সেমন্তী ঘোষের ‘কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই?’ (২৭-৩) শীর্ষক প্রবন্ধের সঙ্গে সহমত পোষণ করে আমার কিছু কথা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হল, তার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া এবং সম্পূরক তালিকাগুলি। তালিকাগুলির প্রকাশের সময়, পদ্ধতি এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
খুবই উদ্বেগজনক বিষয় হল, এত গুরুত্বপূর্ণ তালিকা গভীর রাতে প্রকাশ করা হল কেন। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে স্বচ্ছতা, সময়নিষ্ঠা এবং জবাবদিহির উপস্থিতি প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তালিকা প্রকাশের সময় নিয়ে অযথা রহস্য তৈরি হয়েছে। ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’র যুক্তি দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের অভাব কি এর মূলে কাজ করেনি? এই দেরিতে প্রকাশের ফলেই সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে। একটি নিরপেক্ষ, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশনের যে বিশ্বাসযোগ্যতা, তা আজ প্রশ্নের মুখে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আরও তিনটি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে। কিন্তু কোনও রাজ্যেই বাংলার মতো অফিসারদের বদলির নামে এমন হেনস্থা দেখা যাচ্ছে না। তামিলনাড়ুতে নামমাত্র কয়েক জন আধিকারিককে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলায় বহু আধিকারিককে বদলি করা হয়েছে।
অসমের দিকে তো কমিশন তাকাচ্ছে না বললেই চলে। খুব অল্প আধিকারিককে বদলি করা হয়েছে— তাও যেন নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেখানোর জন্য। সরকারি ভাবে নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকেই বাংলায় শুরু হয়েছে বদলিনীতি।
এ বারের নির্বাচনে রাজ্যের শাসক দলের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে যেন নির্বাচন কমিশনই। এসআইআরকে সামনে রেখে বাংলার বৈধ ভোটারদের নাম কাটতেই কমিশন মরিয়া— এমন অভিযোগও উঠছে। আসলে কেন্দ্রের লক্ষ্য বাংলার ক্ষমতা দখল। তার জন্য গণতন্ত্রের শ্বাসরোধেও তারা পিছপা নয়, এমন আশঙ্কা প্রকাশ পাচ্ছে নানা মহলে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
আশঙ্কা জাগছে
সেমন্তী ঘোষের লেখা ‘কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই?’ প্রবন্ধের প্রেক্ষিতে এই পত্রের অবতারণা। কারণ খুব স্পষ্ট— “বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।” অতএব চলল জমি সাফাই— চিরুনি তল্লাশি চালানোর হুকুম, এসআইআর-এর নামে। কারণ, নিশ্চিত ভাবেই কিছু বাঙালিকে বোঝানো যাবে— এতে বাঙালিরই লাভ; যেমন করে ১৯০৫ সালে ঢাকার নবাবকে বুঝিয়েছিলেন লর্ড কার্জ়ন।
স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার বিপ্লবীদের এতটা আপসহীন হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল, এই প্রশ্নই যেন নতুন করে উত্থাপিত হচ্ছে। এ রোগ নাকি বাংলার ডিএনএ-তেই, ‘হুজুর’! তাই বুঝি সেই ডিএনএ-ই পাল্টে ফেলতে হবে? কেন এত আমিষের আঁশটে গন্ধ থাকবে বাঙালির যাপনে! বাংলার মানুষ যখন ‘হিন্দু খতরে মে’ সঙ্কীর্তন এখনও গ্রহণ করছে না, তখন কৌশলে নাম কেটে দাও ভোটার তালিকা থেকে, তার পর ঠেলে দাও ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’, থুড়ি ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’-এর দিকে— এমন আশঙ্কাই কিন্তু জেগে উঠছে।
শুধুমাত্র যদি নিরপেক্ষ, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটই লক্ষ্য হত, তা হলে বার বার বয়ান, নিয়ম ও নীতি বদলানো হত না, এমন অমানবিক তাড়াহুড়োয়, অস্বচ্ছ ভাবে।
আজ অসহায়ের আর্তনাদ ছাড়া বাঙালির আর কী করার আছে? এই সর্বনাশের বাস্তুতন্ত্র কি বাঙালিকে সম্পূর্ণ ভাবে বিবশ করে ফেলেছে? না কি কিছু বেয়াড়া স্ফুলিঙ্গ এখনও অবশিষ্ট আছে— সেটাই দেখার।
জয়দীপ চক্রবর্তী, কলকাতা-৫৬
জটিলতার মূলে
