(উপরে) উত্তর দমদমের সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতা ধরের সমর্থনে মধ্যরাতের সভা। বিরাটিতে। (নীচে) বসিরহাটে নওসাদ সিদ্দিকীর উপস্থিতিতে আইএসএফ-সিপিএমের মিছিল। —ফাইল চিত্র।
চড়া উত্তাপের বিধানসভা নির্বাচন। আবহাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনী উত্তাপও সপ্তমে। দুই পর্ব মিলে প্রচারে ঝড় তুলেছে সব পক্ষই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাকি রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে রাজ্যে ‘শূন্যের গেরো’য় আটকে থাকা সিপিএম রইল তফাতেই!
রাজ্যে এ বার প্রচারে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েছে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস। এক দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তর প্রদেশ ও অসমের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, হিমন্ত বিশ্ব শর্মাদের মতো জাতীয় স্তরের নেতাদের দাপাদাপি, অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘টর্নেডো’। এর মাঝেই কংগ্রেসের হয়ে প্রচারে রাজ্যে এসেছিলেন রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গে। তাঁদের সকলেরই বাহন হেলিকপ্টার। রাজ্যের নেতারাও পিছিয়ে ছিলেন না কপ্টার ব্যবহারে। মমতা, অভিষেক তো বটেই, এই নির্বাচনে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকেও দেখা গিয়েছে কপ্টারে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, এআইসিসি-র পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীরেরাও প্রচারের কাজে কপ্টারে সওয়ার হয়েছেন। কপ্টার ব্যবহার করেছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীরও। ব্যতিক্রম শুধু সিপিএম এবং তাদের সঙ্গী আইএসএফ। এই নির্বাচনে দল হিসেবে কোনও তারকা প্রচারকের তালিকা ছিল না সিপিএমের। নেতারা ট্রেনে চড়ে, বাকিটা দলের গাড়িতে, না হয় হেঁটেই প্রচার সেরেছেন।
সাদামাঠা জীবন যাপনে রাজ্য বিজেপিতে সমীহ আদায় করেন শমীক। সভাপতি হওয়ার পরে দলীয় বাধ্যবাধকতার কারণে বিধাননগরের বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী ভাবে রয়েছেন অন্য বাড়িতে। অনেক বার বলার পরেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা নিতে চাননি শমীক। তিন বার বাড়িতে এসে ফিরে গিয়েছে আধা-সামরিক বাহিনী। এ হেন শমীকও প্রচারের বাড়তি চাপে আকাশে উড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দুই কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ায় দলের অনুমতি নিয়েই নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে বেশি সময় দিয়েছেন। ফলে, প্রচারের বাড়তি দায়িত্ব ছিল শমীকের কাঁধে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পরে সব চেয়ে বেশি সংখ্যক সভা করেছেন শমীকই। পাল্লা দিয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁকে। যদিও শমীকের ছায়াসঙ্গী সায়ন গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, কপ্টার ওঠা-নামার সময় নির্দিষ্ট করা থাকে বলে অনেক সময়ে বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে। এর ফলে কখনও কখনও ছন্দ কেটেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুও প্রথম দফার প্রচারের শেষ পর্বে দু’দিন কপ্টার পেয়েছিলেন। নিজের দুই কেন্দ্র ছাড়াও আরও প্রায় ৬০টি বিধানসভা এলাকা ছুঁয়েছেন তিনি, বেশির ভাগটাই গাড়িতে। এমনকি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের হেলিকপ্টার মাঝে প্রচারের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকেও।
উল্টো দিকে ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, পলিটব্যুরোর সদস্য বৃন্দা কারাটেরা প্রচারে এসেছিলেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায়। তবে জেলায় জেলায় চষে ফেলেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, রাজ্য কমিটির সদস্য শতরূপ ঘোষেরা। তাঁদের অধিকাংশই ট্রেনে করে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন। এক দিন উত্তরবঙ্গ, তো পরের দিন দক্ষিণবঙ্গের সভা সেরেছেন সারা রাত ট্রেন যাত্রা করেই। এক জায়গা থেকে সভা করে ট্রেন যে রাস্তায় ফিরবে, সেই পথেই ফেলা হয়েছে তাঁদের পরবর্তী সভাস্থল। বাকিটা গাড়ি করে প্রতিদিন কয়েকশো কিলোমিটার যাত্রা করে।
একই ভাবে আইএসএফের চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী রাজ্য জুড়ে জনসভা ও রোড-শো করেছেন। এক জায়গায় কর্মসূচি সেরে অন্যত্র পৌঁছতে দেরি হয়েছে, মধ্যরাত পর্যন্তও অপেক্ষায় থেকেছে চোখে পড়ার মতো জনতা! সিপিএমের এক প্রার্থীর কথায়, ‘‘স্থানীয় প্রচারে এ বার জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। আমরা আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় থেকেছি। কোথাও বামের, কোথাও বাম-আইএসএফের যৌথ কর্মসূচিতে মানুষের যা সাড়া দেখা গিয়েছে, সেই ভোট পেলে অনেক হিসেব উল্টে যেতে পারে!’’