শিশির রায়ের ‘আমরা কিছু করব না?’ (২২-২) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। প্রবন্ধকার বাঙালিদের বাংলাভাষা চর্চার প্রতি কয়েক দশক ধরে অনীহার কারণ হিসেবে ‘না চাইতেই হাতে পেয়ে যাওয়া’-কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু উল্টো দিকে আছে বিগত কয়েক দশক ধরে এই বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত আমূল পরিবর্তনের এক অমোঘ প্রভাব। যে শহর কলকাতা এক সময় বাংলাভাষা ও সাহিত্যচর্চার পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিল, সেই শহরেই মাতৃভাষার প্রতি আজ তীব্র বৈরাগ্য কেন?
যে কোনও ভাষার চর্চাকে ত্বরান্বিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, এ রাজ্যে পূর্ববর্তী জমানায় ইংরেজি চালু না-হওয়ার জন্য আমরা যেমন হাপিত্যেশ করেছি, তেমনই বিগত কয়েক বছরে রাজ্য জুড়ে দেখেছি একের পর এক সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলের উঠে যাওয়া, শিক্ষকের অভাবে স্কুলগুলির ধুঁকতে থাকা। স্কুলে শিক্ষকই যদি না থাকে, তবে ভাষাশিক্ষার পাঠ হবে কী ভাবে? এ ছাড়া, এক দিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমহ্রাসমান, অন্য দিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। যে সব মধ্যবিত্ত, দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুলচাকরির স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করত, তারা যখন আজ চোখের সামনে শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি, নিয়োগ জটিলতা, যোগ্যদের চাকরি চলে যাওয়ার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত দেখছে, তখন তাদের মানসিক অবস্থা সহজে অনুমান করা যায়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের পড়ুয়াদের মধ্যে তীব্র অনীহা লক্ষণীয়। কয়েক বছরে এ রাজ্যে বহু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সে সব জায়গায় পড়াশোনা করার জন্য ছাত্রছাত্রী কোথায়? বেশির ভাগ আসন খালি পড়ে থাকে। ক্লাস রুম খাঁ খাঁ করে। অথচ এক সময় এই সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের লাইন পড়ে যেত। আজ তাদের মুখেই শুনতে পাই— ‘উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই বা কী হবে?’
সবচেয়ে দুঃখের কথা, বাংলাভাষাকে আজও আমরা কাজের ভাষায় পরিণত করতে পারিনি। কেন বছরের পর বছর বাংলাকে ইংরেজি, হিন্দির সঙ্গে লড়তে হবে? এ জন্য আমরা নিজেরাই কি দায়ী নই? আক্ষেপ হয়, যে বাংলাভাষার চর্চা করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন, সেই ভাষার সঙ্গে আমবাঙালির সখ্য আজও তৈরি হয়নি। মাতৃভাষাকে পরম মমতা এবং যত্ন দিয়ে চর্চা ও চর্যা করা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্য, পশ্চিমবঙ্গে সেই কাজে বহু ত্রুটি থেকে গেল।
অরুণ মালাকার, কলকাতা-১০৩
অবক্ষয়
শিশির রায়ের প্রবন্ধ ‘আমরা কিছু করব না?’ সম্পর্কে কিছু কথা। এ কথা সত্যি যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মধ্যে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় বা নিজের শিকড়ের প্রতি টান তেমন নেই। সেই অর্থে এর কোনও কারণ দৃশ্যমান না হলেও, তার বহিঃপ্রকাশ প্রতিনিয়তই দেখা যায়। পরকে আপন করে নেওয়া আর পরের নকল করার মধ্যে যে একটা হালকা ব্যবধান আছে, সেটাই মনে হয় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির অজানা। মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা শেখা খারাপ তো নয়ই, বরং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত উপযোগী। অর্থকরী ও ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার দিক দিয়ে দেখতে গেলে ইংরেজি ও হিন্দির উপযোগিতা ক্রমবর্ধমান। এর রাজনৈতিক কারণ ও বাধ্যবাধকতা যাই হোক, বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে এটাই বাস্তব। পশ্চিমবঙ্গে বাংলার প্রতি অনীহার অন্যতম কারণ হল প্রশাসনের অবহেলা। অন্যান্য অ-হিন্দিভাষী রাজ্যে প্রশাসন যে-ভাবে সেই রাজ্যের ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করে, এই বাংলায় সেটা হয় না বললেই চলে। তবে, শুধুমাত্র এটাই পশ্চিমবঙ্গবাসীর মাতৃভাষাকে অবহেলা করার যৌক্তিক কারণ হতে পারে না।
