ঘৃণা থেকেই আসে উগ্র ক্রোধ, আর ক্রোধ জন্ম দেয় হিংস্রতার। জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায় “‘বীভৎস’ মজার দিনকাল” (২-১) প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন সমাজ সংস্কৃতিতে কিছু পচছে। যদি এই ভাবেই চলতে থাকে, তবে হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যখন ‘কিছু’ নয়, পুরো সমাজ, সংস্কৃতিটাই পচে যাবে। সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত সমাজমনস্ক মানুষকে এখনই এ সম্পর্কে সদর্থক পদক্ষেপ করতে হবে।
জন্ম থেকেই কোনও ব্যক্তি হিংস্র হয়ে ওঠে না। চার পাশের বিভিন্ন ঘটনা, সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে ক্রুদ্ধ করে তোলে এবং তারই প্রতিফলন হয় সেই ব্যক্তির হিংস্র আচরণে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের পরোক্ষ প্ররোচনা। এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের ঘৃণাভাষণ, বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একে অপরের সঙ্গে লড়িয়ে দেওয়া চলতেই থাকে শাসক দলের কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখতে। সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এমন হিংস্রতা, পৈশাচিকতা স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে সমকালীন সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, ছবি ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।
সমাজমাধ্যমে, আমাদের চার পাশে অহরহ এমন অনেক হিংস্র, ভয়ঙ্কর মন্তব্য দেখা যায় যেগুলো হয়তো করেছেন নেহাতই ছা-পোষা, আপাতনিরীহ কোনও ব্যক্তি যিনি কস্মিন্কালেও আঘাতের উদ্দেশ্যে হাতে ছুরি-কাটারি ধরেননি। হয়তো তিনি কোনও শিশুর পিতা, সন্তানকে দু’বেলা স্নেহে ভরিয়ে তোলেন। যখন দাঙ্গা হয়, তার সব অভিযুক্ত দাগি আসামি হন না। বরং অনেক সাধারণ মানুষ জড়িয়ে পড়েন ক্রমাগত ঘৃণাভাষণের কারণে। ক্রমাগত বিদ্বেষ, বিভাজন, ঘৃণা ছড়ানোর কারণে উত্তরপ্রদেশে আখলাক হত্যা ঘটে, মুর্শিদাবাদে হরগোবিন্দ দাস, চন্দন দাসের হত্যা হয়, বাংলাদেশে দীপু দাসকে পিটিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এ রকম আরও অনেক নাম আছে, যাঁদের স্রেফ সন্দেহের বশে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
প্রবন্ধকার ঠিকই বলেছেন যে, সমাজে, দেশে ঘটে চলা ক্রমবর্ধমান হিংসা, বীভৎসতার ঘটনা খুবই দুঃখজনক ও চিন্তার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি উদ্বেগের কারণ হল মানুষের উদ্বেগহীনতা। এক বিশাল অংশের মানুষ হিংস্রতা দেখে লজ্জিত বা দুঃখিত তো নন-ই, বরং তাঁরা উপভোগ করেন। কেউ কেউ ওই নির্মমতার ঘটনা ভিডিয়ো করেন, যা কয়েক বছর আগেও ভাবা যেত না। হিংস্রতার উপর নির্ভর করেই কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে অ্যানিমাল, ছাওয়া, ধুরন্ধর-এর মতো সিনেমা। ঘৃণাভাষণ, বিদ্বেষ-বিভাজনের রাজনীতি যদি বন্ধ না হয়, তা হলে নৃশংসতা চলতেই থাকবে। তাতে রাজনীতিবিদদের হয়তো সুবিধা হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে তা ঘোর অন্ধকারের সূচনা।
সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি
অবক্ষয়
জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের “‘বীভৎস’ মজার দিনকাল” প্রবন্ধে আধুনিকতার মিথ্যা খোলস খসে পড়েছে। হিংসায় মেতে ওঠা পৃথিবীর কাছে প্রবন্ধকার সত্যের দর্পণ ধরেছেন, যে দর্পণে চোখ রাখলে প্রকৃত আধুনিকতার সন্ধান মিলতে পারে। সিনেমায় হিংসার চর্চা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই নৈতিক অধঃপতন কি এক দিনে হয়েছে? উত্তর, না। বরং সত্যের অপব্যাখ্যায় নীতিগত অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করেছে।
অনুকরণের জগৎ আমাদের মনের ভিত গড়ে তোলে। ফলে গোড়াতেই যদি ভুলের অনুকরণ শুরু হয়ে যায়, তা হলে পরবর্তী কালে সেখান থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেন আজ সিনেমা বা থিয়েটারে হিংসার চর্চা বেড়ে গিয়েছে, তার অনুসন্ধান জরুরি। প্রবন্ধকার দর্শনের অধ্যাপক ইয়ানলুকা ডে মুটিসিয়ো-র মত উদ্ধৃত করে যথার্থই লিখেছেন— উগ্র হিংস্রতার ছবি নাগাড়ে দেখলে সংবেদনশীলতার সাড় কমে। মানুষ নাশকতাকে উপভোগ করতে শেখে। অপরের যাতনায় যে সহমর্মিতার উদ্রেক হওয়ার কথা, সেটি ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়।
