বাদ পড়া ভোটারদের সহায়তা শিবির বাম আইনজীবী সংগঠনের (এআইএলইউ) উদ্যোগে। নিজস্ব চিত্র।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এ বার ১৭০ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যয়ী, দু’শোর বেশি আসন নিয়ে রাজ্যে চতুর্থ বার তাঁদেরই সরকার হচ্ছে। তৃণমূল শিবিরের অন্দরের আলোচনাও বলছে, খারাপ হলেও শাসক দলের আসন ১৮০-র নীচে নামার কথা নয়। দুই যুযুধান শিবিরের এই গভীর প্রত্যয়ের নেপথ্যে অন্যতম কারণ ভোটার তালিকার সংস্কার প্রক্রিয়া। কিন্তু বহিরঙ্গের মোড়ক ছাড়িয়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাটাছেঁড়ায় নামলে দুই শিবিরের জন্যই ধাঁধা রয়েছে যথেষ্ট!
তিন পর্ব মিলিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যে বাদ গিয়েছে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম। পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী তৃণমূল কংগ্রেস এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ফারাক ছিল ৬০ লক্ষ ৮৯ হাজার ৭৬১। দেড় দশকের মধ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই তৃণমূল সর্বাধিক ৪৮% ভোট পেয়েছিল। বিজয়ী ও বিজিতের মধ্যে সে বারের ভোটের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকার নাম বাদের সংখ্যা যে হেতু বেশি, বিজেপি-র আশা এখানেই ‘খেলা’ হয়ে গিয়েছে! শুভেন্দু অধিকারীদের হিসেব, মৃত ও ভুয়ো ভোটার, একাধিক জায়গায় নথিভুক্ত ভোটার যে হেতু কার্যত তালিকা থেকে ‘সাফ’ হয়ে গিয়েছে, তাই ধাক্কা শাসক দলেরই লাগবে।
কিন্তু এর উল্টো দিকে আছে অন্য হিসেবও। গ্রাম ও শহর মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বরাবরই ভোটদানের হার উপরের দিকে থাকে। রাজ্যে গত দুই বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল যথাক্রমে ৮৩.০২% ও ৮২.৩২%। তার পরেও সংখ্যার নিরিখে দেখলে ২০১৬ সালে এক কোটি ১১ লক্ষ ৯৬ হাজার এবং ২০২১ সালে এক কোটি ২৮ লক্ষ ৯১ হাজার ভোট দেননি। এর মধ্যে ভোটার তালিকায় থাকা মৃত ও সেই সময়ে অনুপস্থিত ব্যক্তিদেরও অবশ্যই গোনা আছে। তবে উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ যে ভোট দিতে যাননি, পরিসংখ্যানে সেই বাস্তবও ধরা আছে। এখন এসআইআর-এর পরে যে সংখ্যক ভোটার বাদ (৯১ লক্ষ) গিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ভোট গত ১০ বছরে দুই নির্বাচনে বাক্সে পড়েনি। সেই সূত্রেই ভোটার বিয়োজনের সার্বিক প্রভাব নির্বাচনে কেমন হবে, তার উত্তর সব শিবিরেরই অনুমানসাপেক্ষ! তবে এসআইআর-এর পরে বিহার, তামিলনাড়ু বা অসমে ভোট দানে উৎসাহ যেমন বেড়েছে, এ বার বঙ্গেও সেই চিত্র দেখা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
ভোট মানে নিছকই কিছু সংখ্যা নয়। সংখ্যার পিছনেও নানা স্তর ও নানা ভাগ আছে, সমীকরণ আছে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে মমতার সরকার চালিয়ে যাওয়ার বড় শক্তি মহিলা সমর্থন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য পর্যালোচনা করে পাওয়া একটি সূত্রের হিসেব বলছে, এসআইআর-এ রাজ্যে প্রায় ৫৭ লক্ষ মহিলার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। তার জেরে কিছু ফায়দা তোলার আশা দেখছে বিজেপি শিবির। কিন্তু উল্টো দিকে মমতার হাতে রয়েছে মহিলাদের জন্য নানা সহায়তা প্রকল্প, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় যার