West Bengal Election 2026

‘নাম বাদ গেলে ফের বিষ খাব’

খইরুল মরেননি। কোচবিহার হাসপাতালে ১২ দিন যমে-মানুষে টানাটানির পরে ফিরে এসেছেন সংসারে। শরীর ভেঙে গিয়েছে। তবে এখন মাথার উপরে ঘন কালো মেঘের মতো ছেয়ে আছে একটি শব্দ: বিবেচনাধীন।

দেবাশিস চৌধুরী
শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪৪

—প্রতীকী চিত্র।

সরু গলি দিয়ে পৌঁছতে হয় ঘরের দরজায়। সে ঘরে পাশাপাশি দু’জন দাঁড়ালে নড়াচড়ার জায়গা নেই। পাশের ঘরটি আয়তনে সামান্য বড়। তাতে ঠাসাঠাসি আলমারি, বিছানা, টিভি... সব কিছু। এই দুই কামরায় সংসার করতেন বাষট্টি বছরের গৌরাঙ্গ দে। এখন আর এই সব ঘরগেরস্থালিতে তাঁর প্রয়োজন নেই।

৪ মার্চ দোলের দিন সকালে এরই একটি ঘরে ঝুলছিল তাঁর দেহ।

এর থেকে আড়াই মাস মতো পিছিয়ে গেলে দেখা মিলবে খইরুল শেখের। তিনিও ষাট পেরিয়েছেন। গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত শক্তপোক্ত শরীর ছিল। পেটে বিদ্যে নেই। গায়ে-গতরে খেটে রোজগার করতেন। কখনও ভ্যান চালাচ্ছেন, কখনও করছেন দিনমজুরি। এক দুপুরে তিনি কীটনাশকের বোতল থেকে ঢক ঢক করে গলায় ঢেলেছিলেন বিষ। সেটা ছিল ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর।

তবে খইরুল মরেননি। কোচবিহার হাসপাতালে ১২ দিন যমে-মানুষে টানাটানির পরে ফিরে এসেছেন সংসারে। শরীর ভেঙে গিয়েছে। তবে এখন মাথার উপরে ঘন কালো মেঘের মতো ছেয়ে আছে একটি শব্দ: বিবেচনাধীন। এখনও তাঁর মাঝেমাঝে মনে হয়, আবার বিষ খেয়ে সব জ্বালা জুড়িয়ে দিই!

জলপাইগুড়ির নয়াবস্তির বাসিন্দা গৌরাঙ্গ কিন্তু দিনহাটার বুদিরহাট পঞ্চায়েতের জিৎপুর গ্রামের খইরুলের মতো প্রথমেই হার মানেননি। এক বসন্তের দুপুরে সেই অপরিসর ঘরে বসে গৌরাঙ্গের স্ত্রী পপি দে বলছিলেন, “ওঁর বাবা মারা গিয়েছেন ছোটবেলায়। টানাটানির সংসারে মা ছেলেকে বেশি দূর পড়াতে পারেননি।” তাই স্কুল পাশের শংসাপত্র ছিল না গৌরাঙ্গের। নামও ছিল না ২০০২ সালের তালিকায়। “তবু তো আমরা এখানকার মানুষ,” বলছিলেন পপি। “উনি বলতেন, জন্ম-কর্ম এখানে। এত বার ভোট দিয়েছি। তা হলে নাম থাকবে না কেন?”

চিন্তিত খইরুল শেখ।

চিন্তিত খইরুল শেখ। ছবি: নমিতেশ ঘোষ।

কিন্তু নাম নেই তো নেই-ই। তিন বার চেষ্টা করেছেন। মোমো, চাউমিনের একটা দোকান চালাতেন গৌরাঙ্গ। তা থেকেই যা রোজগার হত, তাতে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে কিছুটা লেখাপড়াও শিখিয়েছেন। নিজের সেই ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে গিয়েছিলেন নথি হিসেবে দিতে। পপি বলেন, “আমাদের বলা হল, ওটা ১৯৯৩ সালের নথি। ওঁর লাগবে ১৯৮৩ সালের নথি।” বাবা-মায়ের কোনও নথি নেই। বাকি রইল ভোটার আর আধার কার্ড। সে সবই দিয়েছিলেন গৌরাঙ্গ, জানাল তাঁর পরিবার। কিন্তু নাম উঠল না।

পপি নিজের বাপের বাড়ি থেকে বাবার পরিচয়পত্র এনেছিলেন। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারি যে তালিকা বার হয়, সেখানে তাঁর, ছেলেমেয়ের নাম ছিল। কিন্তু গৌরাঙ্গ নেই। “সে দিন থেকেই মনমরা। বলছিলেন, আমার নাম যদি না থাকে, তা হলে ছেলেও তো বিপদে পড়তে পারে। বাবার পরিচয়েই তো ছেলের পরিচয়।” স্থানীয় কাউন্সিলরের তাগিদে ফর্ম ৬ জমা করা হয়েছিল। “সে দিন বার বার বলছিলেন, ধুর, আর দেব না। ঘর-বার করছিলেন। চাপা স্বভাবের মানুষ। রাতে দেখি, মন খুব খারাপ। একটু খেয়েই উঠে পড়লেন। নিঃশব্দে চোখ মুছলেন। এক বার বললেন, যদি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়!” পাশের ঘরে ছেলেকে নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলেন পপি। বললেন, “সকালে ঘরে ঢুকে দেখি এই কাণ্ড! ষাট-বাষট্টি বছর বয়স হয়ে গিয়েছে, তার পরেও এমন করবেন, ভাবতে পারিনি।”

