অভিরূপ মুখোপাধ্যায় ‘প্রেমে থাকার আনন্দ’ (১৪-২) প্রবন্ধে প্রেমের স্বরূপ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। প্রেম আর মোহ কিন্তু এক নয়। মোহ হয় তাৎক্ষণিক, কিন্তু প্রেম অবিনশ্বর। তা হলে প্রেম ভেঙে গেল— এ ঘটনা কী ভাবে সম্ভব? যে প্রেম ভাঙে, সে প্রেমই নয়। প্রেম কোনও চুক্তি নয় যে চুক্তি ভঙ্গ হলেই প্রেম ভঙ্গ হবে। আসলে প্রেম হল শর্তহীন ভালবাসা।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্পগুলি দেখায়, প্রেমে জাত, পাত, বৈধব্য বা বয়স— কোনও কিছুই অন্তরায় হয় না। তাই তো বিধবা মেয়ে রমা শেষ পর্যন্ত মাথায় কলঙ্ক নিয়ে রমেশের প্রতি অব্যক্ত প্রেম বুকে নিয়েই চলে যায় নির্বাসনে। তার প্রেমিকও তাকে ভুল বোঝে। রাজলক্ষ্মীও শ্রীকান্তের প্রতি তার প্রেম নিবে যেতে দেয় না। আর দেবদাস শাশ্বত প্রেমিক হয়েই রয়ে গেল।
লালন ফকিরের প্রেম তো দেহাতীত। প্রেম মানেই যে নর-নারীর প্রেম— সেটাও আংশিক প্রেম। পূর্ণ প্রেম কী, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। গফুর জোলার মহেশের প্রতি ভালবাসা কি প্রেম নয়? রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’ গল্পে বলাইয়ের শিমুল গাছটির প্রতি ভালবাসাও কিন্তু প্রেমেরই প্রকাশ। রাধা–কৃষ্ণের প্রেম তো স্বর্গীয়। আর মহাপ্রভুর সবার জন্য যে প্রেম, তারই বা কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায়? জগাই-মাধাইকেও মহাপ্রভু প্রেমের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে তো ছিল না কোনও শর্ত।
বিনা কারণে যদি ভালবাসা যায়, সেটাই প্রেম। প্রেমের কোনও নিয়ম নেই যে এটা হলেই ওটা হবে। যাকে ভালবাসলাম, সে হয়তো সারা জীবন জানতেই পারল না। অর্থাৎ প্রেম যে উভয়মুখী হবেই, তা নয়; একতরফা প্রেমও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে। কেউ তার আরাধ্য দেবতাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে, বিনিময়ে কিছু চায় না, শুধু ভালবাসে। হাজার অক্ষর দিয়েও প্রেমকে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রেম কেবল অনুভবের, হৃদয় দিয়ে অনুভব করার।
সর্বানী গুপ্ত, বড়জোড়া, বাঁকুড়া
হৃদয়ের বন্ধন
অভিরূপ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রেমে থাকার আনন্দ’ প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে কিছু লিখতে চাই। বিবাহিত জীবনের প্রথম পর্বটাতে আবেগ, ভাললাগা ও বাসনা জড়িয়ে থাকে। আর শেষ ভাগে থাকে অটুট বন্ধন— পারস্পরিক নির্ভরতার বন্ধন। পাকা খয়েরের মতো জমাট সেই ভালবাসার বন্ধন।
বর্তমান জেট গতির যুগে প্রেমেরও গতি বেড়েছে। ভাললাগা ভালবাসায় পরিণত হওয়ার আগেই কখনও প্রেমিকের পিস্তলের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হস্টেলে থাকা প্রেমিকার বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। আর্তনাদ, রক্তক্ষরণ, আত্মহনন— সব মিলিয়ে সলিলসমাধি বর্তমান ‘ইনস্ট্যান্ট’ প্রেমের। তবে প্রেমের একটি বড় অধ্যায় যে বিরহ, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অপাঙ্ক্তেয়। গানের কলিতে আছে “ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী/ তোমারই দুয়ারে কুড়াতে এসেছি ফেলে দেওয়া মালাখানি।” এই দর্শন অথবা— “বিরহ বড় মধুর লাগে”— এই আর্তি, এই আর্তনাদের সুর, বিরহব্যথার সুখানুভূতির স্বাদ আজকের প্রজন্মের কাছে যেন বোকামি। অথচ পার্বতী ও দেবদাসের কাহিনিতে এই বিরহই দেবদাস উপন্যাসকে কালজয়ী করেছে।
বাস্তব জীবনেও প্রেমের এমন দৃষ্টান্ত কম নেই। গ্রামের মানুষ দশরথ মাঝি তাঁর স্ত্রী ফাল্গুনী দেবীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ বাইশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন, যা স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালবাসার এক অনন্য নিদর্শন। আবার ওড়িশার ভুবনেশ্বরের বাসিন্দা দানা মাঝি স্ত্রীর মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে কোনও গাড়ি না-পেয়ে স্ত্রীর দেহ কাঁধে তুলে দীর্ঘ দশ কিলোমিটার পথ হেঁটেছিলেন। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা মনে পড়লে মন বলে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কত গভীর, কত দায়বদ্ধ, কত নিষ্পাপ ভালবাসায় ভরা!
