‘ভোট ঘোষণার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে’ (২২-২) শীর্ষক সংবাদ প্রসঙ্গে এই চিঠি। বিগত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ও অন্যান্য বড় নির্বাচন পরিচালনা করতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মোতায়েন করা হচ্ছে। প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ হাজারের কেন্দ্রীয় বাহিনী ইতিমধ্যেই জেলায় জেলায় পৌঁছতে শুরু করেছে। সমস্যা হল, এঁদের থাকার জন্য স্কুল বিল্ডিংগুলিকেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অধিগ্রহণ করা হয়। এর ফলে বহু স্কুলকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটি ঘোষণা করতে হয়। স্বাভাবিক কারণে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা থেকে মিড-ডে মিল, সব কিছুরই নীরবে অপূরণীয় ক্ষতি হতে থাকে। আগের নির্বাচনগুলিতে এই নিরাপত্তারক্ষীদের দল এক-একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত থেকেছে বলে সংবাদে জানা গিয়েছিল। প্রশাসনকে বহু অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েও নিরাশ হতে হয়েছিল সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণার আগে থেকেই রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠাচ্ছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। প্রশ্ন উঠেছে, এঁদের থাকার জন্য বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কলেজের বদলে সরকারি, বেসরকারি প্রেক্ষাগৃহ, কিসান মান্ডির কথা কি ভাবা যেতে পারে?
এমনিতেই বর্তমানে এ রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নানা কারণে দৈন্যদশায় ভুগছে। উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষক নেই, নেই পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, রয়েছে নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতিও। তার উপর উচ্চ ডিগ্রি সম্পন্ন শিক্ষা লাভ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ না-থাকায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে, যেন সরকার নিজেদের হাত থেকে শিক্ষাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে। তাই ছাত্রছাত্রীদের পড়ার পরিবেশ নষ্ট না করতে প্রশাসনকেই এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ করতে হবে।
শম্ভু মান্না, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
নিস্তারের পথ
কেন্দ্রীয় বাজেট বিষয়ে অমিতাভ গুপ্তের ‘অমৃতকালের নীলনকশা’ (২-২) শীর্ষক উত্তর-সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে বলি, পৃথিবীতে কোনও অনুন্নত দেশ নেই যেখানে বেকারত্ব একটা সমস্যা নয়, আর কোনও উন্নত দেশ নেই যেখানে বেকারত্ব একটা স্থায়ী সমস্যা। উন্নত দেশগুলিতে সাইক্লিক্যাল বা আবর্তমান বেকারত্বের সমস্যা আছে, আর তার ওষুধও রয়েছে— মন্দার সময় সরকারি খরচ বাড়ানো এবং মুদ্রানীতির রাশ আলগা করা। অনুন্নত দেশে বেকারত্ব একটি স্ট্রাকচারাল বা কাঠামোগত সমস্যা। অর্থব্যবস্থায় মন্দা রয়েছে ভেবে বছর বছর রাজকোষ ঘাটতি বাড়ালে মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্কট হয়। সেই অভিজ্ঞতা বহু অনুন্নত দেশের হয়েছে। স্বাধীন ভারতেও ১৯৯১ পর্যন্ত একাধিক বার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অনুন্নত দেশে দ্রুতগতিতে বেকারত্ব দূর করার জাদুকাঠি প্রয়োগে হিতে বিপরীত হয়েছে। উদাহরণ? প্রথম, ‘গ্রোথলেস জব ক্রিয়েশন’ অর্থাৎ অর্থনীতির উন্নয়ন ছাড়াই চাকরি সৃষ্টির প্রচেষ্টা। উৎপাদন না বাড়লে বেসরকারি ব্যবসা এবং শিল্প বাড়তি শ্রমিক নিয়োগ করবে না। কিন্তু, সরকারি প্রশাসন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান তো রয়েছে। সেখানে তো কর্মসংস্থান করা যায়?
সরকারের কাজ প্রশাসন, পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে জনগণকে পরিষেবা দেওয়া— এগুলি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নয়। তা ছাড়া সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংগুলি স্থাপন করা হয়েছিল শিল্পায়ন এবং উন্নয়নের জন্য। তৎকালীন প্ল্যানিং কমিশনের পুরোধা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের আশা ছিল যে, এগুলি থেকে এত উদ্বৃত্ত সরকারের কাছে আসবে যে, করের আর প্রয়োজনই থাকবে না। কিন্তু ফল হয়েছে অন্য রকম। ২০২৩-২৪’এর পূর্ববর্তী চার বছরে প্রতি বছর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ— ৩৬,২১৩ কোটি টাকা থেকে ৫১,৪১৯ কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিল। এই অবস্থায় এই সব সংস্থার মাধ্যমে আরও চাকরি সৃষ্টি করে বেকারত্ব ঘোচানোর পরিকল্পনা কি বিচক্ষণতার পরিচয় হবে?