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পর্ব শুরুর পর থেকেই এই প্রশ্নগুলি উঠছিল। নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত নথিগুলি যে সাধারণ, প্রান্তিক, খেটেখাওয়া এবং মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরনো মানুষদের জন্য যথেষ্ট নয়, সাধারণ ভাবে ভোটার, আধার বা রেশন কার্ডের মতো নথিগুলিই যে এই সব মানুষ নিজেদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন বলে মনে করেন, সেটা অনেক বারই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল। এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্টে এই নিয়ে সওয়াল করেছিল বিরোধী দলগুলি। কিন্তু কমিশন বরাবরই দাবি করেছে, এই সব নথিকে মর্যাদা দিলে এমন অনেকে ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়তে পারে, যারা আসলে বৈধ ভোটার নয়। কিন্তু উল্টো দিকে, বৈধ ভোটারও যে বাদ পড়তে পারেন অনেকাংশে, সে দিকে নজর আদৌ দেওয়া হয়েছিল কি?

কমিশনের হিসাব, ভুয়ো, মৃত, স্থানাস্তরিত ভোটার মিলিয়ে প্রায় ৫৮ লক্ষের কোনও হদিস মেলেনি এসআইআর-এর প্রথম পর্বে। যদিও বিরোধী দলগুলি এর পরে একাধিক এমন ভোটারকে সামনে আনে, যাঁদের মৃত বলে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরে ম্যাপিং-এ মেলেনি এমন ৩২ লক্ষ ভোটারকে নোটিস পাঠায় কমিশন। একই সঙ্গে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির দায়ে আরও ১ কোটি ২০ লক্ষকে শুনানিতে ডাকা হয়। এর মধ্যে নামের বানানে অসঙ্গতি থেকে শুরু করে যাঁদের ছ’টি সন্তান, যাঁদের ক্ষেত্রে মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম ইত্যাদি শর্ত রাখা হয়। যদিও এগুলির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেমন প্রশ্ন উঠেছে, যাঁর বাবা-মা অল্প বয়সে মারা গিয়েছেন, মাধ্যমিক পাশ করেননি, দিনমজুরি বা দোকানদারি করে সংসার টানেন, কোনও জমিবাড়ি নেই, অথচ এত দিন ভোট দিয়েছেন— এমন মানুষ নিজেকে বৈধ ভোটার হিসেবে প্রমাণ করবেন কী ভাবে?

দিনহাটার খইরুল এবং জলপাইগুড়ির গৌরাঙ্গ শুধু দু’টি উদাহরণ মাত্র। আদতে বহু মানুষ এই দলে রয়েছেন। কেন ভয় পেয়েছিলেন? কিসেরই বা ভয়? খইরুল বলছিলেন, “ভয় কী সাধে পেয়েছিলাম! নামের বানানে ভুল ছিল। মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে পাঠাবে। ক্যাম্পে রাখবে। বিজেপি তো বার বার বলছিল। ওরা যদি সরকারে আসে, অনেক কিছুই করতে পারে।”বিজেপি ক্ষমতায় আসবে? “আসবে না কেন? যাঁদের নাম এই অঞ্চলে বাদ গিয়েছে, সবই তো তৃণমূলের ভোট।” বলছিলেন খইরুল। তাঁর নাম বিবেচনাধীন। তাঁর স্ত্রী আমিনা বিবির নাম শেষ পর্যন্ত তালিকায় উঠেছে। “যদি এ বারেও আমার নাম না ওঠে,” চুপ করে গেলেন খইরুল। টিনের চালে ছাওয়া হতদরিদ্র ঘরটির ছোট বারান্দায় কাপড় দিয়ে বাঁধা চেয়ারে বসে বাড়ির পিছনের এক ফালি জমির দিকে তাকিয়ে রইলে এক দৃষ্টে। চোখ ছলছল করে এল প্রৌঢ়ের। একটু সামলে নিয়ে বললেন, “নাম না থাকলে আবার ওষুধ (কীটনাশক) খেতে পারি!”

গৌরাঙ্গ দে।

গৌরাঙ্গ দে।

উঠোনে বসে তাঁর একমাত্র মেয়ে। আমিনা বলেন, “ও মানসিক প্রতিবন্ধী।” সে চিকিৎসার খরচ কোথা থেকে জোগাবেন, ভেবে কূল করতে পারেন না খইরুল। আমিনা বলে চলেন, “দু’জনে হাজার টাকা করে বার্ধক্য ভাতা পাই। আর মেয়ে পায় প্রতিবন্ধী ভাতা। এতে কি চলে? ওষুধ খাওয়ার পর থেকে তো ওঁর কাজকর্ম বলতে গেলে বন্ধই।”“ওঁর মোমো-চাউমিনের দোকানটা তো বন্ধ হয়ে গেল। ছেলে আরএকটা দোকানে ফাইফরমাশ খাটে। তাতে কি সংসার চলে? ভাড়া দিতে না পারলে বাড়িওয়ালা তুলে দেবে। কোথায় যাব তখন?” বলছিলেন গৌরাঙ্গের স্ত্রী, পপি।

তোতাকাহিনির মতো নিয়মের নিগড়ে বাঁধা কমিশন তার নিজস্ব পথ থেকে সামান্য সরতেও নারাজ। ভাবটা এমন যে, ভোটার মরে মরুক, নিয়মের নড়চড় যেন না হয়। সামান্য বিচ্যুতি হলে তার আঙুল ওঠে বিএলও, ইআরও, এইআরও-র দিকে। এখন প্রতি কথায় আদালত। এরই মধ্যে মরে যেতে থাকেন গৌরাঙ্গ, বাপ্পা মণ্ডল, সুভাষ বর্মণরা।

(চলবে)

আরও পড়ুন