লেখার ইতি টানব গতিময় সময়ের আর একটি ঘটনার উল্লেখ করে। পিতা-মাতার শরীরে যখন বার্ধক্য বাসা বেঁধেছে, তখন দুই প্রতিষ্ঠিত পুত্রের এক জন পিতাকে নিয়ে সপরিবারে বেঙ্গালুরুবাসী, আর অন্য পুত্র মাকে নিয়ে আমেরিকানিবাসী। এক বারের জন্যও কি সেই দুই পুত্রের মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল না— বাবা-মা কোনও দামি অলঙ্কার নন, ঘর সাজানোর বস্তু নন। তাঁরাও মননশীল মানুষ। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী, একে অপরের পরিপূরক, পরম বন্ধু, ভালবাসার দোসর; হাসি-কান্না, রৌদ্র-ছায়া আর স্মৃতিমেদুরতার শেষ পারানির সহযাত্রী।
রাজীব ঘোষ, কুসুমদিঘি, বাঁকুড়া
সংজ্ঞা বদলায়
অভিরূপ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রেমে থাকার আনন্দ’ শীর্ষক লেখাটি বেশ লাগল। মানুষ পার্থিব অনেক বস্তুর মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায়, অনেক সম্পর্কের মধ্যেও। বলতে গেলে বেঁচে থাকার তাগিদেই সেই আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
দিয়া ছ’মাসের প্রেমের বিয়ে ভেঙে ফিরে এসে ঠাম্মা–ঠাদার ষাট বছরের বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপনে মেতে ওঠে। সে জিজ্ঞেস করে, “তোমাদের দীর্ঘ, অটুট বন্ধনের রসায়নটা কী, বলতে পারো?” তাঁরা বলেন, ধৈর্য, সহ্যশক্তি, ছোট ছোট ভুল একে অন্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, মেনে নেওয়া; আর সর্বোপরি ভালবাসা— ভাললাগার আনন্দে একে অপরকে ভাসিয়ে দেওয়া।
বহমান জীবনের সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী, ক্ষণিকের অতিথি। মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম ছাড়াও মানুষ আনন্দ খুঁজে নেয় পার্থিব অন্য সান্নিধ্যের মধ্যেও। সেটাও প্রেম, সেটাও ভালবাসা। চৈতন্যদেব মৃত্তিকার ধূলিরেণু সিক্ত করেছিলেন প্রেমাশ্রুতে। তাই বলা হয়েছে— “আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম,/ কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।” প্রেম জাগতিক, প্রেম পার্থিবও বটে।
ভালবাসা যখন চাহিদা প্রকাশ করে, তখন ভালবাসার মৃত্যু ঘটে— পরিণয়ের সূত্রেও কি তাই? না। জীবন বলে, প্রকৃত ভালবাসার দেনা-পাওনা তখন শতধারায় বিকশিত হয়। ভালবাসার সংজ্ঞা সেখানে বদলে বদলে যায়।
পুরনোকে ভুলে যাওয়া কি এত সহজ? শুধু দূর থেকে ভালবেসে যাওয়া যায়। ভালবাসতে সম্মতি লাগে না। জানি, তার গল্পের সেরা মানুষটা হয়তো হতে পারব না। তবু স্মৃতির কপাট খুলে কোনও একদিন সে হয়তো বলবে, সেই মানুষটা সেরা ছিল কি না জানি না, তবে তার হৃদয়টা অন্য রকম ছিল।
অনিতা চৌধুরী, শ্রীরামপুর, হুগলি
লুকিয়ে আছে
‘প্রেমে থাকার আনন্দ’ শীর্ষক অভিরূপ মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা।শঙ্খ ঘোষ আলোচনা করেছেন, সমাজের সঙ্গে সংযুক্ততা, সমাজ-সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিকতা— এগুলিই রবীন্দ্রনাথের রচনার একমাত্র দিক নয়। এই সমাজের বাইরেও তাঁর প্রত্যেকটি রচনায় আছে একটি ‘ব্যক্তি’র কথা, একটি ‘আমি’র কথা— ‘আমি’র মুক্তির কথা। রক্তকরবীতে পেষণের চেহারা আছে, এ যেমন সত্য, তেমনই সেখানে এক অদ্ভুত ভালবাসার কথাও আছে। নন্দিনীর যে সম্পর্ক রাজার সঙ্গে, বিশুর সঙ্গে, রঞ্জনের সঙ্গে— সেখানে ভালবাসার নানা স্তর ধরা পড়ে। ব্যক্তি ‘আমি’র মুক্তিতেই ভালবাসার এই নানান স্তরের জন্ম।
‘আমি’ থেকে মুক্ত হয়ে বস্তুবাদের হাত ধরে চলা জীবনকে খুঁজে পেতে প্রেমের ফাঁদ পেতে রাখা ভুবনের স্নেহছায়াতেই আশ্রয় নিতে হবে। ভুবনের ভাললাগার প্রতিটি স্তর জুড়েই ছড়িয়ে আছে প্রেম। ক্ষণিকের অতিথি হেমন্তের নাগরিক অদর্শনে হলুদ গোধূলি চোখের আড়ালে খসে পড়লেও, শীতের রুক্ষতার শেষে তন্বী কিশোরীর মতোই চকিত চপলা হয়ে রাঙিয়ে দিয়ে যায় স্বল্পায়ু বসন্ত। মনের বাতায়নে জেগে থাকে সেই প্রেম। ঘৃণা-বিদ্বেষে আচ্ছন্ন এই ভুবন জুড়ে অনুভবের আখরে যার চাহিদা আজ পর্বতপ্রমাণ।
সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া