Maternal Death

পথ-মৃত্যু

ট্রানজ়িট ডেথ-এর অন্যতম কারণ হিসাবে স্বাস্থ্যকর্তারা চিহ্নিত করেছেন, স্থানীয় নার্সিংহোম থেকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় বিলম্বকে। ফলে অধিকাংশ প্রসূতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছনোয় মৃত্যু আটকানো সম্ভব হয়নি।

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩২

গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রসূতি-মৃত্যুর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ‘ট্রানজ়িট ডেথ’, অর্থাৎ বাড়ি থেকে বা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মৃত্যু ঘটেছে ৩৪টি। এই পরিসংখ্যান সম্প্রতি উঠে এসেছে খোদ স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে রাজ্যের সমস্ত জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ও অন্যদের সঙ্গে বৈঠকে। উদ্বেগজনক। যেখানে রাষ্ট্রপুঞ্জের সুস্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যে প্রসূতি-মৃত্যুর হার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি এক লক্ষ জীবিত সন্তান প্রসব পিছু ৭০ বা তার নীচে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছিল, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এখনও যথেষ্ট পিছিয়ে। গত বছরই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর এক নির্দেশিকা জারি করে সিজ়ারের পর কোন স্যালাইন কত মাত্রায় কত ক্ষণ দিতে হবে, তা বলেছিল। কারণ, চিকিৎসকদের একাংশ জানিয়েছিলেন রাজ্যে ৭০ শতাংশ প্রসূতি-মৃত্যু ঘটছে সিজ়ারের পর। প্রশ্ন উঠেছিল সিজ়ার-পরবর্তী সঙ্কট মোকাবিলায় হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো নিয়ে। সেই প্রশ্নের সদুত্তর এখনও মেলেনি। জানা গেল হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই পথে মারা যাওয়াও প্রসূতি-মৃত্যুর অন্যতম কারণ। অর্থাৎ, প্রসূতি-মৃত্যুর কারণ এক নয়, একাধিক, এবং বহুমাত্রিক।

ট্রানজ়িট ডেথ-এর অন্যতম কারণ হিসাবে স্বাস্থ্যকর্তারা চিহ্নিত করেছেন, স্থানীয় নার্সিংহোম থেকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় বিলম্বকে। ফলে অধিকাংশ প্রসূতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছনোয় মৃত্যু আটকানো সম্ভব হয়নি। এই যদি বাস্তব চিত্র হয়, তবে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের পরিকাঠামো খতিয়ে দেখা জরুরি। কেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বার বার রেফার-রোগ আটকানোর কথা বললেও রোগীকে শেষ মুহূর্তে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পাঠানোর প্রয়োজন হচ্ছে, নার্সিংহোমগুলির অধিকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় তা খুঁজে বার করতে হবে। অবশ্য প্রশ্ন আরও আছে, জেলাগুলিতে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে রেফার হয়ে আসা প্রসূতির অবস্থা সামাল দেওয়ার পরিকাঠামোও কি পর্যাপ্ত আছে? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত কর্মী, উপযুক্ত সরঞ্জাম এবং আপৎকালীন পরিস্থিতি সামলানোর পরিকাঠামো থাকলে প্রসূতি-মৃত্যু ঠেকানো অসম্ভব নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রসূতি-মৃত্যুর জেলাওয়ারি পরিসংখ্যান উল্টো চিত্রই তুলে ধরে। অথচ, খাতায়-কলমে জেলা হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো ও মানোন্নয়নে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। প্রকৃত গলদটি কোথায়, তা খুঁজে বার না করতে পারলে প্রসূতি-মৃত্যুর হার কমবে না।

সাম্প্রতিক বৈঠকে নাবালিকা প্রসূতির মৃত্যুও আলোচনায় উঠে এসেছে। সরকার মায়ের একুশ বছর বয়সকে প্রথম প্রসবের যথাযথ বয়স বলে চিহ্নিত করলেও প্রতি ছ’জন মায়ের এক জনের বয়স তার চেয়ে কম। ফলে, মা এবং সন্তান— উভয়ই উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। তা ছাড়া বহু ক্ষেত্রেই নাবালিকা মা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অভাব থাকে প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যাতেও। প্রসূতি-মৃত্যু হ্রাসে সর্বাগ্রে নাবালিকা-মাতৃত্বে রাশ টানতে হবে। ব্যতিক্রম থেকে গেলে সেই মায়েরা যাতে বিশেষ যত্ন, সরকারি সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রসূতি-মৃত্যু শুধুমাত্র মেয়েদের স্বাস্থ্য বিষয়ক নয়, সার্বিক ভাবে দেশের উন্নয়ন সূচকও বটে। তার প্রতি অবহেলা অক্ষমণীয়।

আরও পড়ুন