সাম্প্রতিক আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পর পর দু’টি দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় জনমানসে নিঃসন্দেহে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে (অপরাধী, ২৪-৩)। অনস্বীকার্য যে, সরকারি হাসপাতালে প্রতি দিনের রোগীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। রাজ্যের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ চিকিৎসা পরিষেবার জন্য সরকারি হাসপাতালের উপরেই নির্ভর করেন। এখানে অনেক যুগান্তকারী চিকিৎসারও নজির আছে। কিন্তু আসল সমস্যা অন্য। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে পরিকাঠামোর অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু যাঁরা এই পরিষেবার কুশীলব, অর্থাৎ চিকিৎসক এবং নার্সদের পক্ষে একটি হাসপাতালের পরিকাঠামোর প্রত্যক্ষ দেখাশোনা করা সম্ভব নয়। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার এক নিকটবর্তী আত্মীয় কলকাতার নামকরা হাসপাতালে থাকাকালীন এক রাতে বেসিন ভেঙে গোটা কেবিন জলময় হয়ে পড়ে। তিনি যখন নার্সদের কাছে যান, তাঁকে বলা হয় বারান্দায় চাদর পেতে শুয়ে পড়তে এবং এটি অন্য বিভাগের কাজ।
মনে করি, প্রত্যেকটি রাজ্য স্তরের হাসপাতালের পরিকাঠামোর সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন দফতরের কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ দলের সারা দিন হাসপাতালে থাকা প্রয়োজন। বেসরকারি প্রত্যেকটি হাসপাতালে তা আছে। নিরাপত্তা রক্ষীকে দিয়ে যদি লিফ্ট সারাইয়ের কাজ করানো হয়, তা হলে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। যে কোনও সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সূচক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, স্বাস্থ্য পরিষেবার মূল উদ্দেশ্য হল প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা। উল্লেখ্য, এখনও সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালগুলিতে ঝাঁ-চকচকে বিল্ডিং আছে, কিন্তু স্বাস্থ্য পরিষেবা উপেক্ষিত। মূল অভাব হল সমন্বয়ের। এক সময় ন্যাশনাল হেলথ মিশন থেকে প্রচুর অর্থানুকূল্য পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে প্রচুর যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। কিন্তু উপযুক্ত টেকনিশিয়ান না থাকার কারণে সেগুলির একাংশ ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য দফতরে পনেরো দিন অন্তর পরিকাঠামোগত অবস্থার পরিদর্শন অবশ্যই কাম্য।
সুবীর ভদ্র, কলকাতা-১৫১
অসহায় মৃত্যু
কলকাতায় আর জি কর-এর মতো একটি প্রথম সারির সরকারি হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক-পড়ুয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শাসক দলের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ রাজপথে আছড়ে পড়েছিল। আশা করা গিয়েছিল, যে অব্যবস্থা, অনিয়ম ও সীমাহীন ঔদাসীন্য সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে, শাসক দল আগামী দিনে তা দূর করতে আন্তরিক ভাবে সচেষ্ট হবে। কিন্তু বিগত দেড় বছরে যে অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি, তা ফের প্রমাণিত হল চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা দক্ষিণ দমদমের তরুণের লিফ্টের ত্রুটিতে ও ভারপ্রাপ্ত কর্মীদের চরম অবহেলা ও অসহযোগিতায় মৃত্যুর ঘটনায়। যে শিশুটি শৈশবেই তার পিতাকে হারাল, দাম্পত্য জীবনের গোড়াতেই যে স্ত্রী তাঁর স্বামীকে হারালেন, জীবনের প্রান্তবেলায় পৌঁছনো যে পিতামাতা সন্তানহারা হলেন, তাঁদের যন্ত্রণা, হাহাকার উপলব্ধি করার মতো ক্ষমতা বর্তমান শাসক দলের নেতা-নেত্রীদের নেই। যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতা হাতে রাখাই তাঁদের মূল মন্ত্র। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, অন্যায় অবিচার যা-ই হোক না কেন, ভোটে জেতাই মোক্ষ। তাই তাঁরা সচেতন ভাবেই সব অন্যায়, অনিয়ম ও অব্যবস্থা দেখেও চোখ কান বুজে থাকেন। এই ব্যাপারে ঘুমন্ত স্বাস্থ্য দফতরের লজ্জাজনক ভূমিকার কথা উল্লেখ না করাই ভাল। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এত ত্রুটি, অনিয়ম, গাফিলতি দেখেও সুষ্ঠু পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে এ রাজ্যের সরকার এত দিনেও এক জন পূর্ণ সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করতে পারল না কেন, সেটি বিস্ময়কর।