গুরুত্ব যথেষ্ট বেশি। তারই পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ-পরিস্থিতির জেরে গ্যাসের জোগানে যে সঙ্কট হয়েছে, তার আঁচ এসে পড়েছে সরাসরি বাঙালির হেঁশেলেও। মহিলা-মনকে রান্নাঘরের সঙ্গে জুড়়ে নিয়ে প্রথম থেকেই সক্রিয় হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। শাসক দলের এক প্রার্থীর কথায়, ‘‘বহু সংখ্যক মহিলার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ঠিকই। কিন্তু এই যাবতীয় হয়রানির পরে আরও বেশি বশি করে মহিলারা বেরিয়ে এসে দিদির পক্ষে ভোট দেবেন।’’
মহিলা ভোটের গতিপ্রকৃতি ছাড়াও বড় প্রশ্ন, ভোটার বিয়োগের খতিয়ান কার খাতায় কত? সার্বিক ভাবে হিন্দু ভোটার বাদ যাওয়ার শতাংশ হিসেব বেশি বলে তৃণমূল শিবির দাবি করছে, পরিস্থিতি তাদের পক্ষেই অনুকূল। কিন্তু এই অঙ্কও একমাত্রিক নয়। এসআইআর-এর প্রথম পর্বে বাদ গিয়েছে যে ৫৮ লক্ষ নাম, তার মধ্যে ২৭ লক্ষের বেশি ছিল মৃত ভোটার। তার সঙ্গে আছে পাকাপাকি ভাবে স্থানান্তরিত এবং হদিস না-মেলা ভোটার। ক্ষমতায় থাকার সুবাদেই এই অংশের ভোটের বেশির ভাগ শাসকের বাক্সে পড়ে, এটাই সাধারণ দৃশ্য। যদিও তার সঠিক ভাগাভাগি বার করা কঠিন। দ্বিতীয় পর্বে বাদ পড়া সাড়ে পাঁচ লক্ষের মধ্যে অধিকাংশই শুনানির ডাকে সাড়া দেননি। যাঁরা ভোটাধিকার ‘বাঁচানো’র জন্য সক্রিয় হলেন না, তাঁরা থাকলে কোন দিকে ভোট দিতেন— কোনও পক্ষেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এর পরে এসেছে তৃতীয় তথা বিচারাধীন-পর্ব। এই পর্বে বাদ যাওয়া ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার মানুষের সকলেই প্রায় ‘সক্রিয়’ ভোটার। তাঁদের মধ্যে সংখ্যালঘু বা মুসলিম বাদ গিয়েছেন ৬৫%-এর বেশি। মতুয়া, রাজবংশী-সহ হিন্দু ভোটার প্রায় ৩৫%। সংখ্যালঘু ভোটে যেমন বিজেপির কার্যত কোনও ভাগ নেই, তেমনই আবার হিন্দু ভোট একচেটিয়া ভাবে তাদের বাক্সে যায় না। কম-বেশি হলেও তাই লাভ-ক্ষতি থাকছে দু’পক্ষেরই।
এর পরে থাকছে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির হিসেব। ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ়’ হওয়ার পরের হিসেব এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তার আগে চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, নতুন ভোটার যোগ হয়েছে এক লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬। তার মধ্যে পুরুয ৮৯ হাজার ৪৪৫ এবং মহিলা ৯২ হাজার ৫৮৩। নতুন ভোটারদের মধ্যে ১৫ বছরের স্থিতাবস্থার বিরেধিতার প্রবণতা বেশি থাকবে বলে বিজেপি শিবিরের আশা। তৃণমূল এ ক্ষেত্রেও মহিলা ও গ্রামীণ ভোটারের উপরে বেশি ভরসা রাখছে।
অঙ্ক নিয়ে এই ধাঁধার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলছেন, ‘‘মতুয়া, তফশিলি, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, হিন্দু—সব জায়গায় নাম বাদ দিয়েছে। যে কোনও উপায়ে বিজেপি বাংলা দখল করতে চাইছে। কিন্তু আমি বলছি, ঘেঁচু করবে!’’ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর মতে, ‘‘কোচবিহারে ভোট দিয়ে এসে পরে আবার ডায়মন্ড হারবারে ভোট দিতে যাওয়ার কারবার এ বার চলবে না!’’ আর সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘এসআইআর-এ অন্যায় ভাবে গরিব, প্রান্তিক মানুষের অধিকার কাড়া হয়েছে। তবে বামের ভোট বামে ফিরবে।’’