ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় কেবল একটি ট্রফি বিজয় নয়, বরং বিশ্বক্রিকেটে ভারতের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রতিফলন। প্রথম দেশ হিসেবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে টানা দ্বিতীয় বার এবং সর্বমোট তিন বার এই শিরোপা জিতে টিম ইন্ডিয়া আজ এই কম ওভারের খেলায় ইতিহাসের সফলতম দল।
প্রতিযোগিতার শুরুটা প্রতিকূল হলেও অভিজ্ঞ সূর্যকুমারের ধৈর্য এবং অর্শদীপ-বুমরাদের ধারালো বোলিং ভারতকে গ্রুপ পর্বে অপরাজিত রাখে। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কলম্বোয় ঈশান কিশনের ঝোড়ো অর্ধশতক এবং বুমরা-বরুণের চমকে ৬১ রানের জয় দলটিকে এক অদমনীয় মানসিকতা এনে দেয়। তবে সুপার এইট পর্বে শুরুতেই দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হোঁচট খেলেও জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ২৫৬ রানের পাহাড় গড়ে ভারত রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করে। এর পর কলকাতার ইডেন গার্ডেন’স-এ রচিত হয় এক কাব্যিক প্রতিশোধের গল্প। সঞ্জু স্যামসনের চওড়া ব্যাটে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে পাঁচ উইকেটে পরাজিত করে ভারত। সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকে সেমিফাইনালেও, শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে— যেখানে স্যামসনের ৮৯ রানের ইনিংস এবং বুমরার অবিশ্বাস্য স্পেল ভারতকে ফাইনালে খেলার টিকিট এনে দেয়।
আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ফাইনালের মহারণে নিউ জ়িল্যান্ডের মুখোমুখি হয়ে ভারত ২৫৫ রানের বিশাল স্কোর তোলে। অভিষেক শর্মার বিধ্বংসী ৫২ রান, পাশাপাশি সঞ্জু স্যামসন ও ঈশান কিশনের দারুণ ব্যাটিং সমন্বয়, এবং বুমরার অতিমানবীয় স্পেল (১৫ রান দিয়ে চার উইকেট) রাচিন রবীন্দ্রদের মানসিক ভাবে জখম করে দেয়।
এক দিনের বিশ্বকাপের বিষাদময় স্মৃতি মুছে কোচ গৌতম গম্ভীরের তত্ত্বাবধানে ভারতীয় ক্রিকেট এখন এক সোনালি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সঞ্জু, ঈশান, অভিষেকদের এই ক্রিকেটীয় মানসিকতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে— ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ। এই জয়ের রাত দেশের প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকুক।
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা-৫০
স্বপ্নপূরণ
বছর তিনেক আগে ফাইনালে হেরে এক দিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ভারতের— এই আমদাবাদেই। চোখের জলে মাঠ ছেড়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটারেরা। এ বার সেই আমদাবাদের বিশাল স্টেডিয়ামে রবিবার রাতের দৃশ্য ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দর্শকে পরিপূর্ণ গ্যালারি, পতাকার ঢেউ আর আবেগে ভাসা এক রাত্রি— সব মিলিয়ে যেন এক মহাকাব্যিক মুহূর্ত।
এই জয়ের আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভারতীয় ক্রিকেটের গভীরতা। এক সময় ভারতের সাফল্য কয়েক জন তারকা ক্রিকেটারের উপর নির্ভর করত। এখন নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারেরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরছেন। ফলে দলের শক্তি শুধু অভিজ্ঞতার উপর নয়, প্রতিভার বিস্তৃত ভান্ডারের উপর দাঁড়িয়ে। ‘ফাইনালে উঠলে ট্রফি না নিয়ে ঘরে ফেরেন না’— যেন গৌতম গম্ভীরের পরিচিতি হয়ে গেল।
ক্রিকেটে জয়-পরাজয় চক্রাকার। আজকের সাফল্য আগামী দিনের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই এই জয়কে উদ্যাপন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও জরুরি। তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া, ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা— এই সব বিষয়েই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে এ বার নজর দিতে হবে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