সমীর কুমার ঘোষ, কলকাতা-৬৫
অমানবিক
লিফ্ট বিপর্যয়ে দক্ষিণ দমদমের এক বাসিন্দার মর্মান্তিক মৃত্যুর ৭২ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ট্রমা সেন্টারের শ্বাসকষ্টের এক রোগীর মৃত্যুতে প্রমাণ হয়ে গেল— আর জি কর আছে আর জি করেই। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে এই হাসপাতালের এক চিকিৎসকের নির্দেশমতো ওই রোগীকে হাঁটিয়ে সুলভ শৌচাগারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় পথেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যু হয়। এই দুই মৃত্যুর দায় অবশ্যই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এগুলি চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রশ্ন জাগে, সরকারি হাসপাতালে ঢুকলে কি সাধারণ মানুষের প্রাণের কোনও মূল্য নেই? হাসপাতালে লিফ্ট যে খারাপ ছিল, সেটা যদি লিফ্টের সামনে লেখা থাকত, তা হলে হয়তো এই মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো যেত। মার্চ মাসের গোড়ায় নাকি ওই লিফ্টের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। তা হলে লিফ্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যে সংস্থার হাতে, তারা কি সঠিক ভাবে পরীক্ষা করেছিল? সাধারণত লিফ্টের বাইরে আলাদা মেশিনঘর থাকে। লিফ্টে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়লে ওই ঘর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তা হলে দুর্ঘটনার দিন যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানা সত্ত্বেও কেন তা নিয়ন্ত্রণ করা গেল না? অন্য ঘটনায় রোগীকে যে চিকিৎসক হাঁটিয়ে শৌচাগারে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, প্রয়োজনে তাঁকেও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত কি না ভাবতে হবে।
রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
গভীর সঙ্কট
কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে কয়েক দিন আগে লিফ্ট-দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যুর প্রায় পর পরই অন্য এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের অব্যবস্থা ও অসহযোগিতার চিত্র সামনে এল। চিকিৎসায় তিনি একটু স্থিতিশীল হওয়ার পর তাঁর শৌচালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ট্রমা সেন্টারের একমাত্র শৌচালয়টি তালা বন্ধ অবস্থায় ছিল। যে রোগী গুরুতর অসুস্থ, তাঁকে হাঁটিয়ে দূরের শৌচালয়ে নিয়ে যাওয়ার পথেই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। প্রশ্ন উঠছে, এত গুরুতর অসুস্থ এক জন রোগীকে কেন বেড প্যান দেওয়া হল না? কেন স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হল না? হাসপাতালের নিজস্ব শৌচালয়টি কেন ব্যবহারযোগ্য রাখা হয়নি? সামান্য মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ দেখানো হলে হয়তো এই অকালমৃত্যু এড়ানো যেত। এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর কাহিনি নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সঙ্কটের প্রতিফলন, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও পরিকাঠামোগত ঘাটতির একটি নির্মম উদাহরণ। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
অপূর্বলাল নস্কর, ভান্ডারদহ, হাওড়া
গাফিলতি
কর্তব্যরত চিকিৎসক-পড়ুয়ার মৃত্যুর পর শুধু বাংলা নয়, সারা দেশ বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়েছিল। সেই আর জি করেই সম্প্রতি লিফ্টের মধ্যে আটকে থেকে এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। কোনও প্রতিষ্ঠানের ভাল-মন্দ, পরিষেবা নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারী-সহ প্রশাসকদের উপরেই। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, দেড় ঘণ্টা লিফ্টে আটকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করা হলেও যথাসময়ে সাহায্য মেলেনি। লিফ্টটির মেরামতির কাজ চলছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তা হলে সেটি কী ভাবে রোগী ও পরিজনদের জন্য খোলা থাকল? উপযুক্ত নজরদারি নেই কেন? যে হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এক সময় এই রাজ্যের মুখ পুড়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানেই কর্তব্যে এমন গাফিলতি ক্ষমার অযোগ্য।
দেবদর্শন বন্দ্যোপাধ্যায়, রানাঘাট, নদিয়া