সম্পাদক সমীপেষু: হেনস্থার সংস্কৃতি

রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর বর্তমান শাসক দল ও ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে যে সমস্ত ঘটনা সামনে আসছে, তাতে প্রাক্তন শাসক দলের বৃহৎ অংশই যে দুর্নীতিগ্রস্ত, সেই বিষয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই।

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৯

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালাবদলের পর বিরোধীদের, বা বলতে গেলে তৃণমূলের সাংসদ, বিধায়ক বা বিভিন্ন কর্মাধ্যক্ষ ও নেতা-নেত্রীকে ডিম ছুড়ে যে ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে মধুমিতা দত্তের ‘তারা পথে ছোড়ে ডিম’ (১৬-৬) শীর্ষক প্রবন্ধটি খুবই সময়োচিত। এর আগেও রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কোনও দিনই এই ভাবে পরাজিত বিরোধীদের দিকে ডিম, কাদা ছুড়ে মারার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের শাসক দল একে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ বলে যতই দাবি করুক, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কিন্তু এই সমস্ত ঘটনায় শাসক দলের নীরব প্রশ্রয় বা প্রশাসনিক দায় এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।

রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর বর্তমান শাসক দল ও ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে যে সমস্ত ঘটনা সামনে আসছে, তাতে প্রাক্তন শাসক দলের বৃহৎ অংশই যে দুর্নীতিগ্রস্ত, সেই বিষয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু বেছে বেছে এবং বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা টেনে এনে যে ভাবে শুধুমাত্র বিরোধী নেতৃত্বের হেনস্থা-সহ একের পর এক ডিম বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তাতে শাসক দলের নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে না। কারণ, ঘটনাক্রম থেকে স্পষ্ট, তৃণমূলের টিকিটেই জয়ী যে সমস্ত সাংসদ ও বিধায়ক শাসক দলের ছত্রছায়ায় ইতিমধ্যেই আশ্রয় নিয়েছেন বা বিরোধী দলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষের বিক্ষোভ বা ডিমের আঘাত কোনও মতেই তাঁদের বিব্রত করেনি।

নিঃসন্দেহে, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধীদের যে ভাবে হেনস্থা করে বা ভয় দেখিয়ে তাদের প্রতি সমর্থন দেখাতে বাধ্য করেছিল, আজ সেটাই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে তাদের দিকে। এই ডিম সংস্কৃতি আমদানির জন্য দায়ী কারা বা কাদের প্ররোচনায় এই ঘটনা ঘটছে, তা সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছেন। তাই প্রবন্ধকারের আশঙ্কাকে সমর্থন করে বলা যেতে পারে, এই ঐতিহ্য এখনই বন্ধ না করলে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনই বর্তমানের প্রশ্রয় দানকারীদের বিরুদ্ধেও কালের নিয়মে তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে।

অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি

ক্ষোভের প্রকাশ

মধুমিতা দত্তের ‘তারা পথে ছোড়ে ডিম’ প্রবন্ধটির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। এই যে ‘ডিম’ একটি মহলে ‘গেল গেল’ আর্তনাদ তুলেছে, সেটিকে প্রায় ‘ক্ষেপণাস্ত্র’ রূপে কল্পনা করা হলেও তা যে বহুলাংশে হাস্যকর, প্রবন্ধটি তারই ইঙ্গিতবাহী। অনেকেই এই জনপ্রিয় ‘এগিং’-কে ‘মব লিঞ্চিং’-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে হাহুতাশ করছেন। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ‘লিঞ্চিং’ ছিল কোনও না কোনও অজুহাতে তথাকথিত অভিযুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলার বর্বরোচিত ঘটনা। কুখ্যাত কুক্লাক্স ক্ল্যান অনেক ক্ষেত্রেই এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের হোতা ছিল। কিন্তু এ রাজ্যে ডিম ছোড়াকে কোনও অর্থেই ওই অমানবিক নির্যাতনের সমতুল্য বলা যায় না। সাধারণ ভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন শান্তিপ্রিয় মানুষ এ ধরনের অপমানজনক কার্যকলাপকে সমর্থনও করেন না।

তবে যাঁরা এই ডিমের আঘাত সহ্য করছেন, তাঁদের বিগত দিনের ক্রিয়াকলাপ বিস্মৃত হয়ে বিষয়টি নিয়ে সর্বাঙ্গীণ আলোচনা সম্ভব নয়। যেমন, কিছু দিন আগে ডিম ছোড়া হয়েছে বিধাননগরের এক প্রতাপশালী নেতার উপরে, যিনি আন্দোলনরত চাকরিহারা শিক্ষকদের পুলিশ দিয়ে দুরমুশ করেছিলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে নিজের কাজের সাফাই গাইতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি অপমানজনক কথা বলেছিলেন। আর এক ‘ডিমাক্রান্ত’ বিরোধী সর্বেসর্বা যে তাঁরই দলের বিক্ষুব্ধদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা এক রকম প্রমাণিত। এক সময় চৌর্যবৃত্তি, তোলাবাজি, অত্যাচারের যে বিষবৃক্ষ এই নেতারা রোপণ করেছিলেন, তারই তিক্ত ফল তাঁদের এখন ভোগ করতে হচ্ছে।

