Kamaladevi Chattopadhyay

সম্পাদক সমীপেষু: অধিকারের লড়াই

চিরকালীন ছকভাঙা পথের পথিক কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় তাঁর হৃদয়ের ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছেন দেশের জন্য। আপন করে নিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা সমাজ-সংসার-প্রিয়জনের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানে বঞ্চিত।

শেষ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৪৭

ভালবাসা যে আসলে স্নেহ, আবেগ, মানসিক সংযুক্তির এক নিঃস্বার্থ অনুভূতি, পরের মঙ্গল কামনায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া, অন্যকে সম্মান করা— সেটা আবার এক বার মনে করিয়ে দেয় স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ (১৫-২) শীর্ষক প্রবন্ধটি।

চিরকালীন ছকভাঙা পথের পথিক কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় তাঁর হৃদয়ের ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছেন দেশের জন্য। আপন করে নিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা সমাজ-সংসার-প্রিয়জনের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানে বঞ্চিত। ভালবেসেছেন নিজের সত্তাকে। অথচ, তাঁর নিজের জীবনে যন্ত্রণা তো কম ছিল না। প্রায় একশো বছর আগে এই সমাজে এক জন বালবিধবা কন্যা ঘরের কোণে চোখের জল না-ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের বেঁধে দেওয়া রীতি ভেঙে তাঁর মা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। তার পর নিজের পছন্দমতো বিবাহ এবং আত্মসম্মান রক্ষার্থে ডিভোর্স, যেগুলো তখনকার দিনে ভয়ঙ্কর এক সাহসী পদক্ষেপ।

ছকভাঙা পথের দিশারি কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় এক দিকে ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের এক জন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের নারীবিপ্লবী। অন্য দিকে, তিনি ভারতীয় নারীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ও ভোটাধিকারের জন্যও লড়াই করেছেন। প্রথম মহিলা হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি ভারতীয় হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প এবং নাট্যকলাকে পুনরুজ্জীবিত করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও যেখানে অনেক ক্ষেত্রে নারী শুধুমাত্র সংসারে তাঁর নিজের অধিকারটুকু ছিনিয়ে নিতে ভয় পান, সেখানে এত বছর আগে বার বার সামাজিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রগতিমূলক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করেছেন। ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা থেকে রাজনীতি— দেশের জন্য কারাবরণ থেকে দেশবাসীর অধিকার রক্ষা— নারীবাদের আদর্শ। কমলাদেবীর জীবনী আমাদের সমাজের নারীদের নতুন করে ভাবতে শেখায়— জীবনে ঝড় আসবেই, তবু আত্মসম্মান বজায় রেখে নিজের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে জিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো যায়। নারীকে নিজ ভাগ্য জয় করে নিতে হয়। অধিকার নিজের যোগ্যতায় অর্জন করে নিতে হয়।

কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি

আপসহীন

স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ প্রবন্ধটি পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। শতবর্ষ আগে ভোটের ময়দানে দাঁড়ানো এক তরুণীকে শুধুমাত্র ‘প্রথম’ অভিধায় সীমাবদ্ধ করলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরা যায় না। কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ছিল সাহস, ভালবাসা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য সমন্বয়। যে সময় নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য, সেই সময়েই তিনি মাদ্রাজ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সামাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। অল্পের জন্য পরাজিত হলেও সেই লড়াই ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে— কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীর নাগরিক সত্তা আর গৃহকোণে আবদ্ধ থাকবে না। তাঁর রাজনৈতিক সাহসের উৎস ছিল নৈতিক দৃঢ়তা। স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ব্রিটিশ সরকার শর্তসাপেক্ষ মুক্তির প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন; তাঁর যুক্তি ছিল স্পষ্ট— অন্যায় না করলে মুচলেকা দেব কেন? আপস না-করার এই মানসিকতাই তাঁর চরিত্রের মেরুদণ্ড।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি প্রচলিত সামাজিক রীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন— অল্পবয়সে বৈধব্যের পর নিজের সিদ্ধান্তে নতুন জীবন বেছে নেওয়া ছিল নারীর স্বাধীন সত্তার এক সাহসী ঘোষণা। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক আদর্শ— এই তিনের মধ্যে তিনি এক বিরল সামঞ্জস্য স্থাপন করেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী দি আর্ট অব ফ্রিডম আমাদের জানায়, স্বাধীনতা কেবল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান নয়; এটি আত্মমর্যাদা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। কমলাদেবীর জীবন তাই শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি এক মানসিকতার নাম।

অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-১১৫

ব্যতিক্রমী

“ধান খেতের চাষিকে আমি চিনি না, কয়লা খনির গোলামকে আমি চিনি না, বড় গাঙের মাছ মারার দল আমার পরিচিত...” এমনতর সংলাপই তাঁর বিকল্প ভাবনা বোঝানোর পক্ষে যথেষ্ট। সমস্ত প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিকতার বিপ্রতীপ ভাবনায় ছিল তাঁর অবস্থান। জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাদলের মরসুম’ (পত্রিকা, ৭-২) শীর্ষক লেখায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে লেখা হয়েছে— বাদল সরকার নিছক নাট্যব্যক্তিত্ব নন, তিনি নিজেই যেন একটা প্রতিষ্ঠান।

