স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘অসুন্দরের অত্যাচার’ (৩-৪) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। কলকাতার কিছু মূর্তি বাদ দিলে বাকিগুলো দেখলে মনে হয়, যাঁরা এ সব নির্বাচন করেন তাঁদের মধ্যে পুতুল ও ভাস্কর্যের তফাত সম্বন্ধে তেমন কোনও ধারণা নেই। বড় মাপের মূর্তি যেন ছোট ছোট পুতুলের বিবর্ধিত রূপ। লক্ষ্য কেবল চেহারাটাকে মিলিয়ে দেওয়া, যাতে ফোটোগ্রাফের সঙ্গে এক রকম লাগে। যেন কলকাতা হতে চাইছে ‘পুতুল শহর’।
ভাস্কর্যের জায়গা যদি পুতুল নেয়, তবে তা বড়ই দুঃখজনক। পুতুল অনুসরণ করে ব্যক্তির বাহ্যিক চেহারা, দর্পণ প্রতিবিম্বের মতো। আর ভাস্কর্য তার ঊর্ধ্বে গিয়ে তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে গড়ে তোলে। যেমন দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর তৈরি গান্ধীজির মূর্তিটি। কোথাও ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে চেহারার খুঁটিনাটি বহু কিছু বাদ দেওয়া হয়, বা বিমূর্তকরণ করা হয়। তাতে তাঁর চেহারা হারিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রধান রূপে প্রকাশমান হয়। বলা যায়, শিল্পী ওই ব্যক্তিকে যে ভাবে অনুভব করছেন, সে ভাবেই তিল-তিল করে গড়ে তুলছেন। যেমন, রামকিঙ্করের তৈরি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন মূর্তি। প্রয়োজনে শিল্পী বাস্তব রূপের অনেক বিমূর্তকরণ করে ব্যক্তিত্বের স্বরূপকে সরাসরি ধরতে চান, রবীন্দ্রনাথের আঁকা মুসোলিনির রেখাচিত্রের মতো।
তেমন উদাহরণ দেখা যাবে বুদাপেস্ট-এ স্ট্যাচু পার্কে প্রবেশপথে দু’পাশে রাখা মূর্তিতে। মার্ক্স ও এঙ্গেলস-এর মূর্তির গড়নে। সারা দেহ ও মস্তক কোণাকৃতি জ্যামিতিক বিভাজনে গড়ে উঠেছে। চোখ নাক মুখের বিশিষ্ট রূপ ও অবস্থান ভাল করে দেখানো হয়নি। অথচ, দুই ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছে, দেখলে তাঁদের সকলে চিনে ফেলবে। মূর্তি দুটো যেন আমার ভিতরে প্রবেশ করে বুঝিয়ে দিল যে আমরা কেবল চোখ দিয়ে দেখি না।
ব্রিটিশ শাসনকালে যে সমস্ত মূর্তি কলকাতায় বসানো হয়েছিল, সেগুলির মান তো করণ-কৌশলগত দক্ষতা বিচারে ও ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির ব্যাপারে ইউরোপের রাজপথের মূর্তিগুলির মতো উন্নত ছিল না। তার পরের পর্যায়ে যে সব মূর্তি বসেছে, সেগুলির মান তাদের ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। অল্প কিছু মূর্তি ছাড়া ভাস্করদেরও ভাস্কর্যগুণ সম্বন্ধে অনেক বেশি সচেতন হওয়া দরকার। বোধ ও দক্ষতা, দু’দিক থেকেই আরও উন্নত হওয়া দরকার। পাশাপাশি, সরকারের সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পী সদস্যদেরও দায়িত্ব থাকে সরকারি প্রচেষ্টায় জনগণের সুপ্ত শিল্প চেতনাকে জাগানো।
সুবিমলেন্দু বিকাশ সিংহ, কলকাতা-৪১
প্রকৃত সুন্দর
‘অসুন্দরের অত্যাচার’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু সংযোজন। একটি শহরের প্রকৃত সৌন্দর্যায়ন কেবল আলোকসজ্জা বা মূর্তির আধিক্যে নয়; বরং তা নির্ভর করে পরিষ্কার রাস্তাঘাট, প্রশস্ত ফুটপাত, শিশুদের খেলার মাঠ, বয়স্কদের হাঁটা ও বিশ্রামের স্থান এবং পরিকল্পিত সবুজায়নের উপর। বর্তমান সময়ে কলকাতার মতো শহর ও শহরতলি এবং রাজ্যের ছোট-বড় শহরে প্রকৃত সৌন্দর্যায়নের চেয়ে সাময়িক প্রসাধনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের সৃষ্টি করছে। কলকাতার বড় রাস্তাগুলি কিছুটা ঝকঝকে মনে হলেও, অলিগলি এখনও আবর্জনার স্তূপে ঢাকা। ভ্যাটগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না-হওয়ায় পচা গন্ধে পথচারীরা অতিষ্ঠ। বিশেষ করে বাজারের প্রবেশপথ বা পাড়ার মোড়গুলোতে আবর্জনার স্তূপ জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের অধিকাংশ ফুটপাত এখন হকারদের দখলে। ফলে পথচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন। ফুটপাতের অপরিচ্ছন্নতাও শহরের শ্রী নষ্ট করছে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পার্কে যে দোলনা, স্লাইড, মেরি-গো-রাউন্ড ইত্যাদি থাকে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার অনেকগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত পার্কের অভাব এবং বিদ্যমান পার্কগুলোর ফুলের বাগান ও ঘাস অযত্নে নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না মেনে ডিভাইডারে গাছ লাগানোয় তা উপকারের চেয়ে অপকার বেশি করছে।