ভোলা যায় কি, যে মানুষগুলি আগের শাসক দলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন, তাঁদের জীবন এই নেতারা কী ভাবে নরক করে তুলেছিলেন? মিথ্যা মামলায় জেরবার করে, দৈহিক আক্রমণ, হেনস্থা করে বহু মানুষের পারিবারিক, সামাজিক সম্মান এঁরা ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন। তাই বর্তমানের এই ‘এগিং’ যে সর্বক্ষেত্রে বর্তমান শাসকদের প্রশ্রয়েই সংগঠিত হচ্ছে, এমনটি মনে করার কোনও কারণ নেই। আমি মনে করি, ডিম ছোড়ার মতো অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অন্তর্নিহিত চূড়ান্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকেও পুরোপুরি অস্বীকার করা ঠিক হবে না।

অর্জুন সেনগুপ্ত, কলকাতা-২৮

সংযম জরুরি

‘মান ও রক্ষা’ (১০-৬) শীর্ষক সম্পাদকীয় অত্যন্ত সময়োপযোগী। ‘অভিযুক্তকে হাতের সামনে পেয়ে জনতার ‘চোর চোর’ ধ্বনি বা ডিম, ঢিল, জুতো ছোড়া যে তাঁদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেই বহিঃপ্রকাশ বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হলে তার প্রশমনও পুলিশেরই দায়িত্ব— অত্যন্ত সঙ্গত প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে সম্পাদকীয়তে। কিন্তু এমন ঘটনা আমাদের তথাকথিত শৃঙ্খলাপরায়ণ সমাজব্যবস্থায় এক কুৎসিত বহিঃপ্রকাশের শামিল। প্রাক্তন শাসক দলের যে সব নেতা-মন্ত্রী-বিধায়ক-কাউন্সিলর অপরাধ ও চৌর্যবৃত্তিতে অভিযুক্ত হয়ে আজ যেন তেন প্রকারেণ নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিচারও অবশ্যই হবে, এমনটাই আশা করা যায়। সে কারণেই আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষের সংযম দেখানো ভীষণ ভাবে দরকার।

একটা নতুন সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তখনই জন্মায় যখন তার কাজে স্বচ্ছতার প্রমাণ মেলে। রাজ্যের নতুন সরকারকে মানুষের আস্থা ফেরত পেতে সেই কাজটিই করতে হবে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে। কিন্তু সেই পদক্ষেপকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে নতুন শাসক দলের উৎসাহী সমর্থকরা যদি প্রতিশোধ স্পৃহার বশবর্তী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চান, তবে বাংলার সাংঘাতিক অমর্যাদা হবে।

বহু জায়গাতেই দেখা গিয়েছে ডিম ছোড়ার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পুলিশ সে ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনায় উদ্যোগী হয়নি। পুলিশ— যাদের আইন রক্ষক বলে আমরা চিনি, তারাই যদি আইন বিশৃঙ্খল জনতার হাতে তুলে দেয়, তবে সমাজে শৃঙ্খলা থাকবে কি? তেমনটা হলে এ রাজ্যে আবার এক দল অসামাজিক বাহিনীর গড়ে ওঠা সময়ের অপেক্ষা।

আমরা চাই বাংলা দ্রুত এগিয়ে যাক সার্বিক উন্নয়নের দিকে। আগের সরকার যে পথে হেঁটেছিল, সেই পথে যেন রাজ্যের নতুন সরকার না হাঁটে, এটাই এখন সাধারণ মানুষের আশা। তবে উন্নয়নের সঙ্গে যদি উচ্ছৃঙ্খলতাকেও তোষণ করা হয়, তবে সে সমাজ এক সময়ে ভেঙে পড়বেই— এই অমোঘ কথাটি যেন মনে রাখে নতুন সরকার।

মনশ্রী চৌধুরী, কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান

নাগালের বাইরে

বিমানভাড়া দিন দিন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানির দামবৃদ্ধি— পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিমান সংস্থাগুলি বর্ধিত ভাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে। বস্তুত ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নামক বিশেষ শব্দের উদ্ভাবন করে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। টিকিটের দাম দ্বিগুণ, আড়াইগুণ হলেও পরিস্থিতির চাপে গ্রাহকদের তা মেনে নিতে হচ্ছে। অথচ, এই ব্যাপারে কেউ কোনও কথাও স্পষ্ট করে বলছে না। প্রশ্ন, এই বর্ধিত বিমানভাড়ার চক্রব্যূহ থেকে কি আর কোনও দিনই মুক্তি পাবে না সাধারণ মানুষ?

অলোক ভট্টাচার্য, কলকাতা-৫৬

আরও পড়ুন