অভিরূপ সরকারের ‘তৃণমূলের পতন কেন’ (৬-৫) শীর্ষক প্রবন্ধটি সমসাময়িক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। প্রবন্ধকার নিপুণ ভাবে জনকল্যাণ বনাম দুর্নীতির দ্বন্দ্বটি ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে এই পতন বা পরিবর্তনের আবহের পিছনে আরও কিছু গভীর ও অনুচ্চারিত কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, আমাদের রাজ্যে বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর অভাব এখন প্রকট। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা— সব স্তরের স্বায়ত্তশাসন আজ কার্যত একটি বিশেষ কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত। ফলে স্থানীয় সমস্যার সমাধানে স্থানীয় নেতৃত্বের যে স্বকীয়তা থাকা উচিত ছিল, তা আজ বিলুপ্ত। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিচুতলার জনপ্রতিনিধিদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ইভিএমে।
দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধে কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা সমাজকে ভিতর থেকে ফোঁপরা করে দিচ্ছে। নিয়োগ দুর্নীতির ফলে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে তীব্র ‘বিমুখতা’ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরাজয় নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গ। এই ক্ষোভটি ভোট শতাংশের হিসাবে ধরা কঠিন, কিন্তু সমাজের গভীরে তা তীব্র মেরুকরণ ঘটিয়েছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সৌজন্য ও গণতান্ত্রিক পরিসরের অভাব। বিরোধী স্বরকে দমন করার যে সংস্কৃতি গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, তা সাধারণ শান্তিকামী বাঙালিকে ব্যথিত করেছে। রাজনীতিতে পারস্পরিক সৌজন্যের বদলে যে প্রতিহিংসা ও ঔদ্ধত্যের ভাষা যুক্ত হয়েছে, ভোটাররা নীরবে তার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
পরিশেষে বলি, কেবলমাত্র ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ধর্মীয় ভাবাবেগ দিয়ে বাংলার মানুষের চিন্তাশক্তিকে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। মানুষ এখন আত্মসম্মান, সুশাসন এবং মেধার যোগ্য মর্যাদা চায়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই সামাজিক বিবর্তনটি বুঝতে ব্যর্থ হন, তবে যে কোনও শক্তিশালী দলেরই পতন অনিবার্য।
দেবাশিস চক্রবর্তী, শ্রীরামপুর, হুগলি
মুক্তির আশা
অভিরূপ সরকারের ‘তৃণমূলের পতন কেন’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়ে আরও কিছু সংযোজন করতে চাই। উন্নয়ন বলতে প্রবন্ধকার নির্দিষ্ট ভাবে কোনটা বললেন, বোধগম্য হল না। মানুষের হাতে আর্থিক কিছু অনুদানকে অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়ন বলে না।
সিঙ্গুরের শিল্পবিমুখ ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ দেড় দশকে মুছতে পারা যায়নি। শিল্পবিমুখ বাংলা আস্তে আস্তে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। নীতিহীনতা, আকণ্ঠ দুর্নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গ এতটাই পিছিয়ে গিয়েছে যে, সেই জায়গা থেকে স্বাভাবিক জায়গায় ফিরতে নতুন সরকারের কিছুটা সময় লাগবে। সাম্প্রতিক নির্বাচন ছিল দুর্নীতি আর স্বজনপোষণ তথা অপশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার নির্বাচন। মানুষের স্বাধীনতা ফেরানোর ভোট। মানুষের স্বস্তির ভোট, মানুষের নতুন করে স্বপ্ন দেখার ভোট। শুধু হিন্দু ভোট পেয়ে বিজেপির এই ফলাফল সম্ভব ছিল না। সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য ডিএ চাওয়াকে কুকুরের ‘ঘেউ ঘেউ করা’র সঙ্গে তুলনা তৃণমূল দলের পতনের আর একটা কারণ। বিগত সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল যে, রাজ্য সরকার আর দল একই। যত দিন গিয়েছে চাকরি চুরি, নির্যাতন, সারদা, রোজ়ভ্যালি, নারদা কেলেঙ্কারি মানুষ ভাল ভাবে নেননি। আপাতত নতুন ভোরের জন্য নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা।