শহরকে সুন্দর করতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পনা। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা কমিয়ে সেই অর্থ যদি জঞ্জাল অপসারণ এবং রাস্তাঘাট মেরামতে ব্যয় করা হয়, তবেই শহর স্বস্তির হবে। ফুটপাতগুলোকে হকারমুক্ত করে মানুষের হাঁটার উপযোগী করতে হবে। জঞ্জাল অপসারণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নিয়মিত করতে হবে। রং-বেরঙের আলো বা যত্র-তত্র বসানো মূর্তিতে শহরের আত্মা খুঁজে পাওয়া যায় না। শহরের প্রকৃত শ্রী লুকিয়ে থাকে তার পরিচ্ছন্নতায় এবং নাগরিকদের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশের মধ্যে।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
পথশিল্প
‘অসুন্দরের অত্যাচার’ প্রবন্ধে স্বাতী ভট্টাচার্যের বক্তব্যকে সমর্থন করে কিছু কথা। শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র, পাহাড় থেকে সমুদ্র, সব শহরে ভালবাসা জ্বলজ্বল করে ‘অনেকটা জায়গা, অনেকটা আলো, অনেক বড় অক্ষরে’ লিখে। ওয়র্ড-ভিত্তিক ভালবাসার নমুনা ‘আই লাভ…’ অমুক বা তমুক ওয়র্ড। অথচ দেখবেন, ওয়র্ডবাসীদের বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই, পাড়ার মোড়ে বিবেকানন্দ বা নেতাজির মলিন মূর্তিটির দিকে নজরই নেই তাঁদের। ডুয়ার্সের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনপদের পার্কে একটি মূর্তিকে ভাল ভাবে নিরীক্ষণ না করলে বুঝতেই পারতাম না, তিনি কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। ময়দানে গোষ্ঠ পাল, বা আম্বেডকরের মূর্তি নিয়ে জলঘোলা হয় না। কারণ, নির্দিষ্ট দিনে ওঁদের পায়ে ফুল পড়ে, জননায়করা মাল্য প্রদান করেন।
টালিগঞ্জ স্টুডিয়ো পাড়ায় ঢোকার মুখে মহানায়কের মূর্তির অবয়ব অবিকল মহানায়কোচিত করা যেত না? যুবভারতীর ভাস্কর্য বা লেক টাউনের মেসির স্বর্ণালি অবয়ব স্থাপনের পূর্বে ভাবা উচিত ছিল, সমাজমাধ্যমে যেন হাসির ছররা না ওঠে! শোনা গিয়েছিল, কলকাতা এক দিন ‘লন্ডন’ হবে। আর তাই লেক টাউন থেকে শুরু করে বহু জায়গায় ‘বিগ-বেন’এর ছোট-বড় উজ্জ্বল-হাজিরা। স্মর্তব্য, এখন রিস্টওয়াচের চল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সময় দেখতে হলে মোবাইল আছে! সুতরাং শহর সাজাতে কেন এই বাহানা? দেখে দুঃখ হয়, এক নম্বর এয়ারপোর্ট মোড় থেকে বারাসত ডাকবাংলো মোড় অবধি কত স্থাপত্য শিল্প, পথের ধুলোয় মলিন হয়ে আছে। প্রবন্ধকার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। আমাদের বাংলার গ্রামীণ শিল্পের কারুকার্যে যখন এক-একটি পুজো-প্যান্ডেল তাক লাগিয়ে দেয়, সেই প্রান্তিক শিল্পীদের এনে শহুরে শিক্ষিত শিল্পীদের সহযোগিতায় কলকাতার পথ-শিল্প দৃষ্টিনন্দন উদাহরণ উপহার দিতে পারে না?
শহর সাজাতে শুধুমাত্র স্থাপত্য-ভাস্কর্যের দিকেই বা নজর কেন? জলাভূমির পরিসংখ্যান ক্রমহ্রাসমান, অরণ্যের আচ্ছাদন খুইয়ে কলকাতা এখন ‘দিল্লি চেন্নাইয়ের থেকে পিছিয়ে’। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস এবং এপ্রিলের শুরুতেই তাপমাত্রার রোষ প্রমাণ করে, ‘অসুন্দরের অত্যাচার’ থেকে এ শহরের রেহাই পাওয়া দরকার। কী প্রয়োজন অনাবশ্যক হাজার হাজার টাকার ঝাড়বাতির আলোয় শহর সাজিয়ে? তার চেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজপথে পথ-শিল্প নির্মিত হোক।
ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-১২৫
দৃষ্টিকটু
স্বাতী ভট্টাচার্যের প্রবন্ধটি অনেক মানুষের মনের কথা। ভোট এলেই শহর ঢাকে ফ্লেক্সের আড়ালে। আগে দেওয়ালের গায়ে ফুটে উঠত নানা রঙে আঁকা ব্যঙ্গচিত্র, স্লোগান, ছড়া, বিভিন্ন উন্নয়নের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা। এখন তার বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে একই লেখা একই ছবিযুক্ত ফ্লেক্স। এগুলো বড় দৃষ্টিকটু। তা ছাড়া পেরেক আর প্লাস্টিকে পরিবেশেরও ক্ষতি হয়।
বাসুদেব সেন, জাঙ্গিপাড়া, হুগলি