আমাদের অনেকে নিজের সন্তানদের কেন বাংলা পড়াই না? কেন বাঙালি সর্বসমক্ষে বাংলা বলতে হীনম্মন্যতায় ভোগে? সঠিক কারণ খুঁজে বার করা মুশকিল। প্রবন্ধকার বলেছেন, আমরা খুব সহজেই ভাষাটা পেয়ে গিয়েছি, কোনও রকম ত্যাগস্বীকার না করেই। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ অনুভব করি না। আর একটা কারণ হল, প্রশাসনিক কাজে যত দিন না বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক করা হবে, তত দিন বাংলা ভাষা নিজরাজ্যেই ব্রাত্য হয়ে থাকবে। কোনও জাতির ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, অর্থাৎ জাতির প্রতি দিনের যাপন তার সংস্কৃতি। যখন সংস্কৃতির অবক্ষয় হয়, তখন প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে। বাঙালির নিরুত্তাপ মনোভাব বাংলাভাষা-কৃষ্টির অবক্ষয়ের জন্য সমান ভাবে দায়ী। এই অবক্ষয় বাঙালি জাতিকে পিছিয়ে দিতে দিতে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। তথাকথিত বাঙালি ভদ্রলোকের নিজের সংস্কৃতির প্রতি নির্লিপ্তি অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি
প্রকৃত চর্চা
‘আমরা কিছু করব না?’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। ‘বাংলাটা ঠিক আসে না!’ কবিতায় ভবানীপ্রসাদ মজুমদার লিখেছেন— “...ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক/ হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক/ বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না/ জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।”
প্রবন্ধকার শেষের বাক্যে বলেছেন, “...আমাদের চতুর্দিকেও এখন বাংলা ভাষানদীর পাড় ভাঙার অবিরল শব্দ, আমরা কিছু করব না?” ভাষা দুই প্রক্রিয়ায় সমাজের স্রোতে ভাসমান। কথ্য এবং লিখিত রূপে ভাষার চর্চা প্রতিনিয়ত একটি ভাষাকে পুষ্ট করে চলে। আবার এই চলার পথেই একটি ভাষার সঙ্গে নানা বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণ হয় এবং এ ভাবেই ক্রমশ একটি ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হওয়ার নয়। পশ্চিমবঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক যে বাংলাভাষা কথ্য এবং লিখিত রূপে আমরা ব্যবহার করি, এবং সংবাদপত্রগুলিতে যে বাংলা সাধারণত প্রচলিত, সেই ভাষাকেই আমরা শুদ্ধতার মানদণ্ড হিসাবে ধরি। অথচ দক্ষিণবঙ্গ-উত্তরবঙ্গ মিলিয়ে বাংলাভাষার লিখিত এবং কথ্যরূপ বিবিধ। ভাষার প্রতি সদর্থক কিছু করতে হলে শুধুমাত্র ভদ্রবিত্তের বাংলাকে সঙ্গী করলে চলবে না। কারণ, অর্থনৈতিক দিক থেকে উচ্চে অবস্থিত এক শ্রেণির বাঙালির নব্য প্রজন্ম আজ ‘বাংরেজ’-এ পরিণত। এঁদের এক বড় সংখ্যক নিজের মাতৃভাষাটিকে সঠিক রূপে শেখে না, আবার যথাযথ রূপে বিদেশি ভাষাটিকে আত্মস্থ করতে পারে না।
যাঁরা বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে ভালবেসে তাকে বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের ভাষা হিসেবে শ্লাঘা বোধ করেন, এবং ভাবপ্রকাশের মাধ্যমে আত্মতৃপ্ত হন, তাঁদের প্রতি সমাজের সম্ভ্রম প্রদর্শন মাতৃভাষাকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রূপে প্রতিভাত হতে পারে। তাই বাঙালি হিসাবে চলনে-বলনে-মননে প্রাথমিক ভাবে প্রতিনিয়ত বঙ্গীয় সংস্কৃতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়া একান্ত কাম্য। ভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মাতৃভাষাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ‘গ্ল্যামারলেস’ বাংলার জায়গায় বিদেশি শব্দ গুঁজে নিজেদের অধিক যুগোপযোগী করে তোলার মাধ্যমে আর যা-ই হোক, মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা যায় না।
সঞ্জয় রায়, হাওড়া
পার্কিং জট
ইদানীং কলকাতার রাস্তাঘাটে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর প্রবণতা খুবই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সঙ্কীর্ণ রাস্তাগুলিতে ম্যাটাডোর, বাইক ইত্যাদি ফেলে রাখায় পরিস্থিতি দুর্বিষহ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক, অ্যাম্বুল্যান্সের মতো জরুরি পরিষেবাও এতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বর্তমান আইন থাকা সত্ত্বেও এর যথাযথ প্রয়োগ হয় না। এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা করা জরুরি।
বিজুরিকা চক্রবর্তী, দমদম, কলকাতা