সেমন্তী ঘোষের ‘কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই’ শীর্ষক প্রবন্ধটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন, তার উত্তর তিনি কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে চেয়েছেন, এবং প্রশ্নগুলি নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক। লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়েও কিছু বলার জন্য এই চিঠি।
ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই রাজনীতি নিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজনা, বাড়াবাড়ি, মারামারি ও হানাহানির ঘটনা বেশি ঘটে— এমন ধারণা অনেকেরই। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব, অর্থাৎ নির্বাচনে, পশ্চিমবঙ্গ বহু সময়ই রক্তাক্ত, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ভোটবাক্সে বিরোধী ভোট পড়তে পারে, এই আশঙ্কায় অনেক পাড়া বা এলাকার মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়, এমন অভিযোগ দীর্ঘ দিনের।
ভোটবাক্স লুট, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের ভয় দেখিয়ে ভোট দখল— এই ধরনের ঘটনাও বার বার সামনে এসেছে। ভোটের সময়ে পুলিশ-প্রশাসনের কাছ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিকেরা ‘অধিকার রক্ষার কবচ’ পান না। ফলে হাজার হাজার নাগরিক তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। এগুলি নতুন সমস্যা নয়, বহু দিনের। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা আরও বেড়েছে।
ভোটার তালিকার সংশোধন প্রয়োজন ছিল, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। বহু মৃত ও ভুয়ো নাম তালিকায় রয়ে গিয়েছিল, তাঁদের বাদ দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি সুপরিকল্পিত ভাবে, যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করত, তবে আজকের এই জটিল পরিস্থিতি হয়তো তৈরি হত না। অন্য দিকে, রাজ্য প্রশাসনও এই কাজে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ সহায়তা করেনি— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটি এমন বিসদৃশ ভাবে সম্পন্ন করতে হল।
এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য বহু নাগরিককে বিভিন্ন সময়ে অসীম কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে, হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের মর্যাদার পরিপন্থী।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
জনস্বাস্থ্য জড়িত
প্রতি বছর ধরিত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, সকল জীবের সম্মিলিত আবাসভূমি। তবুও বাস্তব হল, মানুষের বর্তমান খাদ্যাভ্যাসই পরিবেশ-সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
জমিকে ফেলে রেখে বা চারণভূমিতে পরিণত করার বদলে সরাসরি শস্য, ডাল বা উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন করলে অনেক বেশি মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব, এবং পরিবেশের উপর চাপও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যায়। বন উজাড়ের বড় একটি অংশ কৃষি সম্প্রসারণ ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। আবার বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ অপচয় হয়ে যায়, যা পরিবেশ দূষণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের দিকে ঝোঁক, পশুভিত্তিক খাদ্যগ্রহণ কমানো, স্থানীয় ও মরসুমি খাদ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এবং খাদ্যের অপচয় রোধ— এই সাধারণ পদক্ষেপগুলিই পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রাণীদের শুধুমাত্র সম্পদ হিসাবে নয়, সহবাসিন্দা হিসাবে বিবেচনা করার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে তুলতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। খাদ্য উৎপাদনে বিভিন্ন রাসায়নিক, হরমোন ও ওষুধের ব্যবহার। পোলট্রি, মৎস্য ও দুগ্ধ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সব উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেও সচেতনতা জরুরি। ধরিত্রী দিবস শুধু প্রতীকী দিন নয়, এটি আমাদের প্রতি দিনের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দায়বদ্ধতাকে নিশ্চিত করতে চায়।
রাজ ঘোষ, কামালপুর, পূর্ব বর্ধমান