এ বার এই ২০২৬-২৭’এর বাজেটে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার কথায় আসা যাক। ২০২৫-২৬ সালে জিডিপির মাত্র ৩০.১% মোট স্থায়ী মূলধন গঠন (গ্রোস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন বা জিএফসিএফ) হয়েছে। এর থেকে অনেক বেশি মূলধন গঠন প্রয়োজন। ২০০২ সাল থেকে চিনে জিডিপির অনুপাতে জিএফসিএফ ধারাবাহিক ভাবে ৩৫% বা তার বেশি ছিল, এবং ২০১৩ সালে তা সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। দ্রুত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি খাতে মূলধন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। মোদী সরকারের অধীনে কেন্দ্রের মূলধনি ব্যয় ২০১৪-১৫ সালে ২ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট অনুমানে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ আসে মুনাফার সন্ধানে। সুতরাং, বিনিয়োগকারীদের জন্য ভারতকে কুশল, দক্ষ এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগী মজুরির ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, ম্যানেজার এবং শ্রমিক, পরিকাঠামো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটস, এবং শহর-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা প্রয়োজন, ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তার জন্য প্রয়োজন হয় ধারাবাহিক ও দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার। জিএসটি ২.০, আয়কর আইন ২০২৫, ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস-এর (বিআইএস) আওতায় থাকা কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডারগুলির সংযুক্তিকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সে চেষ্টা চলছে।
কর্মসংস্থানের জন্য আমরা অনেক সময় বিনিয়োগের অভিমুখ সম্বন্ধে বিচলিত হই। প্রশ্ন করি, সরকার বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানমুখী করার জন্য কী করছে? অমর্ত্য সেন তাঁর ‘চয়েস অব টেকনিক’ বা প্রযুক্তি চয়ন বিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আজ যে কৌশল সর্বাধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে, তা যে অবশ্যই সর্বাধিক বৃদ্ধি-বর্ধক কৌশল হবে, এমন নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী পর্যায়ে অম্বর চরকা এবং আধুনিক কারখানা, এই দুই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা চলছিল। অম্বর চরকা দিয়ে সুতো বানালে মূলধন অনেক কম লাগে। কিন্তু, আপাতদৃষ্টিতে এতে কর্মসংস্থান বাড়লেও, সেটা সাময়িক। কারণ, নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি হিসাব করলে, অম্বর চরকায় লোকসান হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, দারিদ্র ও বেকারত্বের সমস্যায় জর্জরিত কোনও উন্নয়নশীল দেশে নীতি প্রণয়নের সময় আয় সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান সর্বাধিককরণের যুগপৎ প্রয়োজনের সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার লক্ষ্যকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বজায় রাখতে হয়।
কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন উন্নয়ন। উন্নয়ন আসবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো ও প্রশাসনের কুশলতার মাধ্যমে। সংবিধানগত ভাবে এগুলি অনেকটাই রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। একই কেন্দ্রীয় বাজেট নিয়ে বিভিন্ন রাজ্য বিভিন্ন গতিতে উন্নয়ন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো পিছিয়ে পড়া রাজ্যে সরকারের প্রয়োজন উন্নয়নের ব্যাপারে তৎপর হওয়া।
অশোক কুমার লাহিড়ী, কলকাতা-১৫৬
জনতার স্বার্থে
সংসদে অধিকাংশ সদস্যই যখন বক্তব্য পেশ করেন, তার মধ্যে জনগণের স্বার্থের বদলে প্রাধান্য পায় তাঁদের দলীয় স্বার্থ। সে দিক থেকে রাজ্যসভার সাংসদ রাঘব চাড্ডা অনেকটাই ব্যতিক্রমী।
তিনি ডেলিভারি ম্যানদের সুপারম্যান না-ভেবে রক্তমাংসের মানুষ ভাবতে বলেছেন। সম্প্রতি তিনি সরব হয়েছেন মোবাইল সংস্থাগুলির গ্রাহক ঠকানো কাজ বন্ধ করার জন্য। পুরো মাসের পরিবর্তে ২৮ দিনের মেয়াদ আর ব্যালেন্স ফুরোলে ইনকামিং কলের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে স্বর চড়িয়েছেন তিনি। সংসদের উভয় কক্ষে এই রকম সাংসদ দরকার যাঁরা শুধুমাত্র নিজের দলের সুবিধা লাভের কথা চিন্তা না করে আমজনতার স্বার্থে সরব হবেন।
অরূপরতন আইচ, কোন্নগর, হুগলি