স্নেহাশিস সামন্ত, দাশনগর, হাওড়া
বিরোধী দায়িত্ব
বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। গণতন্ত্রে এক দল রাজ্য শাসন করে, অন্য দল বিরোধী আসনে বসে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক রাজনৈতিক কর্মী বা নেতারাও মনে করেন, বিরোধী দলের আবার কী দায়িত্ব? আসলে, বিরোধী দল থেকেই তো পরবর্তী কালে ক্ষমতায় আসা যায়। তাই, নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধা, নানান চাহিদা, পরামর্শ, সবই তাদের থেকে সংগ্রহ করে সরকারের দরবারে পৌঁছে দেওয়া বিরোধী দলের প্রধান কাজ। এমনকি, এই সমস্ত কাজ বাস্তবায়িত করার জন্য বিধানসভায় লাগাতার তাগাদা দিতে হবে। প্রয়োজনে আন্দোলনও করতে হবে। নাগরিকদের চাহিদা পূরণ হলে, বিরোধীদের দায়িত্ব কমবে, কিন্তু কর্তব্য শেষ হবে না। পরবর্তী চাহিদাগুলি খুঁজে বার করাও তাদেরই দায়িত্ব। তাতে বিরোধীদের স্থায়িত্ব মজবুত হবে এবং পরবর্তী কালে তাদের মসনদে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে।
স্বপন কুমার ঘোষ, আন্দুল, হাওড়া
রোগমুক্তির পথ
প্রতি বছর ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত হয় থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, আক্রান্ত রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলা এবং এই রোগ প্রতিরোধে সমাজকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে। ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া ফেডারেশন এই দিবস পালনের সূচনা করে। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ, যেখানে শরীরে পর্যাপ্ত ও স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না, ফলে রোগীরা দীর্ঘস্থায়ী রক্তাল্পতায় ভোগেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত রক্ত গ্রহণ করতে হয়। যদি বাবা ও মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তা হলে সন্তানের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। ভারত থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ও বাহকের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম। উদ্বেগের বিষয় হল, বহু মানুষ জানেনই না যে তাঁরা থ্যালাসেমিয়ার বাহক, তাই চিকিৎসকরা দীর্ঘ দিন ধরেই বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বা স্ক্রিনিংয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করছেন। একটি সাধারণ রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে এই বিষয়টি জানা সম্ভব এবং সচেতন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই রোগ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রক্তদান শিবির, বিনামূল্যে রক্তপরীক্ষা, স্বাস্থ্য শিবির, সচেতনতামূলক আলোচনা, পদযাত্রা এবং প্রচারাভিযানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। কারণ, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয় এবং সেই ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় রক্তদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে সমাজমাধ্যমও থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ডিজিটাল প্রচার, তথ্যভিত্তিক ভিডিয়ো, রোগীদের অভিজ্ঞতা এবং রক্তদানের আহ্বান সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায় হল সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং সামাজিক সহযোগিতা। মানবিকতা, বিজ্ঞানসম্মত সচেতনতা এবং নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
পার্থ প্রতিম মিত্র, ছোটনীলপুর, পূর্ব বর্ধমান
ছুটিতে পড়া
এ বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে এসেছিল অনেক আগে থেকেই। তাদের রাখা হয়েছিল রাজ্যের বহু স্কুলে। যার ফলে স্কুলগুলি দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় পঠনপাঠন ব্যাহত হয়েছে। সামনেই গরমের ছুটি। ছুটির দিনগুলিতে যদি কিছু অনলাইন ক্লাস করা যায়, কিংবা পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়, তা হলে পড়ুয়ারা উপকৃত হবে।
অসীম কুমার মিত্র, আমতা, হাওড়া