তাঁর নাটক রচনা বা অঙ্গন, মঞ্চের নাট্য-নিরীক্ষা— প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন মননশীলতাকে। অল্প সংলাপ, অনাড়ম্বর মঞ্চায়নের আয়োজন, অথচ সবটা মিলিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায় দর্শক-অভিনেতার মধ্যে। চিরদিনই চাইতেন ভিন্নতর প্রবর্তনা, অন্য ধারায় পথ চলতে। বাংলায় চিরকালই সৃষ্টিশীল মানুষদের কাজে নিন্দুকের অভাব পড়েনি। এ ক্ষেত্রেও তাঁরা টিপ্পনী কাটলেন— প্রসেনিয়াম থিয়েটারের অসাফল্য বাদল সরকারকে এগিয়ে দিয়েছে তৃতীয় থিয়েটারের আন্দোলনে। বাস্তবে এই অভিযোগ সর্বৈব ভাবে ভ্রান্ত। এবং ইন্দ্রজিৎ, পাগলা ঘোড়া, সাগিনা মাহাতো, সারা রাত্তির, শনিবার, বাকি ইতিহাস, বল্লভপুরের রূপকথা— প্রতিটিই মঞ্চসফল প্রযোজনা। গিরিশ চন্দ্র ঘোষের ‘আবু হোসেন’ নাট্য-অ্যাকাডেমিতে একের পর এক অভিনয় হয়েছে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে।

সঙ্গীত-নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার ভাবতেন, তাঁকে নিরন্তর নতুন কিছু করতেই হবে। প্রসেনিয়াম মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন মাঠেঘাটে। শুরু হল তৃতীয় ধারার নাট্য আন্দোলন। স্পার্টাকাস, ভোমা, মিছিল-এর মতো নাটক নিয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন কারখানার গেটে, পাড়ার খেলার মাঠে, কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে, আরও ছড়িয়ে দিলেন মাধ্যমটিকে। তিনি ছবিও আঁকতেন অসাধারণ। পরমাণু যুদ্ধের বিভীষিকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণের দাপট, নিত্যনতুন পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনার মধ্য দিয়ে কত দিন সুরক্ষিত থাকবে মানুষের অস্তিত্ব, ভাবতেন তিনি। পার্টির সদস্য না-হয়েও কমিউনিস্টদের সঙ্গে এক সময় সখ্য গড়ে উঠেছিল। পরে দূরত্ব তৈরি হলেও দরিদ্র মানুষের লড়াইতে তিনিও চেয়েছিলেন থিয়েটারকে শামিল করাতে।

বাদল সরকার সেই ব্যতিক্রমী মানুষ, যিনি কখনও চাননি উত্তরকাল তাঁকে স্মরণীয় বলে মনে করুক, তাঁর মূর্তি তৈরি হোক। শুধু আমাদের মধ্যে থিয়েটারের ধারণাটা বদলে দিয়েছিলেন তিনি।

সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪

ভাতাসর্বস্ব

‘চাকরি মেলেনি, খেদ নিয়েই যুব-সাথী লাইনে’ (১৬-২) শীর্ষক প্রতিবেদনে এক জন বেকার ছাত্র-যুবক হিসেবে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার যুবসমাজ। সেই যুবসমাজ যখন কর্মসংস্থানের অভাবে অনিশ্চয়তায় ভোগে, তখন রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু কাজের পরিবর্তে মাসিক ১৫০০ টাকার ভাতা সামনে আনা হলে প্রশ্ন উঠবেই— এটি কি উন্নয়নের নীতি, না কি সমস্যাকে আড়াল করার উপায়? যে বিপুল পরিমাণ অর্থ এ বাবদ ব্যয় করার কথা, তার বিনিময়ে রাজ্য কী পাচ্ছে? নতুন শিল্প? নতুন কর্মসংস্থান? দক্ষতা উন্নয়নের পরিকাঠামো? না কি কেবল অস্থায়ী ভোগব্যয়ের বৃদ্ধি?

এক জন যুবকের জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে ১৫০০ টাকার তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বাড়িভাড়া, যাতায়াত, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফি, বই, ডিজিটাল সংযোগ— এ সবের জন্য কয়েক হাজার টাকা প্রয়োজন। ১৫০০ টাকা কেবল প্রতীকী সান্ত্বনা। এটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নয়; এটি টিকে থাকার সংগ্রামের একটি ক্ষুদ্র উপশম। অর্থনীতির মৌলিক নীতি বলে, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন আসে উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। ভাতা উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি করে না। যদি এই পরিমাণ অর্থ শিল্পায়ন, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সম্প্রসারণ বা আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করা হত, তা হলে প্রচুর স্থায়ী চাকরি সৃষ্টি হতে পারত।

ইব্রাহিম মণ্ডল, উত্তর ২৪ পরগনা

আরও পড়ুন