আগামীর পথ
টি-২০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলের প্রথম একাদশে ব্যাটিংয়ের গভীরতা সত্যিই ঈর্ষণীয়।
তবে গৌতম গম্ভীরেরই টিম ইন্ডিয়া সাম্প্রতিক অতীতে টেস্ট ক্রিকেটে হতাশাজনক ফল করেছে। টেস্ট দলের নির্বাচন ঠিক ভাবে করা গেলে এই ক্ষেত্রেও সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। টেস্ট দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে রঞ্জি ট্রফির পারফরম্যান্সকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হলে বেশ কয়েক জন ক্রিকেটারের নাম নির্বাচকদের আলোচনায় নিশ্চিত ভাবেই উঠে আসতে পারে। যেমন— দেবদত্ত পাড়িক্কল, সুদীপ ঘরামি, শাহবাজ় আহমেদ, আকিব নবি, সারাংশ জৈন।
এঁদের সঙ্গে শুভমন গিল, যশস্বী জায়সওয়াল, কে এল রাহুল, ধ্রুব জুরেল, বুমরা, কুলদীপরা তো থাকবেনই। এর পর দলের সঙ্গে অভিজ্ঞ মহম্মদ শামিকে যুক্ত করা গেলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বিষয়েও আশাবাদী হওয়া যায়।
সৌম্য বটব্যাল, দক্ষিণ বারাসত, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
একতার শক্তি
রঞ্জি ট্রফি জয়ের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেট দল এক নতুন ইতিহাস রচনা করল। সাম্প্রতিক কালে আঞ্চলিক বিবাদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের ফুটবল দল কিংবা অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট দলে কাশ্মীর উপত্যকার মুসলিম প্রতিনিধিদের ‘আধিপত্য’ রয়েছে— এই অভিযোগ তুলেও সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিরই শাসন চলেছে।
অন্য দিকে, রঞ্জি দলের ক্রিকেটারেরা যাবতীয় ধর্মীয়, জাতিগত ও ভৌগোলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ভাবে খেলেছেন। সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য সাফল্য আনার একাগ্র লক্ষ্য নিয়েই এগিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য স্পর্শ করেছেন। যদি সাধারণ মানুষের মধ্যেও একই ঐক্যের মানসিকতা তৈরি হয়, তবে দেশের নানা ক্ষেত্রেই জম্মু ও কাশ্মীর তার প্রাপ্য স্থান পুনরায় অধিকার করতে পারবে।
কাজল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-১১৪
উপেক্ষিতই
‘যুব-ভারতী’ (৯-৩) শিরোনামে বিশ্বকাপ জয়ের প্রতিবেদনগুলি পড়লাম। ওই দিনই খেলার পাতায় আরও একটি সংবাদ ছিল— ‘ফের স্বপ্নভঙ্গ লক্ষ্যের’। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মহারণের সময় অনেকটা অগোচরেই লক্ষ্য সেন একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে, এমনকি বিশ্ব তালিকার শীর্ষ স্থানাধিকারীকেও পরাজিত করে অল ইংল্যান্ড ওপেনের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার ফাইনালে ওঠেন।
এমন এক প্রকৃত বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় একক কৃতিত্বে রানার্স হওয়াও বড় কম কথা নয়। কিন্তু দেশবাসী কি তাঁকে সেই ভাবে বরণ করল? ভারতে ক্রিকেটের সর্বগ্রাসী জনপ্রিয়তার সামনে অন্য খেলাগুলির সাফল্য অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। দাবার বিশ্বজয়ী বিশ্বনাথন আনন্দ, ডি গুকেশ, কিংবা অলিম্পিকের স্বর্ণপদকজয়ী নীরজ চোপড়া— তাঁরা কি সত্যিই সে ভাবে দেশবাসীর মনে স্থায়ী আসন নিতে পেরেছেন? অর্থাৎ, যে ভাবে ক্রিকেটারেরা সর্বক্ষণ দেশবাসীর হৃদ্মাঝারে বিরাজিত, সে ভাবে?
মধুসূদন দাশঘোষ, হরিপাল, হুগলি
অসতর্কতা
‘যুব-ভারতী’ শিরোনামের সঙ্গতে প্রথম পৃষ্ঠার ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি টানা মঞ্চের গায়ে ভারতের জাতীয় পতাকার কয়েকটি ছবি বা ফেস্টুন টাঙানো রয়েছে। সেই মঞ্চের উপর বসে আছেন আমাদের বিশ্বকাপ বিজয়ী দলের খেলোয়াড়রা। খেলায় জয় নিশ্চয়ই গর্বের ও উচ্ছ্বাসের, তবে আমাদের জাতীয় পতাকার অবস্থান নিয়ে সতর্কতা ও সচেতনতাও জরুরি ছিল।
সত্যব্রত দত্ত, কলকাতা-৮৪