাজর্ষি উপন্যাসে এই ভাবেই পরাক্রান্ত শাসক দ্বারা প্রজাদের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কথা বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই বর্ণনা যেন হুবহু মিলে যায় বহু দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে, যার শাসকেরা কেউ একনায়ক নন, বরং নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছেন। গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেই এঁরা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতে থাকেন। সপ্তদশ শতকের ফরাসি ধর্মযাজক কার্দিনাল রিশেলিউ এক জন খ্রিস্টান পাদরি ছাড়াও ছিলেন রাষ্ট্রনীতিবিদ ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের গোঁড়া সমর্থক। রাজতন্ত্রের বিদ্রোহীদের কণ্ঠরোধ করতে তাঁর কিছু বিখ্যাত নীতি ও বাণী রয়েছে। যেমন, “তুমি যদি আমায় সবচেয়ে সৎ মানুষের লেখা ছয় লাইন এনে দাও, তা হলে তার মধ্যে এমন কিছু খুঁজে বার করে নেব, যা দিয়ে তাঁকে ফাঁসিকাঠে তুলে দিতে পারব।” এই বাণী অনেক শাসকেরই খুব পছন্দের বাণী। কাজেই, ‘ভাল একনায়ক নেই’ যেমন সত্য, তেমন প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও যে এ বিশ্বে বিরল, সেটিও সমান সত্য।

অজেয় পাঠক,ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

পরিবর্তন চাই

সুহাসিনী ইসলাম তাঁর প্রবন্ধে অধ্যাপক কৌশিক বসুর একটি গবেষণা পত্রের সূত্র উল্লেখ করে বলেছেন, একটি সঠিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাই পারে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি দিতে। আর, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না করেই সেটা সম্ভব। অথচ, আজকের বৈশ্বিক ব্যবস্থা সারা বিশ্বে ঘটতে থাকা বহু অবিচার, অন্যায় আর গণহত্যার এক নীরব দর্শক হয়েই থেকে গিয়েছে। এরই অন্যতম গত দু’বছর ধরে গাজ়া ভূখণ্ডে ইজ়রায়েলের সংগঠিত গণহত্যা। বস্তুত, গত ৭২ বছরে এই রাষ্ট্রের শাসকরা সন্ত্রাস, হত্যা আর দখলদারির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ প্যালেস্টাইনিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার স্বার্থে লড়াই করছে, তারা আত্মরক্ষার স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতেই পারে। কিন্তু কোনও অবৈধ দখলদারি শক্তি ‘আত্মরক্ষা’র অজুহাতে কোনও জনগোষ্ঠীর উপর সামরিক আক্রমণ চালাতে পারে না। অথচ, ইজ়রায়েল এ-যাবৎ বহু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। মিথ্যা ‘আত্মরক্ষা’-র নামে তারা ক্রমাগত দখলদারি আর হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছে। স্পষ্ট ভাবেই ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধী। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপুঞ্জ বা কোনও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এই গণহত্যার জন্য তাঁকে শাস্তি দিতে পেরেছে কি?

এই প্রসঙ্গে ইরাকের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান প্রয়াত সাদ্দাম হুসেনের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত সাদ্দাম হুসেনকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে স্পেশাল ইরাকি ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের শেষের দিকে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে ১৯৮২ সালে তাঁকে হত্যা করতে যে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল, তার বদলা নিতে তিনি ১৪৮ জন শিয়া ধর্মাবলম্বীকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু হামাসের আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে নেতানিয়াহু প্রায় এক লক্ষ সাধারণ প্যালেস্টাইনিকে হত্যা করলেও তাঁর আজ পর্যন্ত কোনও বিচার বা শাস্তি হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও তিনি আজও আমেরিকার সহায়তায় তাঁর কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই, এটা স্পষ্ট ভাবে বলাই যায়, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাটি স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়ন অথবা গণহত্যা— কোনওটিই নিবারণ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। অচল, নখদন্তহীন এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না ঘটালে এই রকম আরও অনেক একনায়কের জন্ম হবে, আরও বহু নারী-পুরুষ-শিশু গণহত্যার শিকার হয়ে এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।

রুদ্র সেন, কলকাতা-২৮

শেষ হবে

সুহাসিনী ইসলামের প্রবন্ধটি পড়ে কিছু কথা। একনায়ক যখন ক্ষমতায় থাকেন তখন সমস্ত ক্ষমতা তিনি কুক্ষিগত করেন। ক্ষমতা তিনি কারও হাতে ছাড়েন না, তা হারানোর ভয়ে। সেই ভয় থেকে তিনি একের পর এক এমন সব কাজ করতে বাধ্য হন যা তাঁকে স্বৈরাচারী করে তোলে। দেশের সংবিধানকে মানেন না তিনি। যত দিন যায় তিনি তত নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেন। তাঁর ক্ষমতার প্রতি লালসা তত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

ইতিহাস সাক্ষী, বিংশ শতাব্দীতে একনায়ক সংখ্যা কম ছিল না। নিজের দেশে ত্রাস ছড়িয়ে, হিংসার উপর ভরসা করে তাঁরা ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিলেন আমৃত্যু। হিটলার থেকে মুসোলিনি, স্তালিন থেকে গদ্দাফি, ইদি আমিন থেকে সাদ্দাম হুসেন এবং তাঁদের সমকক্ষ আরও অনেকেই ক্ষমতাকে নিজের সম্পত্তি মনে করেছিলেন। কিন্তু কালের করালগ্রাসে তাঁরা সবাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছেন। ফলে একনায়ক যতই তৈরি হোক না কেন, তাঁদের বিনাশ হবেই।

শ্রীময় ঘোষ, জামশেদপুর

অসহায়

আমি গরচা রোডের বাসিন্দা এক প্রবীণ নাগরিক। এলাকায় একটি পুকুর সমেত বাগানে বিগত ৫-৬ বছর ধরে তিনটি ইমারত তৈরি করছেন এক বা একাধিক প্রোমোটার মিলে। সমস্যা হল, এঁরা কোনও নিয়মকানুনের ধার ধারেন না। রাস্তার উপরে সমস্ত নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখেন, সারা দিন কাজ চলে। ফলে তীব্র আওয়াজের পাশাপাশি প্রচণ্ড ধুলো সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে অভিযোগ জানিয়ে লাভ হয়নি। এই বিষয়ে কাকে জানালে কাজ হবে?

প্রবীর সরকার, কলকাতা-১৯

আরও পড়ুন