সহানুভূতি এবং সমানুভূতির সূক্ষ্ম অথচ গুরুতর শিক্ষাকে পরিমাপ করতে বিদ্যালয় স্তরে ফর্মেটিভ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সত্তাকে জাগ্রত করার জন্য যে সকল পন্থা অবলম্বন করা দরকার, তা কি আজও নেওয়া হয়েছে? নিয়মিত খেলাধুলা করানো বা সংস্কৃতির আঙিনায় পৌঁছে দেওয়ার সার্বিক প্রচেষ্টা কি আদৌ গৃহীত হয়েছে? ‘মুষ্টিমেয়র উন্নয়ন দেশের উন্নয়ন নয়’, এ কথা বহু আগে মহাত্মা গান্ধী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলে গিয়েছেন। সে কথা কি বাস্তবে মানা হচ্ছে? কেবল সিনেমা বা থিয়েটার নয়, শিল্প সাহিত্যের প্রতিটি আঙ্গিকে এবং জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হিংসার চর্চা ক্রমে বেড়েই চলেছে। শৈশবের নীতিকথামূলক গল্প পাঠ, কিংবা পারিবারিক সৌজন্য-শিক্ষার অভাব ভীষণ ভাবে চোখে পড়ছে। নিজের কাজকে সহজ করার জন্য শিশুর হাতেও মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুরভিসন্ধি, প্রেম-অপ্রেম, হিংসার নিয়ত চর্চা চলছে ছোটদের কার্টুনেও। আমরা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে অনীহা দেখাচ্ছি না তো? আগামী প্রজন্মকে ইচ্ছে করে বিভ্রান্ত করছি না তো?
জীবনে উদারতার, সহমর্মিতার শিক্ষাটুকু আজও আমরা গ্রহণ করতে পারছি কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দুর্ঘটনা কবলিত মানুষকে উদ্ধারের বদলে ভাইরাল করে দেওয়ার নেশা মানুষকে গ্রাস করছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে অতীতের শিল্প সাহিত্য বা মহান চরিত্রের অনুকরণ অনুসরণ চর্চা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। মহান মানুষদের জন্ম বা মৃত্যুর দিনগুলি কেবল ছুটির দিন নয়। বরং তাঁদের কর্মকাণ্ডের চর্চা হোক। সোনা হিরে জহরত নয়, অভিভাবক তাঁর অমূল্য সম্পদ হিসেবে যত দিন না সন্তানকে বিবেচনা করবেন, তত দিন এই হিংসা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না। সমাজে সংস্কৃতিতে ঘটে চলা পচন ঠেকাতে আজ সকলের একজোট হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
দীপায়ন প্রামাণিক, গোবরডাঙা, উত্তর ২৪ পরগনা
দায়িত্ব
“‘বীভৎস’ মজার দিনকাল” প্রবন্ধটি সাম্প্রতিক সমাজের প্রতিচ্ছবি। প্রবন্ধের মূল কথা— সাম্প্রতিক কালে আমাদের চার পাশে পরস্পরের প্রতি চরম বিদ্বেষ, হিংস্রতা, খুন যা এক কালে ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তা আজ প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। বর্তমান সমাজের সবচেয়ে গভীর সঙ্কট হল মানুষ এগুলিকে স্বাভাবিক ঘটনার পর্যায়ে ফেলে তা উপভোগ করছে। সমাজে হিংসা, প্রতিহিংসা, খুন, ধর্ষণ, অসহিষ্ণুতা, স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, উচ্ছৃঙ্খলতা দেখানোয় দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমগুলির প্রতিযোগিতা চলছে এবং সকাল সন্ধ্যা আমরা গোগ্রাসে তা গিলছি। সমাজে প্রতিবাদীদের কণ্ঠ চিরদিনের মতো বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সমাজের এই অবক্ষয়ের দিনে শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত মানুষের একাংশের কাঁধে বিরাট দায়িত্ব এসে পড়ে। সমাজ যখন আজ হিংসায় জরাজীর্ণ, মানুষের মেরুদণ্ড যখন ভেঙে পড়ার দশা, তাঁদের এই ‘গা-সওয়া’ মানসিকতা থেকে বার করে এনে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যবিত্তদের সেই অগ্রণী অংশের। তাঁদের দায়িত্ব মানুষের মধ্যে সচেতনতা ফিরিয়ে আনার, মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তোলার।
দ্বিজেন্দ্রনাথ সরকার, জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ
দুঃসাধ্য
বই পড়া, বই কেনার টানে কলকাতা বইমেলায় যাওয়া পুরনো অভ্যাস। কিন্তু প্রতি বার মনে হয়, বইমেলায় পাঠক, লেখক, ক্রেতা-বিক্রেতা, প্রকাশক এঁদেরই থাকার কথা। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন বড় স্টলগুলির প্রয়োজনীয়তা কী? তার চেয়ে যে সব বড় বড় প্রকাশকের স্টলে প্রচুর ভিড় হয়, তাদের আয়তন বাড়ালে পাঠকদের উপকার হয়। কোথাও আধ ঘণ্টা কোথাও বিশ মিনিট লাইন দিয়ে ঢুকতে হয়। তার উপর ভিতরে এত ভিড় যে বই দেখা বা কেনা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
শুভেন্দু মণ্ডল, বগুলা, নদিয়া